ইসলামে পর্দা প্রথা এবং ভবিষ্যতের মুসলিম নারী

ইসলামে পর্দা প্রথা এবং ভবিষ্যতের মুসলিম নারী

:: গোলজার সালেহ ::
বর্তমানে মুসলিম নারীরা যেভাবে ধর্ম চর্চা করেন তা তাদের পূর্বসূরি মা এবং দাদিদের থেকে একেবারেই আলাদা। আমার ৮১ বছর বয়সী মা পবিত্র কোরআনের আরবি ভাষা পড়তে, লিখতে এবং বলতে পারতেন না।

কিন্তু এর পরেও তিনি সৃষ্টিকর্তাকে ভয় পেতেন এবং এ কারণে তিনি পবিত্র কোরআনের কিছু আয়াত মুখস্ত করেছিলেন আর তিনি তার মাথা ঢেকে রাখতেন। এমনকি তিনি পবিত্র কোরআনের এসব আয়াতের অর্থ বুঝতে পারতেন না কিন্তু তিনি সালাত আদায় করার জন্য তা মুখস্ত করেছিলেন।

আমার বয়স যখন আট বছরে পৌঁছায় তখন আমার মা আমাকে বলেছিলেন যে, যদি তুমি ‘ভালো মুসলিম’ হতে চাও তবে তোমাকে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ সঠিক ভাবে অনুসরণ করতে হবে।

সেসময় আমি মনে করতাম একজন ‘ভালো মুসলিম’ হওয়াটা খুবই কষ্টকর একটি বিষয়। আমার অনুভব হতে থাকে যে আমার মা আমাকে পবিত্র কোরআনের আয়াত সমূহ মেনে চলতে বলতেন, কারণ আমি একই সাথে পবিত্র কোরআন পড়তে পারি এবং এর মর্মার্থ অনুধাবন করতে পারি।

পর্দা করার বিষয়ে আমি যখন আমার মায়ের নিকট জানতে চাই তিনি তখন আমাকে জানিয়েছিলেন যে, নারীদের শরীর ঢেকে রাখার বিষয়টি সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

মুসলিমদের মধ্যকার বেশ কয়েকটি স্কুল অব থট রয়েছে যারা বিভিন্ন ভাবে কোরআনের ব্যাখ্যা দিয়েছে। ইসলাম আমাদের জানায় যে, একজন নারী অবশ্যই নিজেকে ঢেকে রাখবে এবং তা অবশ্যই শালীন হতে হবে।

শালীনতার বিষয়ে খ্রিষ্টান ধর্মে ঠিক একই ধরনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কিন্তু পবিত্র কুরআন একই সাথে পুরুষদের কেও শালীন হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে এবং তাদেরকে তাদের চক্ষু অবনত রাখতে বলেছে।

আর আমি বর্তমানে মুখ ঢেকে রাখিনা। আমি মনে করি আমার মা আমাকে এ বিষয়ে জোর করেন নি অথবা আমি এমন এক নারী যে নিজের বিশ্বাসকে নিজের মত করে ব্যাখ্যা দিতে সচেষ্ট।

আমি উত্তর ইরাকে ২৪ বছর যাবত মুসলিমদের মধ্যে বসবাস করেছি। আমি সেখানে দেখেছি যে, শুধুমাত্র বৃদ্ধ মুসলিম মহিলারা মুখ ঢেকে রাখে কিন্তু আমার বয়সী কেউই মুখ ঢেকে রাখে না।

বর্তমান প্রজন্মের মত সেকালের প্রজন্মের নারীরা নারীবাদ সম্পর্কে তেমন একটা জ্ঞাত ছিলনা। নারীদের উপর বৈষম্য সম্পর্কে বিতর্ক করার মত সুযোগ তাদের নিকট ছিলনা যা বর্তমান প্রজন্ম সঠিক ভাবেই কাজে লাগায়।

মুসলিম নারীদের বুঝতে হলে আমাদের জন্য আদম হাওয়ার বিষয় বর্ণনা করা স্বর্গীয় বাণীর দ্বারস্থ হতে হবেনা। আমি ধর্মীয় ক্লাসে নবী মুহাম্মদ(সা.) এর স্ত্রী খাদিজা(রা.) সম্পর্কে জেনেছি। সেখানে আমি শিখেছি যে, তিনিই হলেন প্রথম নারী যিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলে। তিনি তাঁর স্বামী নবী মুহাম্মদ(সা.) কে ইসলাম প্রচারে যথেষ্ট সহযোগীতা করেছিলেন।

খাদিজা(রা.) পবিত্র কোরআনের বানী সমূহ মুখস্ত করে রাখতেন এবং তা আরবদের মধ্য প্রচার করতেন এভাবেই তিনি অনেক অবিশ্বাসী কে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার জন্য প্রভাবিত করেছিলেন।

আর খাদিজা(রা.) এর মৃত্যুর পর নবী মুহাম্মদ(সা.) এর স্ত্রী আয়েশা(রা.) ইসলাম প্রচারে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছিলেন এবং তিনি আরবদের কে ইসলাম ধর্ম চর্চা করতে উৎসাহ যুগিয়েছিলেন।

তিনি একই সাথে পবিত্র কোরআনের বাণী এবং হযরত মুহাম্মদ(সা.) এর হাদীস প্রসারে সচেষ্ট ছিলেন। এভাবেই তিনি প্রথম দিককার ইসলামের সবচেয়ে প্রভাবশালী নারী বিশেষজ্ঞ বনে যান।

নবী মুহাম্মদ(সা.) এর স্ত্রী গন এবং সমসাময়িক মুসলিম নারীগণ সংস্কৃতি দ্বারা বাধ্য হয়ে ইসলাম চর্চা করেন নি বরং তারা জেনে বুঝে নিজেদের ইচ্ছাতেই ইসলাম ধর্ম চর্চা করেছিলেন। অন্যদিকে মুখ ঢেকে রাখার প্রথা চালু হয় চতুর্থ দশ শতাব্দিতে।

যদিও মুখ ঢেকে রাখার মাধ্যমে বেশিরভাগ মুসলিম নারী ধর্মীয় মূল্যবোধ ধরে রেখেছেন। আর ১৯৭০ সালের দিকে নাটকীয় ভাবে মুসলিম নারীদের মধ্যে মুখ ঢেকে রাখার রীতি চালু হয়। ইসলামের ইতিহাস অধ্যয়ন করলে এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত নিলে এ বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায় যে, মুসলিম নারীরা পর্দা পরিধান করেন শুধুমাত্র তাদের বিশ্বাসের জন্যই।

মুখ ঢেকে রাখার প্রথা আসলে মুসলিমদের কোনো প্রথা নয় এবং মুসলিমরা এর আবিস্কার করেনি। এই প্রথাটি মূলত ইসলাম আসার অনেক পূর্ব থেকে ইহুদিদের মধ্য জনপ্রিয় ছিল।

আর ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ১১ তারিখ যুক্তরাষ্ট্রে হামলার পর থেকে মুখ ঢেকে রাখে এমন পর্দা কে পুরো বিশ্বের জন্য হুমকী বলে গণ্য করা শুরু হতে থাকে।

যুক্তরাজ্যে যেসব নারী মুখ ঢেকে রাখেন তাদের কে দেখা হয় দুর্বল, বৈষম্যের শিকার এবং সন্ত্রাসী হিসেবে। কিন্তু যদিও ইহুদি এবং খ্রিষ্টান ধর্মের চাইতে ইসলামে নারীদের মর্যাদা অনেক বেশী।

পবিত্র কোরআনের আয়াত সমূহের ঠিক কি ধরনের ব্যাখ্যা হবে এবং তা করার জন্য কোন ধরনের বিশেষজ্ঞ গুন প্রয়োজন তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ইসলামিক আইন অনুযায়ী দুজন নারীর সাক্ষ্য একজন পুরুষ সাক্ষ্যের সমান কারণ নারীদের কে প্রতি মাসে একবার মাসিক কালীন সময় পার হতে হয় আর এজন্যই এসময় তাদের সাক্ষ্যকে নির্ভরযোগ্য হিসেবে বিবেচিত করা যায় না।

বর্তমানে ইসলাম ধর্ম শুধুমাত্র সবচেয়ে দ্রুত বর্ধমান একটি ধর্মই নয় একই সাথে এর মুখ ঢেকে রাখার চর্চা একেবারেই বিস্ময়কর একটি ব্যাপার।

এ জন্য মূলত দুটি বিষয় কাজ করেছে। এর একটি হচ্ছে শিক্ষা এবং অন্যটি হচ্ছে পারিবারিক চাপ।

শিক্ষা ইসলাম ধর্মকে আরো বেশী করে বুঝতে সহায়তা করে এবং পবিত্র কোরআনের আয়াত সমূহকে সহজ করে তোলে। অন্যদিকে পরিবারের সদস্যরা, বন্ধুবান্ধব অথবা সমাজের সদস্যগণ মুখ ঢেকে রাখে এমন পর্দা পরিধান করতে উৎসাহ যোগায়।
২১ শতকের সমাজ নারী নারী শরীরকে হলিউডের নায়িকাদের শরীরের আদলে বিবেচনা করে থাকে। কিছু কিছু মুসলিম নারী বর্তমানে বসবাস করতে পছন্দ করে এবং তারা তাদের পুরো মনোযোগ তাদের আকর্ষণের দিকে নিবন্ধ রাখে।

তারা আঁট সাঁট পোশাক পরিধান করে, দামী মেকআপ নেয়, নখ পালিশ করে, চুল রং করে, হাই হিলের জুতো পরিধান করে যাতে তাদেরকে দেখতে হলিউডের নায়িকাদের মত দেখায়।

সমসাময়িক যেসকল মুসলিম নারী মুখ ঢেকে রাখে তারা সমাজের এই পরিবর্তন থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছেন। তারা তাদের বিশ্বাস এবং প্রতিদিনকার চর্চার মাধ্যমে এমন একটি ইসলামী সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে তুলেছেন যার মাধ্যমে তারা নারী অধিকার, স্বাধীনতা, আত্ম মর্যাদা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হচ্ছেন।

অধিকন্তু ভবিষ্যতের মুসলিম নারীদের মধ্যে মুখ ঢেকে রাখার প্রচলন ধীরে ধীরে ইসলামি বিশ্বাসের সাথে একীভূত হয়ে যাবে। অন্যদিকে ভবিষ্যতের পশ্চিমা মুসলিম দেশ সমূহে পর্দা তথা মুখ ঢেকে রাখার প্রচলনকে দেখা হবে সন্ত্রাসীদের সাথে একাত্ম হিসেবে।
সূত্র: ইনপলিসিডাইজেস্ট ডটকমে প্রকাশিত গোলজার সালেহ এর কলাম থেকে।