নানান অপকর্মে ‘দক্ষ’ এক অধ্যক্ষ

নানান অপকর্মে দক্ষ এক অধ্যক্ষ। তার অপকর্মের তালিকা বেশ দীর্ঘ। ছাত্রীদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ থেকে শুরু করে নাশকতা ও মাল্টিপারপাস কোম্পানি খুলে অর্থ আত্মসাতের মামলাও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তিনি ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা।

সর্বশেষ তার অনুসারীরা আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফির গায়ে কেরোসিন ঢেলে তাকে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করে। ওই ঘটনার পর আবারও আলোচনায় আসেন অধ্যক্ষ সিরাজ। তবে শুধু রাফিকে নয়, চলতি বছর একই মাদ্রাসার আরেক ছাত্রী তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলেন।

ওই ছাত্রীকে প্রায়ই ডেকে নিয়ে অনৈতিক প্রস্তাব দিতেন সিরাজ। ওই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি বেশ কিছু দিন কারাগারেও ছিলেন। ফেনীর সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।

মাল্টিপারপাস কোম্পানির আড়ালে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় আগেও ফেনী সদর থানায় অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে ছাত্রীদের নিপীড়নের অভিযোগ অনেকে মৌখিকভাবে জানাচ্ছেন।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশন ও ক্রাইম) মোহাম্মদ আবুল ফয়েজের কাছে রবিবার বিকালে জবানবন্দি দিতে আসা এক ছাত্রী নাম না প্রকাশ করার শর্তে জানান, ‘যৌন হয়রানি করার জন্য তিনি খুব দক্ষ অধ্যক্ষ। ক্লাসে কৌশলে এক-দুটা প্রশ্ন বলে দিতেন; সেগুলো পরীক্ষায় চলে আসত। এই লোভ দেখালে ছাত্রীরা যেন বেশি বেশি হুজুরের কাছে যায়, সে জন্য এসব টেকনিক অ্যাপ্লাই করতেন হুজুর।’

সরেজমিন গেলে সিরাজ-উদ-দৌলার নানা অপকর্মের আরও বর্ণনা দিলেন তার একান্ত সহকারী নুরুল আমীন। তিনি বলেন, ‘হুজুরের চরিত্র খারাপ জেনে ছাত্রীদের তার কাছে বেশি যেতে নিষেধ করতাম। আমি যতক্ষণ থাকতাম, ততক্ষণ ছাত্রীরা হুজুরের রুমে আসা-যাওয়া করত এটা দেখতাম। আমরা চলে গেলে পরে কী হতো সেটি তো আর আমরা জানি না।’ স্থানীয় বাসিন্দা আবদুর রউফ জানান, প্রশ্নফাঁস ও যৌন হয়রানিসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত সিরাজ। একসময় জামায়াতের রাজনীতি সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ওই দল থেকে বহিষ্কার হয়েছেন।

সর্বশেষ আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে নানা অপকর্মে জড়িত। তাকে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের একটি অংশ সাপোর্ট দেন। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রী যৌন হয়রানির অভিযুক্ত অধ্যক্ষ পার পেয়ে যেতেন।

সোনাগাজী উপজেলা জামায়াতের সাবেক আমির মাওলানা খুরশীদ আহমদ বলেন, একসময় সিরাজ জামায়াতের শূরা সদস্য ছিলেন। তবে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠার পর তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন বলে জানালেন গভর্নিং বডির সহসভাপতি ও সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমীন।

তিনি বলেন, আমরা যখনই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়েছি, ব্যবস্থা নিয়েছি। এবারও আমি নিজে তাকে পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছি। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও নারী নেত্রী নাজমা আক্তার বলেন, ছাত্রীকে যৌন হয়রানি ও পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় অধ্যক্ষসহ দোষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রীরা নিরাপদ নয়, তা হলে তারা কোথায় যাবে? প্রশ্ন রাখেন তিনি।

পরীক্ষার কেন্দ্র সচিব নুরুল আফসার ফারুকী জানান, কেন্দ্রে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পরীক্ষা শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হবে। ইতোমধ্যে অধ্যক্ষকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা কারাগারে থাকায় এসব অভিযোগের ব্যাপারে তার বক্তব্য নেওয়া যায়নি।