রোগীর উশৃংখল স্বজনকে দেয়া হলো পুলিশে

আবারও ডাক্তারকে মারধর রোগীর স্বজনের, ৫ ঘণ্টা বন্ধ ছিল চিকিৎসা

আবারও ডাক্তারকে মারধর রোগীর স্বজনের, ৫ ঘণ্টা বন্ধ ছিল চিকিৎসা

নিজস্ব প্রতিবেদক
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

অগ্নিদগ্ধ ৬ বছর বয়সী শিশু সুমাইয়াকে হাসপাতালে আনা হয় মঙ্গলবার সকাল ৯টায়। সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগ তালাবদ্ধ থাকায় ছুটে যান পার্শ্ববর্তী বেসরকারী হাসপাতাল ফুয়াদ আল খতীবে। কিন্তু সেখানে নগদ ৮০ হাজার টাকা ছাড়া রোগী গ্রহণ না করায় সুমাইয়াকে আবারও নেয়া হয় সদর হাসপাতালে। হাসপাতালের বাইরে টানা পাঁচঘণ্টা অপেক্ষার পর বেলা দেড়টার দিকে অবশেষে জরুরি বিভাগ খুলে দেয়া হয়। এরপর শুরু হয় সুমাইয়ার চিকিৎসা।

হাসপাতালের বাইরে টানা পাঁচঘণ্টা সুমাইয়া এবং তার মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছিল পুরো পরিবেশ।

সুমাইয়া কক্সবাজার শহরতলীর লারপাড়া এলাকার মো. ছলিমের মেয়ে। মঙ্গলবার (৯ এপ্রিল) সকাল সাড়ে আটটায় ঘরের রান্নার পাত্রে পা পড়ে দগ্ধ হয় সে। চিকিৎসকরা জানান, তার শরীরের ৪০ শতাংশ পুড়ে গেছে। সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসা চলছে।

সুমাইয়াকে হাসপাতালে নিয়ে আসা প্রতিবেশী আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, সকাল ৯টা থেকে অনেক জায়গায় তদবির করেছি, কিন্তু জরুরি বিভাগের গেইট খুলেনি। শেষ পর্যন্ত দেড়টার দিকে খুলে দেয়। দীর্ঘক্ষণ চিকিৎসা না পেয়ে রোগীর অবস্থা চরম সংকটাপন্ন হয়ে যায়।

আবারও ডাক্তারকে মারধর রোগীর স্বজনের, ৫ ঘণ্টা বন্ধ ছিল চিকিৎসা

শুধু একজন সুমাইয়া নয়, মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে বেলা দেড়টা পর্যন্ত কোন রোগীই সদর হাসপাতালে প্রবেশ করতে পারেননি। সকালে হাসপাতালে এক চিকিৎসককে লাঞ্চিত করার জের ধরে ৯টায় ইন্টার্ণ চিকিৎসকরা জরুরি বিভাগের গেইট তালাবদ্ধ করে দেন। শুধু জরুরি বিভাগ নয়, চিকিৎসাসেবা বন্ধ ছিল ওয়ার্ডগুলোতেও।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, সোমবার রাতে একজন নাক-কান-গলা’র (ইএনটি) রোগী ভর্তি হন। কিন্তু ওই রোগী ক্রিটিক্যাল অবস্থায় ছিলেন। দ্রুত তার উন্নত চিকিৎসা দরকার ছিল। একারণে মঙ্গলবার সকালে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে রেফার করা হয়। রেফার করার প্রায় আধা ঘণ্টা পর ওয়ার্ডে গিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন রোগীর স্বজনরা। এসময় মোহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ ওরফে ম্যাক্স (৩৮) নামে রোগীর এক স্বজন ওয়ার্ডে কর্মরত ডাক্তারদের সাথে উদ্ধত্বপূর্ণ আচরণ করে। এক পর্যায়ে হাসপাতালের একজন ডাক্তারকে শারীরিকভাবে লাঞ্চিত করেন তিনি।

ওই সময় তাৎক্ষণিক ইন্টার্ণ চিকিৎসক ও কর্মচারীরা ‘ম্যাক্স’ নামের ওই ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশের কাছে সৌপর্দ করেন।

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদ উদ্দীন খন্দকার জানান, ম্যাক্স নামের ওই ব্যক্তির বাড়ি শহরের সাহিত্যিকাপল্লী এলাকায়। হাসপাতালে বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি এবং চিকিৎসকদের লাঞ্চিত করার অপরাধে তাকে আটক করা হয়।

এদিকে ঘটনার পরপরই সকাল ৯টার দিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে তালা ঝুলিয়ে দেন ইন্টার্ণ চিকিৎসকরা। এসময় চিকিৎসা না পেয়ে হাসপাতালের বাইরে আহাজারি করেন অনেক রোগী। অমানবিক এই চিত্র সাধারণ মানুষের মনে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে ঘৃণার জন্ম দেয়।

মহেশখালী উপজেলার শামলাপুর ইউনিয়ন থেকে স্ত্রীকে (প্রসূতি রোগী) নিয়ে হাসপাতালে আসেন আয়াতুল্লাহ। তিনি বলেন, সকাল ১০টা থেকে এসে হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষা করি। কিন্তু জরুরি বিভাগের দরজা বন্ধ থাকায় হাসপাতালে ঢোকা যায়নি।

তিনি প্রশ্ন তুলেন, সরকারি হাসপাতালে কেন তালা লাগাবে?

আবারও ডাক্তারকে মারধর রোগীর স্বজনের, ৫ ঘণ্টা বন্ধ ছিল চিকিৎসা

বেলা দেড়টার দিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগসহ সবখানে চিকিৎসা সেবা চালু হলেও কাজে যোগ দেননি ইন্টার্ণ চিকিৎসকরা। শুধুমাত্র সরকারী চিকিৎসকরা চিকিৎসা সেবা চালু রেখেছেন।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. শাহীন মো. আবদুর রহমান চৌধুরী বলেন, রোগীর স্বজনদের আরও সংযত হওয়া উচিত। কথায় কথায় চিকিৎসকদের মারতে তেড়ে আসেন। যাকে (চিকিৎসক) রোগীর স্বজনরা লাঞ্চিত করেছেন তিনি ওই ওয়ার্ডের চিকিৎসকও নন।

তিনি বলেন, বিশৃঙ্খল ঘটনার কারণে ইন্টার্ণ চিকিৎসকরা কর্মবিরতি শুরু করেছিলেন। একারণে জরুরি বিভাগও বেশ কিছুক্ষণ বন্ধ ছিল। তবে দুপুর থেকে স্বাভাবিক হয়ে যায়।

ইন্টার্ণ চিকিৎসকরাও শিগগিরই কাজে যোগ দেবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

এদিকে কথায় কথায় সদর হাসপাতালে ইন্টার্ণ চিকিৎসকরা কর্মবিরতির নামে চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে দেয়ায় ক্ষুব্দ হয়ে উঠেছেন সাধারণ মানুষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও চিকিৎসকদের এ ধরণের আচরণে নিন্দার ঝড় উঠেছে।

এর আগে গত ৪ এপ্রিল ‘ভুল চিকিৎসা’য় আনোয়ার হোসেন নামে রোগী মারা যাওয়ার ঘটনায় হাসপাতালের এক চিকিৎসককে মারধর করে রোগীর স্বজনরা। এ ঘটনার জের ধরে টানা চারদিন বন্ধ ছিল চিকিৎসা সেবা। কর্মবিরতি চলাকালীন চিকিৎসা না পেয়ে হাসপাতালের বাইরে কয়েকজন রোগী মারা গেছেন বলেও অভিযোগ আছে।