১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা নিলো পুলিশ

প্রতিবন্ধী পরিবারকে ফাঁসাতে গিয়ে নিজেই ফেঁসে গেলো ‘ভূমিদস্যু’ শফিক

প্রতিবন্ধী পরিবারকে ফাঁসাতে গিয়ে নিজেই ফেঁসে গেলো ‘ভূমিদস্যু’ শফিক

বিশেষ প্রতিবেদক
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

অসহায় প্রতিবন্ধী পরিবারের বসতভিটা দখলের জন্য তাদের উপর হামলা, মারধর এবং উল্টো মিথ্যা মামলা দিয়ে নির্যাতিত মা ও মেয়েকে কারাগারে পাঠানোর ঘটনাটি ‘টক অব দ্য কক্সবাজারে’ পরিণত হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে এই ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিভিন্ন দপ্তরসহ সর্বত্র আলোচনা-সমালোচনা ও নিন্দার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। কয়েকদিন পরও হলেও এই ঘটনাটি নাড়া দিয়েছে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে।

তদন্ত করে আসলে ঘটনা বের করে হত্যা, অস্ত্র, বিস্ফোরকদ্রব্যসহ বিভিন্ন ধারার ছয় মামলার পলাতক আসামী আলোচিত ভূমিদস্যূ সৌদি প্রবাসী শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যাচ্ছে পুলিশ। নির্যাতিত পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে শফিক ও তার লোকজনের বিরুদ্ধে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে।

সোমবার রাতে ওই পরিবারের মেয়ে সাবেকুন্নাহার বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। কক্সবাজার সদর মডেল থানার মামলা নাম্বার-৮৪।

ভূমিদস্যূ শফিকুল ইসলামের ভাই আবদুর রহীমকে প্রধান আসামি করে শফিকুল ইসলামসহ মোট ছয়জনকে এজাহারনামীয় আসামি করে অজ্ঞাতসহ মোট ১২ জনকে মামলায় আসামী করা হয়েছে।

হামলা, ধর্ষণচেষ্টা ও জবর-দখল চেষ্টার অপরাধে মামলাটি দায়ের করা হয়।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার শহরতলীর ঝিলংজা ইউনিয়নের অধীন খরুলিয়া মাষ্টার পাড়া এলাকায় প্রতিবন্ধী আবু বক্কর ছিদ্দিকের পরিবারের ৪০ বছরের ভোগদখলীয় বসতভিটার ২৯ শতক জমি দখলের জন্য ভূমিদস্যূ শফিকুল ইসলাম প্রতিবন্ধী পরিবারের বসতভিটা দখল করতে মরিয়া হয়ে উঠে। এজন্য শফিক ও তার লালিত লোকজন দীর্ঘদিন ধরে ওই প্রতিবন্ধী পরিবারের সদস্যদের নানাভাবে হুমকি দিয়ে আসছিল। একই সাথে রাতের আঁধারে ভাড়াটে সন্ত্রাসি দিয়ে বসতভিটাটি দখলের জন্য একাধিকবার অপচেষ্টাও চালিয়েছে। এসব ঘটনার প্রেক্ষিতের আদালতের শরণাপন্ন হলে আদালত ওই জমিতে অবস্থান না করতে ভূমিদস্যূ শফিকের বিরুদ্ধে ১৪৪ ধারা জারি করেন। কিন্তু দুঃসাহসিকভাবে আদালতের নির্দেশকে অমান্য করে অপচেষ্টা অব্যাহত রাখেন ওই ব্যক্তি।

ওই ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, অপচেষ্টা হিসেবে গত ৪ এপ্রিল সাজেদার বাড়িতে ভূমিদস্যু শফিকের নেতৃত্বে তার ভাড়াটে লোকজন হামলা চালায়। এসময় সাজেদার মেয়ে সাবেকুন্নাহারকে শ্লীলতাহানিসহ অন্যদের মারধর করে। তাতেও দখলে ব্যর্থ হয়ে ১৬ এপ্রিল রাতে ভূমিদস্যু শফিকুল ইসলামের নির্দেশে তার সহযোগী নুরুল ইসলামের নেতৃত্বে রাতের অন্ধকারে আবারও সাজেদার বসতভিটায় হামলা চালায় ভূমিদস্যুরা। এসময় ওই পরিবারের মেয়েদের মারধর, ভাংচুর চালিয়ে গাছপালা কেটে নিয়ে যায় তারা। একই সাথে দ্রুত বাড়ি ছেড়ে না গেলে প্রাণনাশের হুমকি দেয় হামলাকারিরা।

এই ঘটনার পর পুলিশের চোখে ধূলো দিয়ে উল্টো ওই নির্যাতিত পরিবারের গৃহকত্রী সাজেদা খাতুন (৬০) ও মেয়ে সাজিয়া আফরিনকে আটক করায় শফিকুল। তাদের থানায় ২৪ ঘণ্টা আটকে রেখে শফিকুলের সাজানো মিথ্যা মামলা রেকর্ড করে কারাগারে পাঠায় পুলিশ। এতে সাজেদা খাতুনের অসহায় তিন মেয়ের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠে।

এই ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন স্তরে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেন সাধারণ মানুষ।

নির্যাতিত পরিবারের এই করুণ চিত্র ও সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ আমলে নেন পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের। ২১ এপ্রিল তাৎক্ষণিক বিষয়টির ব্যাপারে তদন্তের উদ্যোগ নেন ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মোঃ ইকবাল হোসাইন। তার তত্ত্বাবধানে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আদিবুল ইসলামের নেতৃত্বে ভারপ্রাপ্ত ওসি মোহাম্মদ খায়রুজ্জামানসহ পুলিশের একটি দল ওইদিন বিকাল ৩টায় ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান।

পুলিশের প্রতিনিধি দলটি নির্যাতিত পরিবারের কথা শুনেন এবং বিস্তারিত তথ্য জেনে প্রকৃত ঘটনা জানেন। এতে ওই প্রতিবন্ধী পরিবারের প্রতি ভূমিদস্যু শফিকুল ইসলামের অন্যায়ের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। তখন আইনী আশ্রয় নেয়ার জন্য ওই নির্যাতিত পরিবারকে পরামর্শ দেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আদিবুল ইসলাম। তারই প্রেক্ষিতে ভূমিদস্যু শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে নির্যাতিত পরিবার থানায় অভিযোগ গ্রহণ করে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে পুলিশ।

সত্যতা নিশ্চিত করে কক্সবাজার সদর মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ও ভারপ্রাপ্ত ওসি মোহাম্মদ খায়রুজ্জামান জানান, সাজেদা খাতুনের দায়ের করা এজাহারকে মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। এখন আসামীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হবে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আদিবুল ইসলাম বলেন, সরেজমিন তদন্তে সাজেদা খাতুনের পরিবারকে নির্যাতন ও হয়রানি করার বিষয়টি প্রতীয়মান হয়েছে। তাই বিচার পেতে তাদের আইনের আশ্রয় পাওয়ার আশ^াস দিয়েছিলাম আমরা। সে মোতাবেক তাদের দায়ের করা এজাহার মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, তদন্তের মাধ্যমে ওই নির্যাতিত পরিবারকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেয়া হবে।