আল্লাহর নিকট অধিক পছন্দের আমল কুরবানি

আল্লাহর নিকট অধিক পছন্দের আমল কুরবানি

যিল-হজ্ব মাসের ১০ তারিখের ঈদকে ঈদুল আযহা বলে। ঈদুল ফিতরের মতোই এই ঈদের তাৎপর্য রয়েছে। ঈদুল আযহার দিনে যত ইবাদত করা যায় তার মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ট ইবাদত হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কুরবানি করা। নবী করিম (সা.) বলেন, ঈদুল আযহার দিনে কুরবানি অপেক্ষা অধিক পছন্দের কোনো আমল নেই আল্লাহর নিকট।

# কুরবানির পশুর প্রতিটি লোমের পরিবর্তে ১টি করে নেকী কুরবানিদাতার আমলনামায় লেখা হয়।

# আল-কুরআনে আল্লাহ বলেন- আল্লাহর কাছে এদের (কুরবানির পশু) গোশত এবং রক্ত কিছুই পৌঁছায় না কেবলমাত্র তাক্বওয়া ছাড়া। (সূরা ২২ হজ্ব-৩৭)।
হজ্বের সময় কোনো ভূলক্রটি হলে কুরবানি করার দ্বারা আল্লাহ তা মাফ করে দেন।

ঈদুল ফিতরের মতোই ঈদুল আযহার দিনে অনেকগুলো আমল রয়েছে।
১। বড় আমল হলো ঈদের সালাত আদায়ের পর হালাল বা বৈধ পশু দ্বারা কুরবানি করা। নামাজের পূর্বে কুরবানি বৈধ নয়;
২। ঈদুল আযহার নামাজ যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি পড়া;
৩। সকালে কিছু আহার না করে কুরবানির পশুর গোশত দ্বারা আহার করা;
৪। তাকবীরে তাশরিক জোরে পড়া। নারী পুরুষ, মুকিম, মুসাফির সকলের জন্য এবং ১৩ই যিল-হজ্ব আসর পর্যন্ত চলবে। ভুলে বাদ পড়লে পরের ওয়াক্তে ক্বাজা পড়বে;
৫। ঈদের ময়দানে গমনকালে তাকবীর উচ্চস্বরে পড়তে হয়;
৬। অন্যান্য সুন্নাতগুলো ঈদুল ফিতরের মতোই রয়েছে।

শিক্ষা
কুরবানি মূলতঃ ছিল আল্লাহর পরীক্ষা। তিনি হযরত ইব্রাহীমের (আ.) উপর এই পরীক্ষা নিয়েছিলেন। আর আমাদের কাছেও আল্লাহর পরীক্ষা যে আমরা তার হুকুমে নিজেদের প্রিয় বস্তু তার জন্য সন্তুষ্ট চিত্তে উৎসর্গ করতে পারি। আমরা বস্তু পূজা দুনিয়ার মহব্বতকে দু’পায়ে ঠেলে দিয়ে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার পথে এগিয়ে যাই।

মাসআলা
১০ই যিল-হজ্বের ফজর হতে ১২ যিল-হজ্বের সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে কোনো এক সময় যদি কেউ মালিকে নিসাব হয়, তবে তার উপর কুরবানি ওয়াজিব হবে।

কুরআন
কুরবানি- ইব্রাহীম (আ.) ইসমাইলকে (আ.) বললেন বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে তোমাকে আমি জবাই করছি। এখন তোমার অভিমত কী? তিনি বললেন, হে আমার পিতা! আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তাই করুন (সূরা আস সাফফাত ১০২)।

আল্লাহর কাছে তোমাদের (কুরবানির পশু) গোস্ত এবং রক্ত পৌঁছে না বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া (খোদাভীতি) (সূরা হজ্ব- ৩৭)।

তুমি তোমাদের প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করো এবং কুরবানি করো (সূরা আল-কাওসার- ২)।

কুরবানি ঈদ সম্পর্কে সিহাহ্ সিত্তা’র হাদীসে বর্ণিত কয়েকটি হাদীস
১। আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত। নবী (সা.) বলেন- যে ব্যক্তি দুই ঈদের রাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ইবাদত করবে তার অন্তর ওই দিন মরবে না, যেদিন অন্তর সমূহ মরে যাবে। (সুনান ইবনে মাজা- ২য় খন্ড, কিতাবুস সিয়াম অধ্যায়: অনুচ্ছেদ- দুই ঈদের রাতে ইবাদত, হাদীস নং- ১৭৮২)।

২। আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) দু’টি দিন রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন। ঈদুল ফিতরের দিন ও কোরবানীর দিন/ঈদুল আযহার দিন। (সহীহ্ মুসলিম- ৪র্থ খন্ড, কিতাবুস সিয়াম অধ্যায়, হাদীস নং- ২৫৪০)।

৩। নবীর (সা.) স্ত্রী উম্মু সালমা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন, যার কাছে কুরবানি করার মত পশু আছে, সে যেন যিলহজ্ব মাসের নতুন চাঁদ উঠার পর থেকে কুরবানি করা পর্যন্ত নিজের চুল না ছাটে এবং নখ না কাটে। (সহীহ্ মুসলিম- ৭ম খন্ড, কিতাবুল আদাহী অধ্যায়, হাদীস নং- ৪৯৬৫)।

৪। আব্দুল্লাহ্ ইবনে আমর ইবনে আস (রা.) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তিকে বললেন- কুরবানির দিনকে ঈদের দিন করার জন্য আমাকে আদেশ করা হয়েছে। আল্লাহ তা’য়ালা এই উম্মতের জন্য একে ঈদ সাব্যস্ত করেছেন। তখন ওই ব্যক্তি বললো- যদি আমি দুধ পান করার জন্য অন্যের দান করা পশু ব্যতীত অন্য কিছু না পাই, তাহলে কি আমি তা-ই কুরবানি করবো? তিনি বললেন- না, কিন্তু তুমি চুল, নখ কেটে ফেলবে ও গোঁফ ছোট করবে এবং তোমার নাভির নীচের পশম কামাবে-এটাই হবে আল্লাহর নিকট তোমার কুরবানির পূর্ণতা। (সুনান নাসাঈ শরীফ- ৪র্থ খন্ড, কুরবানী অধ্যায়, হাদীস নং- ৪৩৬৭ ও আবু দাউদ শরীফ- ৪র্থ খন্ড, কুরবানী অধ্যায়, হাদীস নং- ২৭৮০)।

৫। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেন- কোরবানির দিন মানুষ যে কাজ করে তার মধ্যে আল্লাহর নিকট সর্বাধিক পছন্দনীয় হচ্ছে রক্ত প্রবাহিত করা (কুরবানি করা)। কিয়ামতের দিন তা নিজের শিং, পশম ও ক্ষুরসহ উপস্থিত হবে। তার (কুরবানি পশু) রক্ত জমীনে পড়ার পূর্বেই আল্লাহর কাছে এক বিশেষ মর্যাদায় পৌঁছে যায়। অতএব, তোমরা আনন্দিত মনে কুরবানি কর। (জামে আত-তিরমিযী- ৩য় খন্ড, কুরবানী অধ্যায়: অনুচ্ছেদ- কোরবানীর ফযীলত, হাদীস নং- ১৪৩৩)।

৬। যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহর (সা.) সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! এই কুরবানি কি? তিনি বলেন- তোমাদের পিতা ইব্রাহিমের (আ.) সুন্নত (ঐতিহ্য)। (সুনান ইবনে মাজা- ৩য় খন্ড, কুরবানি অধ্যায়: অনুচ্ছেদ- কোরবানীর সওয়াব, হাদীস নং- ৩১২৭)।

৭। বুরাইদা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন আহার না করে (ঈদের মাঠে) রওয়ানা হতেন না এবং কুরবানির দিন ঈদগাহ থেকে ফিরে না আসা পর্যন্ত আহার করতেন না। (সুনান ইবনে মাজা- ২য় খন্ড, কিতাবুস সিয়াম অধ্যায়, হাদীস নং- ১৭৫৬)।

৮। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন- কোন ব্যক্তির সামর্থ্য থাকা সত্বেও যে কুরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদের মাঠের কাছেও না আসে। (সুনান ইবনে মাজা- ৩য় খন্ড, কুরবানি অধ্যায়: অনুচ্ছেদ- কোরবানির ওয়াজিব কি না, হাদীস নং- ৩১২৩)।

৯। সালামা ইবনুল আকওয়া (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কুরবানি করে, সে যেন তৃতীয় দিনের পর এমন অবস্থায় সকাল না করে যে, তার ঘরে কুরবানির গোশতের কিছু অংশ অবশিষ্ট রয়েছে। কিন্তু যখন পরবর্তী বছর আসলো, লোকেরা আরজ করলো, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা প্রথম বছর (গত বছর) যেরূপ করেছিলাম, এ বছরও কি তাই করবো? তিনি বললেন, না। সে বছর লোকেরা অভাব-অনটনে পড়েছিলো, তাই আমি চেয়েছিলাম তোমরা নিজেদের কুরবানির গোশত তাদের মধ্যে ছড়িয়ে দাও। (সহীহ্ মুসলিম- ৭ম খন্ড, কিতাবুল আদাহী অধ্যায়, হাদীস নং- ৪৩৯৫)।

১০। জাবিব (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহর (সা.) সঙ্গে তামাত্তু হজ্জ করতাম। আমরা সাতজনের পক্ষ থেকে গরু যবেহ করতাম এবং তাতে শরীক হতাম। (সুনান নাসাঈ শরীফ- ৪র্থ খন্ড, কুরবানী অধ্যায়, হাদীস নং- ৪৩৯৫)।

১১। জাবের (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সা.) ঈদের দিন (বাড়ী ফিরে আসা সময়ে) ভিন্ন পথে আসতেন। (সহীহ্ আল-বুখারী-১ম খন্ড, কিতবুল ঈদাইন অধ্যায়, হাদীস নং- ৯২৯)।

১২। আলী (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিং ভাঙ্গা ও কান কাটা পশু কুরবানি করতে নিষেধ করেছেন। (জামে আত-তিরমিযী- ৩য় খন্ড, কুরবানী অধ্যায়, হাদীস নং- ১৪৪৬)।

১৩। ইবনে উমার (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় দশ বছর অবস্থান করেছেন এবং বরাবর (প্রতি বছর) কুরবানি করেছেন। (জামে-আত-তিরমিযী- ৩য় খন্ড, কুরবানী অধ্যায়, হাদীস নং- ১৪৪৯)।

১৪। ইবনে উমার (রা.) থেকে বর্ণিত। নবী রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের মাঠে কুরবানির পশু যবেহ্ করতেন। (সুনান ইবনে মাজা- ৩য় খন্ড, কুরবানী অধ্যায়, হাদীস নং- ৩১৬১)।

১৫। জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন- কুরবানির দিন নবী (সা.) দু’টি শিং বিশিষ্ট সাদা ও কাল মিশ্রিত দুম্বাকে কুরবানির উদ্দেশ্যে কিবলামুখী করে শোয়ান এবং এই দু’আ পাঠ করেন-
অর্থাৎ আমি আমার চেহারা তাঁর দিকে ফিরাচ্ছি, যিনি এককভাবে যমীন ও আসমান সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত নই। নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার হায়াত এবং আমার মউত আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীনের জন্য-যার কোন শরীক নেই এবং আমি এরূপ করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি এবং আমি মুসলিমদের শামিল। হে আল্লাহ! এটি তোমারই পক্ষে এবং তোমারই জন্যে- মুহাম্মদ ও তাঁর উম্মতের তরফ হতে, বিস্মিল্লাহি আল্লাহু আকবার। অতঃপর তিনি সে দুম্মাকে যবাহ্ করেন। (আবু দাউদ শরীফ- ৪র্থ খন্ড, কুরবানী অধ্যায়, হাদীস নং- ২৭৮৬ ও সুনান ইবনে মাজা- ৩য় খন্ড, কুরবানি অধ্যায়, হাদীস নং- ৩১২১)।

১৬। জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- তোমরা (কুরবানিতে) মুসিন্না ছাড়া যবেহ করো না। কিন্তু তা সংগ্রহ করা তোমাদের জন্য কষ্টসাধ্য হলে ছয় মাস বয়সের মেষ-ভেড়া যবেহ করো। (৫ বছর বয়সের উট, ২ বছর বয়সের গরু ও ১ বছর বয়সের ছাগল-ভেড়াকে মুসিন্না বলা হয়। কুরবানিতে অন্ততঃ এই বয়সের পশু যবেহ করতে হয়। (সুনান ইবনে মাজা- ৩য় খন্ড, কুরবানী অধ্যায়, হাদীস নং- ৩১৪১)।

কক্সবাজার ভিশন.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




এই পাতার আরও সংবাদ
error: Content is protected !!