ছেলেকে নিয়েই সেই ভয়ঙ্কর হামলার দুঃস্বপ্ন ভুলতে চান মুশফিক

ক্রাইস্টচার্চে ভয়ঙ্কর হামলার পর দ্রুততম সময়ে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে ক্রিকেট দলকে। শুক্রবারের সেই রক্তাক্ত স্মৃতি সহজে ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। তবে শনিবার রাতে দেশে ফিরে কিছুটা হলেও স্বস্তিতে ক্রিকেটাররা। মুশফিক-তামিমরা প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটিয়ে দুঃসহ অভিজ্ঞতা মন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করছেন।

মুশফিক কিছুটা নরম স্বভাবের। ওই ঘটনার পর ভীষণ নার্ভাস হয়ে পড়েছিলেন দেশসেরা উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান। দেশে ফিরে ছেলে মোহাম্মদ শাহরোজ রহিম মায়ানকে আদর করে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। রবিবার মুশফিকের বাবা মাহবুব হানিফ বলেছেন, ‘আজ বাসায় অনেক আত্মীয়-স্বজন এসেছিল। তাদের সঙ্গে কথা বললেও মুশফিক বেশিরভাগ সময় ছেলের সঙ্গেই ছিল। কাল রাতে বাসায় ফিরে ঘণ্টা খানেক বাচ্চার সঙ্গে খেলেছে। তবে ও খুব কম কথা বলছে। আমরা ওকে ওর মতো থাকতে দিচ্ছি।’

সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথা বলছেন মুশফিকের বাবা মাহবুব হানিফছোট্ট মায়ান অবশ্য প্রথম দেখায় বাবাকে চিনতেই পারেনি! মায়ানেরই বা কী দোষ, প্রায় দেড় মাস তার বাবা ছিলেন নিউজিল্যান্ডে। তাই বাবাকে চিনতে না পেরে শুরুতে কোলে যেতে চায়নি। মুশফিকের বাবা জানালেন, ‘আমার নাতি তো শুরুতে বাবাকে চিনতেই পারেনি। অনেকদিন পর দেখেছে তো। তাই কাল রাতে মুশফিকের কোলে যেতে চায়নি। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাবাকে চিনতে পারছে। আজ সারাদিন বাবার সঙ্গেই ছিল মায়ান।’

শুক্রবার ঘটনার পর থেকেই ভীষণ দুশ্চিন্তায় ছিলেন মুশফিকের বাবা-মা-স্ত্রী। মুশফিক সহ ক্রিকেটাররা নিরাপদে দেশে ফেরায় তারা এখন স্বস্তিতে। মাহবুব হানিফ বললেন, ‘ঘটনার পর থেকে আমাদের পরিবারের কেউ স্বস্তিতে ছিল না। মুশফিকের মা এবং আমার বউমা খুব টেনশনে ছিল। ও ঘরে ফেরার পর সব টেনশন দূর হয়েছে।’

ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়িতে ফোন করেছিলেন সৌম্যতিনি জানালেন, ক্রাইস্টচার্চের ভয়ঙ্কর ঘটনা এখনও তাড়া করে বেড়াচ্ছে মুশফিককে, ‘ওকে দেখে মনে হচ্ছে এখনও ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। যদিও আজ সারাদিন নানাভাবে ব্যস্ত রেখেছে নিজেকে। আসলে আমার ছেলে বেশ নরম স্বভাবের, এসব সে নিতে পারে না।’

মুশফিকের বাবা আরও বললেন, ‘আজ সকালে রিয়াদের (মাহমুদউল্লাহ) সঙ্গে কথা হচ্ছিল। রিয়াদ বলছিল, স্বয়ং আল্লাহ ওদের বাঁচিয়েছেন। অমন পরিস্থিতি থেকে তো বেঁচে ফেরার কথাই নয়!’

সেদিন দলের সঙ্গে ছিলেন সৌম্য সরকার। ঘটনার পর ফোন করে বাবাকে জানিয়ে দেন, নিরাপদে আছেন তিনি। সৌম্যর বাবা কিশোরী মোহন সরকার জানালেন, ‘ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়িতে ফোন করেছিল সৌম্য। পার্ক থেকে মাঠ, মাঠ থেকে হোটেল সব জায়গায় সে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল। তবে বাবা-মার দুশ্চিন্তা কী আর এত সহজে যায়! আমরা বিসিবি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। ক্রিকেটাররা নিরাপদে আছে বলে তারা আশ্বস্ত করেছেন আমাদের। বিমানে ওঠার আগ পর্যন্ত সারাক্ষণ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে সৌম্য।’

দেশের বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পেরে স্বস্তি পাচ্ছেন মিঠুনশাহজালাল বিমানবন্দর থেকে মিরপুরে বড় ভাইয়ের বাসায় চলে গেছেন সৌম্য, এখন আছেন সেখানেই। বাঁহাতি ব্যাটসম্যানের বাবা বললেন, “কাল ওরা ফেরার পর বুক থেকে পাথর নেমে গেছে। সৌম্য এখন ওর বড় ভাইয়ের বাসায় আছে। আজ বিকেলে সৌম্যর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে। ওকে বলেছি, ‘তুমি মাঠে যাও, সবার সঙ্গে কথা বলো, ওই ঘটনা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করো। অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত রাখো নিজেকে।”

আরেক বাঁহাতি ব্যাটসম্যান মুমিনুল হক এখন ঘুমের মধ্যেও চমকে উঠছেন। তিনি বললেন, ‘আল্লাহ নিজ হাতে আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছেন। ঘুমের ভেতরেও ওই ঘটনা তাড়া করছে আমাকে। লাঞ্চ করে মসজিদে গিয়েছি বলেই সময় নষ্ট হয়েছে, আর এটাই আমাদের বেঁচে যাওয়ার কারণ। এই ট্রমা থেকে বের হতে হয়তো কিছুদিন লাগবে। দেশে ফিরে পরিবারের সবার সঙ্গে সময় কাটাতে খুব ভালো লাগছে।’

ক্রাইস্টচার্চের ঘটনা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন এবাদতদেশে ফিরলেও এখনও বাড়ি যেতে পারেননি এবাদত হোসেন। সোমবার সকালে সিলেটে নিজের বাড়িতে যাওয়ার কথা এই পেসারের। মিরপুর ক্রিকেট একাডেমি থেকে তিনি বললেন, ‘বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। এখন বাড়ি যাওয়ার অপেক্ষায় আছি। দেশে ফিরে খুব ভালো লাগছে। চেষ্টা করছি ওই ঘটনা ভুলে যাওয়ার।’

দেশের বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পেরে মোহাম্মদ মিঠুনও স্বস্তিতে, ‘ঘটনার পর থেকেই আমরা চিন্তা করছিলাম কত তাড়াতাড়ি আমরা দেশে ফিরতে পারবো। যেভাবেই হোক আমরা ফিরে এসেছি। দেশের বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পেরে খুব ভালো লাগছে, প্রিয়জনদের কাছে পেয়ে স্বস্তি পাচ্ছি।’