নিউজিল্যান্ডের মতো হামলা আরও হবে?

নিউজিল‌্যান্ডের মসজিদে ইসলামপন্থী জঙ্গি ও অভিবাসীদের ওপর ক্ষোভ থেকেই হামলা

 

গত মাসের মাঝামাঝি মুহুর্মুহু গুলির শব্দে কেঁপে উঠেছিল নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ। ব্রেনটন টারান্ট নামের এক অস্ত্রধারীই কেড়ে নেন প্রায় ৫০ জন মানুষের জীবন। ওই ঘটনার পর ২১টি দিন কেটে গেছে। এর পর পরই উগ্র ডানপন্থী মতবাদ নতুন করে আলোচনায় আসে। বিশেষ করে, শ্বেত জাতীয়তাবাদী সন্ত্রাস নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। বলা হচ্ছে, এই আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েই ব্রেনটন নিউজিল্যান্ডের দুই মসজিদে হামলা চালিয়েছেন। প্রশ্ন হলো—পুরো বিশ্বে এই উগ্র ডানপন্থী আদর্শ কতটুকু ছড়িয়েছে? নিউজিল্যান্ডের মতো হামলা কি আরও হতে পারে?

শ্বেত জাতীয়তাবাদী সন্ত্রাস একটি উগ্র ডানপন্থী আদর্শ। এর মূল ভিত্তি গায়ের রং বা বর্ণ। ইউরোপ-আমেরিকার শ্বেতাঙ্গদের কেউ কেউ মনে করছেন, তাঁরাই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অ্যাডলফ হিটলারও একই দৃষ্টিভঙ্গিতে জার্মানদের শ্রেষ্ঠ মনে করতেন এবং নিজেদের আর্য দাবি করে বিশ্ব শাসন করতে চেয়েছিলেন। বর্তমানে নব্য নাৎসিরা এখনো হিটলারের আদর্শ বহন করে চলেছেন। অন্যদিকে শ্বেত জাতীয়তাবাদী সন্ত্রাসে বিশ্বাসীরা মনে করেন, ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া ‘গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’ তত্ত্বই সঠিক। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশ থেকে আমেরিকা-ইউরোপে আসা অশ্বেতাঙ্গ অভিবাসীরা শ্বেতাঙ্গদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। তাই অভিবাসী অশ্বেতাঙ্গরা এই ডানপন্থীদের দুই চোখের বিষ। অভিবাসীবিরোধী লাগাতার মিটিং-মিছিলও হচ্ছে এসব দেশে, চলছে হামলা-সহিংসতাও।

ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত গ্লোবাল টেররিজম ডেটাবেইস অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৭—এই বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামি জঙ্গিদের হামলায় নিহতদের চেয়ে উগ্র ডানপন্থীদের হামলায় নিহতের সংখ্যা বেশি। হিসাব অনুযায়ী, এই সময়সীমার মধ্যে উগ্র ডানপন্থীদের হামলায় নিহতের সংখ্যা ৯২। অন্যদিকে ইসলামি জঙ্গিদের হামলায় নিহত হয়েছেন ৩৮ জন। আর ইউরোপে ২০১০ সাল থেকেই উগ্র ডানপন্থীদের চালানো হামলায় নিহত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, গত ছয় মাসে উগ্র ডানপন্থীদের চালানো বেশ কটি হামলার ঘটনা দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পিটসবার্গের একটি সিনাগগে হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয় ১১ জনকে। ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট ইমান্যুয়েল ম্যাঁখোকে হত্যার একটি ষড়যন্ত্র ভন্ডুল করে দিয়েছে পুলিশ। স্পেনে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজকে হত্যার আরেক ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে সেখানকার পুলিশ। জার্মানিতে সেনাবাহিনীর ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা একটি চরমপন্থী গোষ্ঠীর স্বরূপ উদ্‌ঘাটন করতে পেরেছে কর্তৃপক্ষ। জার্মান সরকার বলছে, ওই গোষ্ঠী নাকি দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও অন্যান্যদের হত্যা করতে চেয়েছিল। ওদিকে গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে ডানপন্থায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এক কোস্টগার্ড কর্মকর্তাকে। ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) বলছে, ওই কর্মকর্তা নাকি অস্ত্রের ভান্ডার গড়ে তুলেছিলেন এবং তালিকা ধরে ধরে ডেমোক্র্যাট রাজনীতিবিদদের হত্যা করতে চেয়েছিলেন।

ওপরের পরিসংখ্যান থেকে এটি স্পষ্ট যে—পুরো পশ্চিমা বিশ্বেই শ্বেত জাতীয়তাবাদী সন্ত্রাস ভালোভাবেই ছড়িয়ে পড়েছে। তবে পশ্চিমারা হিসাব রাখার বেলায় বেশির ভাগ সময়ই শ্বেত জাতীয়তাবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ অপরাধকে ‘সন্ত্রাস’ বলে ধরতে চান না। নরওয়ের সেন্টার ফর রিসার্চ অন এক্সট্রিমিজমের গবেষক জ্যাকব অসলান্দ রাভনদাল বলছেন, আন্তর্জাতিক আইনি সংজ্ঞা অনুযায়ী সন্ত্রাস বলতে বোঝানো হয় সেই অপরাধকে, যা পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সম্পাদিত হয়। কিন্তু উগ্র ডানপন্থী সন্ত্রাসীরা যেসব হামলা চালাচ্ছে, সেগুলো বেশির ভাগই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটছে। অর্থাৎ আইনি সংজ্ঞায় এগুলো সন্ত্রাসের মধ্যে পড়ছে না। এমনকি একটি শরণার্থীশিবিরে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অপরাধকেও ‘হেট ক্রাইম’ হিসেবে নথিবদ্ধ হচ্ছে, সন্ত্রাস হিসেবে নয়।

এ কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ইউরো পোলের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, ২০১৭ সালে উগ্র ডানপন্থীদের চালানো সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যা মোট সংখ্যার মাত্র ৩ শতাংশ। জ্যাকব অসলান্দ রাভনদাল বলছেন, একটি নির্দিষ্ট আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সন্ত্রাসী হামলা যেমন জঙ্গিরা চালায়, তেমনি চালায় উগ্র ডানপন্থীরাও। রাভনদালের হিসাবে, ডানপন্থীদের চালানো হামলার সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।

ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে হামলা চালানো ব্রেনটন টারান্ট নিজের আদর্শ নায়ক হিসেবে অ্যান্ডার্স ব্রেইভিকের নাম উল্লেখ করেছে। এই ব্রেইভিক ২০১১ সালে নরওয়েতে ৭৭ জনকে হত্যা করেছিল। বিশ্লেষকেরা বলছেন, শ্বেত জাতীয়তাবাদীরা সাধারণত সর্বসমক্ষে আসতে চান না। তারা স্বভাবে কিছুটা প্রচারবিমুখ। ব্রেনটন ও ব্রেইভিকের মতো ডানপন্থীরা এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তারা হামলা তো চালাচ্ছেই, আবার তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারও করছে! এদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সমাজে বিভক্তি ও বিভেদ বাড়ানো। কারণ যখন বিভেদ বেড়ে যায়, তখন চরমপন্থার বিস্তার ঘটানো সহজ হয়।

একই পন্থায় এগিয়েছিল ইসলামিক স্টেটও (আইএস)। এই জঙ্গিগোষ্ঠীটি চেয়েছিল, তাদের কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিমা বিশ্ব যেন মুসলিমদের ওপর নির্যাতন করে। এতে করে আইএসের মৌলবাদী আদর্শ আরও ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পেত। ঠিক একই প্রক্রিয়ায় উগ্র ডানপন্থীরা চাইছে, তাদের সহিংসতার পাল্টা প্রতিক্রিয়া যেন মুসলিমরা দেখায়। এতে করে তাদের শ্বেত জাতীয়তাবাদী আদর্শ আরও ছড়িয়ে পড়বে।

এদিকে এমন উগ্র ডানপন্থার উত্থানে বগল বাজাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভিক্টর অরবানের মতো রাষ্ট্রনায়কেরা। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান এরই মধ্যে অভিবাসীদের ঠেকাতে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন। মুসলিম অভিবাসনের বিরুদ্ধে বিরোধী মত ক্রমশই শক্তিশালী হচ্ছে জার্মানি, পোল্যান্ড, সুইডেন ও ইতালিতে। অর্থাৎ মূল ধারার রাজনীতিতে শ্বেত জাতীয়তাবাদী আদর্শের ব্যবহার ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

পশ্চিমা বিশ্বের জন্য আরও একটি শঙ্কার বিষয় হলো, এই দেশগুলোর সেনাবাহিনীতে এমন চরমপন্থী আদর্শ ভিত গাড়ছে। সেনারা প্রশিক্ষিত এবং অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ তারা পায়। এ জন্য এই বিষয়টি আরও গুরুতর। ১৯৯০ সাল থেকে আজ অবধি আমেরিকা ও ইউরোপজুড়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানো ১১৯ জন সন্ত্রাসীদের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, এদের মধ্যে ২৬ শতাংশের সেনাবাহিনীতে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল।

মিলিটারি টাইমস নামের একটি পত্রিকার চালানো জরিপে দেখা গেছে, ২০১৮ সালে মার্কিন সেনাবাহিনীর অর্ধেকেরও বেশি অশ্বেতাঙ্গ সদস্য বর্ণবাদী আচরণের শিকার হয়েছেন। ২০১৭ সালের তুলনায় এ ধরনের আচরণ বেড়েছে প্রায় ৪২ শতাংশ। গত মার্চ মাসেই হাফিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডানপন্থায় জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে সাতজন মার্কিন সেনাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের সেনাবাহিনীতেও একই সমস্যার বিস্তার দেখা দিয়েছে।

ক্রাইস্টচার্চে হামলার ঘটনাটি ঘটেছিল মার্চের ১৫ তারিখ। ওই দিন হামলার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। ওই সম্প্রচার বন্ধ করতে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সময় লেগেছিল ১৭ মিনিট। অর্থাৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও এমন অপরাধের ঘটনার প্রচার ঠেকানোয় অতটা পটু হয়নি। আবার ওই সরাসরি সম্প্রচারের পোস্টটি ১৫ লাখ বার রিপোস্ট করার চেষ্টা হয়েছিল। এ থেকে বোঝা যায় যে, সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরাও না জেনে-বুঝেই এমন নৃশংস অপরাধের প্রচারে সহযোগী হচ্ছেন। একটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে, চরমপন্থী ব্রেনটন টারান্ট কিন্তু এই প্রচারই চাইছিল।

অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের বেন নিম্মো বলছেন, ফেসবুক-টুইটারের মতো বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো অপরাধের প্রচার ঠেকাতে আরও অনেক কিছুই করতে পারে। কিন্তু তাদের কাছে এটি বিশাল পরিসরের কাজ। কারণ কোন পোস্ট চরমপন্থী—তা নির্ণয় করা কঠিন। কারও কাছে যেটি স্রেফ মশকরা, অন্যের কাছে সেটিই অস্ত্র হাতে নেওয়ার উসকানি হতে পারে। অর্থাৎ শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে এই বাছাইয়ের কাজটি নিখুঁতভাবে সমাধা করা যাবে না।

অবশ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সেই বিবেচনাবোধ না থাকলেও, রক্ত-মাংসের মানুষের কিন্তু আছে। পৃথিবীর মানুষের সেই মানবিকতা বোধের ওপরই তাই শেষ ভরসা। নিজেরা যদি চরমপন্থী ক্ষতিকর আদর্শের বিস্তার রোধে সচেতন না হই, ঘৃণার চাষাবাদে সার-পানি দেওয়া বন্ধ না করি—তবে একে নির্মূল করা সম্ভব নয়। নিউজিল্যান্ডের মতো শান্তিপূর্ণ দেশে হামলা চালানোর উদ্দেশ্য একটাই। তা হলো—বিশ্বে নিরাপদ স্থান বলতে কিছু নেই! আর এটি ভুল প্রমাণ করার দায়িত্ব আমাদেরই।