দলীয় আইনজীবীদের ‘পেশাগত সম্প্রীতি’র ফাঁদে খালেদা জিয়া!

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মামলা, গ্রেফতার ও জামিনের বিষয়ে দলীয় আইনজীবীদের পারস্পরিক মতবিরোধ চলে আসছে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে। মামলা পরিচালনা ও দায়িত্ববণ্টন বিরোধের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ‘পেশাগত সম্প্রীতি’র বিষয়টি। বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

বিএনপি সমর্থক আইনজীবীরা বলছেন, দলের বেশির ভাগ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বিচারের সঙ্গে ‘সংশ্লিষ্টদের’ বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে মামলা পরিচালনার বিপক্ষে। এর প্রতিফলন ঘটেছে গত ১৪ মার্চ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া ১০ বছরের সাজার রায় স্থগিত চেয়ে করা খালেদা জিয়ার লিভ টু আপিলে। একই ধারাবাহিকতায় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি পদেও হেরে গেছে বিএনপিপন্থী নীল প্যানেল।

বিএনপির জ্যেষ্ঠ ও তরুণ আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের সাজা হয়। ওই সাজা পরবর্তীতে হাইকোর্টের রায়ে বাড়িয়ে ১০ বছর করা হয়। আপিলের ওই আবেদনে আবদুর রেজ্জাক খান ভুল করে বসেন। পরে তিনি আদালতকে, ‘ড্রাফটে ভুল’ হয়েছে বলে জানান। এরপর থেকে এই ভুল ছড়িয়ে পড়ে জ্যেষ্ঠ থেকে নবীনে। চলছে পাল্টাপাল্টি দোষারোপ। আর এর রেশ পড়েছে খালেদা জিয়ার মামলা পরিচালনায়। সর্বশেষ তৈরি হয়েছে নতুন সমস্যা ‘পেশাগত সম্প্রীতি’।

জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নাল আবদীন বলেন, ‘আমাদের মধ্যে কোনও বিরোধ নেই। আমরা ঐক্যবদ্ধ। সরকারের সদিচ্ছা নেই বলে বেগম জিয়া মুক্তি পাচ্ছেন না। আমরা একের পর এক মামলায় তার জামিন নিয়েছি, কিন্তু মুক্তি দিচ্ছে না। প্রায় সবগুলোতে জামিন হয়েছে, দুটো বাকি আছে, এগুলোতেও হয়ে যাবে। বন্ধের পর চেষ্টা করবো বেগম জিয়ার জামিন করানোর জন্য। ’

বিএনপির একাধিক আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৪ মার্চ আপিল বেঞ্চে করা লিভ টু আপিলে প্রথম দিকে ‘বিচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট’ ব্যক্তিদের বিষয়ে বলা ছিল। এতে বলা হয়, কেন খালেদা জিয়ার সাজা বাড়ানো হয়েছে এবং এর পেছনে সুনির্দিষ্ট ‘রাজনৈতিক’ কারণ আছে। এই কারণগুলো রাখা না রাখাকে কেন্দ্র করে মার্চের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে কয়েকদফায় আইনজীবীদের বৈঠকে বিরোধপূর্ণ আলোচনা হয়। জ্যেষ্ঠদের মধ্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, এ জে মোহাম্মদ আলী, আবদুর রেজ্জাক খান, অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনের আপত্তিতে ‘বিচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট’দের প্রসঙ্গটি বাতিল করা হয়।

স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী একজন সদস্য জানান, বৈঠকে অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন উল্লেখ করেন— ‘বিচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট’দের বিষয়ে কিছু রাখা যাবে না। এটা বাদ দিতে হবে।’ যদিও সংশ্লিষ্টদের কোনও-কোনও ব্যক্তি বিশেষ রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনের সভাপতি হিসেবেও একসময় দায়িত্ব পালন করেছেন বলে দাবি করেন দেশের বিশিষ্ট একজন আইনজীবী।

বিএনপি নেত্রীর মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন জ্যেষ্ঠ ও একজন তরুণ অ্যাডভোকেট জানান— খালেদা জিয়ার মামলাটি শতভাগ রাজনৈতিক। এ সত্ত্বেও আইনজীবীদের অনীহা, অনাগ্রহ, ইগো সমস্যা, পেশাপ্রীতির কারণে সঠিকভাবে পরিচালনা হচ্ছে না।’

বিএনপির একজন যুগ্ম মহাসচিব জানান, একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খালেদা জিয়ার অন্তত চার-পাঁচটি মামলার শুনানিতে সময় মতো অংশ নেননি। এতে করে বিএনপি নেত্রীর শুনানি পিছিয়েছে। এমনকি নিজের মামলাকে প্রাধান্য দিয়ে ওই আইনজীবী তুলনামূলক তরুণদেরকে শুনানিতে অংশ নিতে বলেন।

অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন এপ্রসঙ্গে কোনও কথা বলতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘এ প্রসঙ্গে আমি কিছুই বলবো না।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য জানান, আইনজীবীদের সঙ্গে বৈঠকে সবচেয়ে বেশি প্রভাব খাটান ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তার সঙ্গে একই বলয় হিসেবে কাজ করেন খন্দকার মাহবুব হোসেন, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। বৈঠকে তার ছেলে ব্যারিস্টার নওশাদ জমির অংশগ্রহণ করায় তিনি অনেকটাই নীরব থাকেন। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আইনি বিষয়ে অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনকেই বেশি প্রাধান্য দেন।

বিএনপির আইনজীবীরা বলছেন, খালেদা জিয়ার মামলা পরিচালনা করার জন্য কোনও মনিটরিং সেল হয়নি। নেই কোনও কমিটিও। এমনকি সুপারভাইজ করার জন্য কোনও সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি বা আইনজীবীও নেই।

খালেদা জিয়ার উপদেষ্টামণ্ডলীর একজন সদস্য দাবি করেন, ‘ম্যাডামের মামলা পরিচালনায় সত্যিকার অর্থে কোনও সমন্বয় নেই। প্রথম সারির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ও তরুণ কয়েকজন ব্যারিস্টার ছাড়া বাকি আইনজীবীদের কোনও মতামতই নেওয়া হয় না। তারা এও জানেন না, কখন খালেদা জিয়ার শুনানি হবে।’ তিনি বলেন, ‘মামলার ক্ষেত্রে আমাদের অভিজ্ঞতা হচ্ছে— সরকারপক্ষ বা আদালতকে লাইনে-লাইনে আটকে দেওয়া যাবে, কিন্তু এটা করবে কে? সবাই নিজেকে বাঁচিয়ে যতটুকু পারেন কাজ করেন।’

বিরোধের বিষয়টি সত্যি নয় দাবি করেন অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম। খালেদা জিয়ার এই আইনজীবীর মতে, ‘দূর থেকে কারও কাছে এমন দৃষ্টিভঙ্গি হতে পারে। কিন্তু তা সঠিক নয়। মামলা মনিটরিং বা সমন্বয় হচ্ছে না— এটা আসলে বড় কিছু না, আমরা তো কাজ করেই যাচ্ছি। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাজা বহাল রাখেন আদালত।’

খালেদা জিয়ার মামলার বিবরণ দিয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘এই মামলার রায়ের বিরুদ্ধে আমরা অ্যাপিলেড ডিভিশনে আপিল ফাইল করে রেখেছি, এখনও শুনানি হয়নি। জিয়া চ্যারিটেবল মামলায় তার সাজা হয়েছে। সে মামলার রায়ের বিরুদ্ধেও আপিল ফাইল করে রেখেছি, তবে মুভ করিনি। নাইকো-গ্যাটকো ও বড়পুকুরিয়া মামলায় জামিনে আছেন বেগম জিয়া। যেহেতু অরফানেজ ও চ্যারিটেবল ট্রাস্টের মামলায় তিনি জামিন পাননি, এ কারণে তার বের হওয়ার সুযোগ নেই। এর মধ্যে ছোট ছোট মামলার শুনানিতে তাকে পাওয়া যায়নি বলে ওয়ারেন্ট ইস্যু করা হয়। যদিও তিনি কারাগারেই আছেন। পুরো বিষয়টা রাষ্ট্রীয় যাঁতাকলের মধ্যে আছে।’

নিম্ন আদালতে খালেদা জিয়ার মামলা পরিচালনা করেন, এমন একজন আইনজীবী জানিয়েছেন, মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবীদের মধ্যে সমন্বয়ের কাজ শুরু হয়েছে। এরইমধ্যে বড়পুকুরিয়া মামলার দায়িত্ব এ জে মোহাম্মদ আলী, গ্যাটকো ও নাইকো দুর্নীতি মামলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আবদুর রেজ্জাক খানকে।

মামলা নিয়ে জটিলতার বিষয়টি স্বয়ং খালেদা জিয়ার সামনেও ঘটেছে। গত ১৯ মার্চ পুরান ঢাকার পুরাতন কারাগারে স্থাপিত অস্থায়ী বিশেষ আদালতের শুনানিতে বিচারক শেখ হাফিজুর রহমান নাইকো দুর্নীতি মামলায় অব্যাহতির প্রসঙ্গটি তোলেন। ওই সময় খালেদা জিয়া তার আইনজীবী এ জে এম মোহাম্মদ আলীকে প্রশ্ন করেন, কেন অব্যাহতির আবেদন জমা হয় না। জবাবে তাকে জানানো হয়, ‘অব্যাহতির আবেদন তৈরি আছে, আদালতে দাখিল করে দেওয়া হবে।’

সেই আবেদন কবে জমা হতে পারে, এমন প্রশ্নের উত্তরে এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমি এসব বিষয়ে কথা বলতে আগ্রহী না।’

অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলামতবে অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম জানালেন— দীর্ঘসূত্রতার কারণ। আদালত ও মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা কিছু কাগজপত্র চেয়েছিলাম নাইকোর কাছে। জজ সাহেব আদেশও দিয়েছিলেন। যেসব কাগজ সিজ করা হয়েছিল তদন্তের স্বার্থে। আমরা বলেছিলাম— এই কাগজগুলো দেখে চার্জ হেয়ারিং করবো। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ এই কাগজগুলো দিচ্ছে না। কোর্টের আদেশ তারা মানে না, তারা সেই সার্টিফিকেটগুলো আমাদের দেয়নি।’

তিনি আরও বরেন, ‘‘গত তারিখে কোর্টের কাছে আমরা একটা আবেদন করেছিলাম, যেন কোর্ট নকলখানাকে আদেশ মতো কপি দেওয়ার কথাটি বলেন। কিন্তু আমরা রহস্যজনকভাবে দেখলাম, কোর্ট জানালেন— ‘আমরা এই আদেশ দেবো না।’ এরকমই পরিস্থিতি আমরা প্রত্যেক মুহূর্তে ফেস করছি। তারা অপপ্রচার ছড়ায় রাষ্ট্রপক্ষ বা কোর্টের ব্যর্থতাকেও আমাদের ব্যর্থতা হিসেবে আখ্যায়িত করে যে, আমাদের মধ্যে সমন্বয় নেই। আসলে আমাদের সমন্বয়ের কোনও অভাব নেই। আমরা যারা মামলাগুলো পরিচালনা করছি, তাদের সমন্বয়ের প্রয়োজন নেই, কারও নির্দেশেরও প্রয়োজন নেই। আমরা তো করেই যাচ্ছি।’

আইনজীবীরা মনে করেন, খালেদা জিয়ার মামলা পরিচালনা থেকে শুরু করে সর্বশেষ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে বিএনপি দলীয় আইনজীবীদের বিভক্তিকেই সামনে এনেছে। নির্বাচনে সভাপতি পদে হেরে গেছেন এ জে মোহাম্মদ আলী। যদিও সাধারণ সম্পাদক পদে বিজয়ী হয়েছেন ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন।

বিএনপির একজন আইনজীবীনেতা বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে বিএনপি দলীয় আইনজীবীরাই এ জে মোহাম্মদ আলীকে ভোট দেননি। সাবেক সভাপতি জয়নুল আবদীন ও অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী তাকে বিজয়ী দেখতে চাননি।’

প্রতিক্রিয়ায় অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘এটাতে কোনও প্রভাব পড়েনি।আমাদের সভাপতি প্রার্থী সাহেব ইনফ্যাক্ট সাধারণ আইনজীবীদের সঙ্গে যেভাবে আজকাল মিশতে হয়, ভোট চাইতে হয়,তিনি সেভাবে পারেন নাই।’

অ্যাডভোকেট খন্দকার তৈমুর আলম খন্দকারবিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট খন্দকার তৈমুর আলম খন্দকার বলেন, ‘আমাদের দলের নীতিনির্ধারকরা কী ভেবেছেন, কেন নির্বাচনে সভাপতি পদে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী হেরে গেলো? এর জন্য একটা মূল্যায়ন সভা করা দরকার ছিল, কেন হেরে গেলাম। যারা জিতেছেন তারা তো বুক ফুলিয়ে হেঁটেছেন কোর্টের বারান্দায়। কিন্তু দল যে হেরে গেলো, এর জবাব কে দেবেন?’

‘আমরা চাই সাংগঠনিকভাবে আমাদের আইনজীবীরা ঐক্যবদ্ধ হবেন। কিন্তু একথা বলতে গেলেই আমরা বিদ্রোহী। আমরা নেত্রীর মুক্তির দাবিতে ‘গণতন্ত্র ও খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন’ ব্যানারে প্রোগ্রাম করেছি, ফলে এখন আমরা বিদ্রোহী।’ আক্ষেপ করে বলছিলেন তৈমুর আলম খন্দকার।

এ বিষয়ে খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের অনেক সমস্যা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। প্রসিকিউশনে রাষ্ট্রযন্ত্রের একটা হস্তক্ষেপ অনুভূত হয়। মনে হয়— কেউ হস্তক্ষেপ করে। সমস্যা হচ্ছে রাষ্ট্র যদি নগ্নভাবে হস্তক্ষেপ করে, তখন আমাদের সমস্যাগুলো গৌণ হয়ে দাঁড়ায়। আমরা তো অযৌক্তিক কোনও আবেদনও করি না। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্নখাতে নেওয়ার জন্য আমাদের দোষারোপ করা হয়। রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের কারণেই আমরা সঠিক বিচার পাচ্ছি না। যদি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় কোর্ট চলতো, তাহলে আমরা বিশ্বাস— বেগম জিয়াকে আমরা মুক্ত করতে পারতাম। আমরা দূর থেকে অনুভব— আদালত স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চলে না।’