নাইক্ষ্যংছড়িতেও ভোটের লড়াই সোমবার, লড়াইয়ে সেই দুই ‘আ.লীগ’ই!

নাইক্ষ্যংছড়িতেও ভোটের লড়াই সোমবার, লড়াইয়ে সেই দুই ‘আ.লীগ’ই!

পার্বত্য বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ আগামিকাল সোমবার (১৮ মার্চ)। সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলবে। ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে ভোটগ্রহণের সব প্রস্তুতি।

নির্বাচনী সব সরঞ্জাম ইতিমধ্যে উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের ২৫টি ভোট কেন্দ্রে পৌঁছে গেছে। ভোটের পরিবেশ সুষ্ঠু রাখতে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকছেন। এদের মধ্যে সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, আনসার ও বিজিবি সদস্যরা থাকবেন।

নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের সহকারি রিটার্নিং কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আবু জাফর ছালেহ বলেন, ২৫টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ৬টি ভোটকেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সহিংসতা প্রতিরোধ ও বহিরাগতদের আনাগোনা ঠেকাতে উপজেলার দশটি স্থানে পুলিশের অস্থায়ী তল্লাশি চৌকি বসানো হয়েছে।

এবার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের কোন প্রার্থী না থাকলেও ভোটারের সরব উপস্থিতি থাকবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। কোন প্রার্থীকে ভোট দিলে উন্নয়ন হবে, কিংবা কার অতীত কী রকম? শেষ মুহুর্তে এ ধরণের হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত ভোটাররা।

নাইক্ষ্যংছড়ি হাজী এম কালাম সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সুদীপ্ত তারেক বলেন, এখানে সংসদ নির্বাচন হলেও তা জমেনি। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সব দলের প্রার্থী অংশ না নিলেও সত্যিকারের নির্বাচনী আমেজ পাওয়া যাচ্ছে।

সদর ইউনিয়নের আদর্শ গ্রামের ভোটার শফিকুর রহমান (২২) বলেন, এলাকার উন্নয়ন ও শিক্ষার প্রসারে যে প্রার্থী ভূমিকা রাখবেন, তাঁকেই আমরা ভোট দেব।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাদিয়া আফরিন কচি বলেন, নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে চারজন, ভাইস চেয়ারম্যান পদে চার ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে তিনজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ভোটার ৩৭ হাজার ৪৯২ জন। ভোট কেন্দ্র ২৫টি।

চেয়ারম্যান প্রার্থীরা হলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী অধ্যাপক মো. শফিউল্লাহ (নৌকা), স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতা আবু তাহের (মোটরসাইকেল), চোচু মং মার্মা (উড়োজাহাজ) ও ফরিদুল আলম (আনারস)। তবে মূল লড়াইয়ে আছেন অধ্যাপক মো. শফিউল্লাহ ও আবু তাহের।

ভাইস চেয়ারম্যান পদে আছেন উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইমরান (তালা), যুবলীগ নেতা মংলা মার্মা (টিউবওয়েল), শাজাহান কবির (টিয়া পাখি) ও উপজেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি জহির উদ্দিন (চশমা)। ভাইস চেয়ারম্যান পদে মংলা মার্মা, ইমরান ও শাজাহানের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হবে।

মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে আছেন বিএনপির বহিস্কৃত নেত্রী হামিদা চৌধুরী (ফুটবল), প্রয়াত বিএনপি নেতার স্ত্রী শামীমা আক্তার (প্রজাপতি) ও আওয়ামী লীগ নেত্রী ওজিফা খাতুন রুবি (কলসি)। মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে অনেকটা এগিয়ে রয়েছে হামিদা চৌধুরী।

আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী অধ্যাপক মো. শফিউল্লাহ জানান, দলের মনোনয়ন ও উপজেলাবাসীর অনুগ্রহে এবার তিনি এই পদে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। নির্বাচিত হয়ে উপজেলাবাসীর সেবা করতে চান।

স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী আবু তাহের বলছেন, তাঁর পক্ষে গোপনে জামায়াত-বিএনপির নেতাকর্মীরাও কাজ করছেন। তাই জয়ের ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।

শেষ মুহুর্তে পাল্টে যাওয়া ভোটের চিত্র
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী অধ্যাপক মো. শফিউল্লাহ (নৌকা) ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। এতোদিন স্বতন্ত্র প্রার্থী মোটর সাইকেল প্রতীকের আবু তাহেরের অবস্থান তুলনামূলক ভাল চলছিল বলে খবর রটে সর্বত্র। কিন্তু শেষ মুহুর্তে পাল্টে যায় সেই ভোটের চিত্র।

উপজেলার ভোট ব্যাংকখ্যাত বাইশারীতে অধ্যাপক মো. শফিল্লাহকে জেতাতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন সর্বস্তরের জনগণ। সেই সঙ্গে নাইক্ষ্যংছড়ি সদর, সোনাইছড়ি, ঘুমধুম ও দোছড়ি ইউনিয়নেও শুরু হয়েছে শফিউল্লাহ’র নৌকা প্রতীকের গণজোয়ার। উপজেলার অধিকাংশ বর্তমান ও সাবেক চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য, হেডম্যান-কার্বারি, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সর্বস্তরের নেতা-কর্মী একাকার হয়ে রব তুলেছে ‘শফিউল্লাহ’ ‘শফিউল্লাহ’ স্লোগানে।

ভোটাররা বলছেন, সম্প্রতি শফিউল্লাহ আবেগ ছোঁয়া বক্তব্য দিয়ে ভোট ভিক্ষা চেয়েছেন। তিনি বক্তব্যে বলেছেন, জনসেবা করার মানসে তিনি সরকারি কলেজের শিক্ষকতা ছেড়েছেন। মানুষের দুয়ারে দুয়ারে যাচ্ছেন। তাঁর প্রয়াত বাবা ছালেহ আহমদ নাইক্ষ্যংছড়ির রূপকার। বাবার মতো শফিউল্লাহও নাইক্ষ্যংছড়ির সার্বিক উন্নয়নে কাজ করবেন। জনগণের সুখে দুঃখে থাকবেন। সেই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর থেকে ভোটারদের মনিকোঠায় স্থান পেয়েছে শফিউল্লাহ।

অন্যদিকে ১৫ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার কারণেও শফিউল্লাহর ভোট বেড়েছে।

প্রসঙ্গত, অধ্যাপক মো. শফিউল্লাহ নৌকা প্রতীক বরাদ্দ পাওয়ার পর চলো ‘এবার বদলে দেই নাইক্ষ্যংছড়ি’ স্লোগানে ইশতেহার ঘোষণা করেন। সেই ইশতেহারগুলো হচ্ছে, ১. নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলাকে পৌরসভায় রূপান্তর, উপজেলায় নতুন তিনটি ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা, পর্যটন কমপ্লেক্স স্থাপন, পানীয় জলের সমস্যার দূরীকরণ, বিশেষ অর্থনৈতিক জোন গড়ে তোলা, উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নাইক্ষ্যংছড়িতে মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা, আবাসিক সুবিধাসহ মান সম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন, হাজী এম এ কালাম সরকারি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর, চাকঢালা ও ঘুমধুমের প্রস্তাবিত বাণিজ্যিক ট্রানজিটের (স্থলবন্দর) পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন, ঘরে ঘরে শতভাগ বিদ্যুতায়ন নিশ্চিত করা, আর্থ সামাজিক উন্নয়নে কৃষি, মৎস্য ও পশু সম্পদের সম্প্রসারণ, মহাসড়কের সঙ্গে সংযুক্ত নাইক্ষ্যংছড়ি ছালেহ আহমদ সড়কের সম্প্রসারণ, স্থানীয় ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বেকারত্ব দূরীকরণ এবং মসজিদ-মন্দির-গির্জা ও ক্যাং ঘরের আধুনিকায়ন।

উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে এসব ইশতেহার বাস্তবায়ন করবেন বলে জানান অধ্যাপক মোঃ শফিউল্লাহ।