মাতামুহুরী নদীতে বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম, দুদকের অভিযানে প্রকৌশলী বরখাস্ত

মাতামুহুরী নদীতে বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম, দুদকের অভিযানে প্রকৌশলী বরখাস্ত

কক্সবাজারের বৃহত্তর উপজেলা চকরিয়ায় মাতামুহুরী নদীর তীর সংরক্ষণের জন্য সিসি ব্লক তৈরি হচ্ছে ময়লা বালু (পলি মাটি) দিয়ে। এ কাজে সিলেটের পাথর ও বালু ব্যবহারের শর্ত থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। ব্যবহৃত হচ্ছে নিম্নমানের সিমেন্ট, যা আবার পরিমাণেও কম দেয়া হচ্ছে।

এমন অভিযোগে যৌথ অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযানে অভিযোগের সত্যতাও পেয়েছেন দুদকের কর্মকর্তারা। এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারি প্রকৌশলি এস এম তারেককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।

দুদকের ১০৬ অভিযোগ কেন্দ্রে স্থানীয় জনসাধারণের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২৭ ফেব্রুয়ারি চকরিয়া উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় দূর্ণীতি দমন কমিশনের সহকারি পরিচালক হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বে অ্যানফোর্সমেন্ট টিম অভিযান পরিচালনা করে।

দুদক অ্যানফোর্সমেন্ট ইউনিটের প্রধান মহাপরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী জানান, অভিযানকালে দুদক টিম দেখতে পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্টারলাইট সার্ভিসেস অ্যান্ড অর্ণা করর্পোরেশন কর্তৃক মাতামুহুরী নদীর লক্ষ্যার চর এলাকায় প্রতিরক্ষা কাজে ২০০ মিটার স্থানে ২৪ হাজার ব্লক ফেলা হয়েছে, কোচপাড়া প্রতিরক্ষা কাজের আরও ৭১ হাজার ব্লক ফেলা হবে।

সরেজমিন পরিদর্শনকালে ব্লক নির্মাণের জন্য স্তুপ করে রাখা পাথরগুলো অত্যন্ত নি¤œমানের মর্মে প্রতীয়মান হয়। নির্মিত ১১ হাজার ব্লকের নমুনায় খালি হাতে একটু চাপ দিতেই ভেঙে গুড়ো হয়ে যায়। ওই ব্লক নির্মাণ কাজে সিমেন্ট, বালু ও পাথরের মিশ্রণের অনুপাত ১:৩:৬ হওয়ার নিয়ম থাকলেও ব্লক নির্মাণের ক্ষেত্রে যথাযথ অনুপাতে মিশ্রিত করা হয়নি।

দুদক টিম আরও দেখতে পায়, সার্বিক বিবেচনায় ওই প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিডিউল অনুযায়ী নির্মাণ সামগ্রীর পরিবর্তে অত্যন্ত নি¤œমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে ব্লক নির্মাণ করেছেন বলে প্রতীয়মান হয় ও ওই কাজের তদারকিতে নিয়োজিত প্রকৌশলিরা তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেননি।

বিষয়টি দুদকের পক্ষ থেকে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে অবহিত করলে তিনি দ্রুত তদন্তের নির্দেশ দেন। তার পরপরই সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলিকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়।

মাতামুহুরী নদীতে বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম, দুদকের অভিযানে প্রকৌশলী বরখাস্ত

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে মাতামুহুরী নদীর চকরিয়া পৌরসভার কোচপাড়া অংশের এক নম্বর গাইড বাঁধ ও আশপাশের বহু ঘরবাড়ি নদীগর্ভে তলিয়ে যায়। এভাবে বছরের পর বছর ভাঙনের কবলে পড়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছিল স্থানীয় বাসিন্দারা। স্থানীয় মজিদিয়া দাখিল মাদরাসাটিও হুমকির মুখে রয়েছে।

এ অবস্থায় পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীর ভাঙন ঠেকাতে তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় ওই অংশে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০০ মিটার এবং লক্ষ্যারচর ইউনিয়নের উত্তর লক্ষ্যারচরে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০ মিটার সিসি ব্লক নির্মাণে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিয়ে ঠিকাদার নিয়োগ করে। এই কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।

কিন্তু স্থানীয় এলাকাবাসি অভিযোগ করেছেন, পৌরসভার কোচপাড়া অংশের ৩০০ মিটারের জন্য তৈরিকৃত ব্লকে ব্যবহার করা হচ্ছে মাতামুহুরী নদী থেকে শ্যালো মেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে উত্তোলিত পলি মিশ্রিত ময়লা বালু। এই বালু দিয়ে তৈরি সিসি ব্লকের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

নিয়ম রয়েছে, এ ধরণের কাজ চলমান থাকার সময় পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের উপস্থিত থাকতে হবে কাজের মান ঠিক রাখার জন্য। কিন্তু এ সময় পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাউকেই দেখা যায়নি ঘটনাস্থলে। এতে ঠিকাদার ইচ্ছেমতো ব্লক তৈরি করে চলেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, কোচপাড়া অংশের এই কাজটি করা হচ্ছে একেবারেই নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে। যেখানে সিলেটি বালু ও পাথর ব্যবহারের শর্ত রয়েছে, সেখানে ব্যবহৃত হচ্ছে মাতামুহুরী নদীর পলিমাটি মিশ্রিত ময়লা বালু এবং পাহাড়ি বোল্ডার পাথর। আবার যে পরিমাণ সিমেন্ট ব্যবহারের নিয়ম রয়েছে তাও মানা হচ্ছে না।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা জানান, নদীর তীর সংরক্ষণে ব্লক তৈরির কাজটি বাস্তবায়নের জন্য ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্টার লাইট সার্ভিসেস অ্যান্ড অর্ণা কনস্ট্রাকশন জয়েন্টভেঞ্চারকে কার্যাদেশ দেয় পাউবো। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠান থেকে সাব ঠিকাদার হিসেবে কাজটি নেন সরকারি দলের প্রভাবশালি এক নেতা।

এ প্রসঙ্গে চকরিয়া পৌর-কাউন্সিলর মুজিবুল হক বলেন, ব্লক তৈরিতে কোনো অনিয়মই করা হচ্ছে না। মাতামুহুরী নদী থেকে বালু তুলেই এই কাজ বাস্তবায়নের জন্য অনুমতি রয়েছে স্থানীয় প্রশাসন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তাদের।

এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী তয়ন কুমার ত্রিপুরা বলেন, ‘মাতামুহুরী নদী থেকে উত্তোলিত ময়লা বালু দিয়ে ব্লক তৈরির কোনো নিয়ম নেই। যদি ঠিকাদার এ ধরণের কাজ করে থাকেন তাহলে তৈরিকৃত ব্লক ল্যাবে পরীক্ষা করা হবে। কাজের মান ঠিক না থাকলে কোনোভাবেই অর্থ ছাড় করা হবে না। এমনকি ব্লক বসানোর পর অন্তত ছয় মাস পর্যন্ত জামানতের টাকাও ধরে রাখা হবে।’