বিমান ‘ছিনতাইকারি’ মাহাদীকে যেভাবে তল্লাশি করা হয় বিমানবন্দরে

পাইলটের দক্ষতায় জরুরি অবতরণ, রক্ষা পেলেন ১৪৯ যাত্রী

বিমানবন্দরের ভেতরে নিরাপত্তা তল্লাশি শেষে ফ্লাইটে ওঠেছিলেন মাহাদী ওরফে পলাশ আহমেদ। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ডমেস্টিক টার্মিনালের সিসি ক্যামেরায় ফুটেজে এমনটাই দেখা গেছে।

সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, মাহাদী বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ টার্মিনালের বাইরে পৌঁছায় দুপুর ২টার দিকে। ওই সময় ভেতরে প্রবেশ না করে সেখানেই পায়চারি করতে থাকে সে। খবর বাংলা ট্রিবিউনের।

সিসি ক্যামেরায় দৃশ্যের কথা উল্লেখ করে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বলেছেন, ‘তাকে (মাহাদী) ওই সময় বিষণ্ন ও নার্ভাস দেখাচ্ছিল। তার কাঁধে একটি ব্যাগ ছিল। প্রায় ৪০ মিনিট সেখানে পায়চারি করে সে। পরে দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে সে অভ্যন্তরীণ টার্মিনালের মূল ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে।’

বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় নিয়োজিত এভসেকের (এভিয়েশন সিকিউরিটি) উপ-পরিচালক স্কোয়াড্রন লিডার এস এম সাজ্জাদ হোসেন শাহীন বলেন, ‘বিমানবন্দরের সিকিউরিটি চেকিংয়ের মধ্যদিয়েই তাকে যেতে হয়েছে। অন্য যাত্রীদের মতো তার ব্যাগও স্ক্যানিং করা হয়, এক্ষেত্রে কোনও অবহেলা ছিল না।

সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, মাহাদী বিমানে ওঠার আগে চেকিং কাউন্টারে কিছু সময় দাঁড়িয়ে ছিল। পরে অন্য যাত্রীদের সঙ্গে লাইন ধরে চেকিংয়ের জন্য সঙ্গে থাকা ব্যাগ এক্স-রে মেশিনের ভেতরে দেয়। এরপর আর্চওয়ের ভেতর দিয়ে হেঁটে পার হয়। আর্চওয়ে পার হওয়ার পর নিরাপত্তা কর্মীর সামনে হাত উঁচু করে দাঁড়ায়, নিরাপত্তা কর্মী তার দেহ তল্লাশি করে। সেখানে থেকে সরে এক্স-রে মেশিন থেকে নিজের ব্যাগ সংগ্রহ করে মাহাদী। সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ে প্রায় ২০ মিনিট টয়লেটে ছিলেন তিনি।

রবিবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) খেলনা পিস্তল ও বোমা সাদৃশ্য বস্তু নিয়েই ঢাকা থেকে দুবাইগামী ফ্লাইটটি ছিনতাইয়ের চেষ্টার ঘটনা ঘটে। এর জেরে বিমানটি চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে। এই ছিনতাই চেষ্টার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ‘দুষ্কৃতিকারী বোমাসদৃশ বস্তু ও অস্ত্র’ দেখিয়ে বিমানটি ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে।

বেসামরিক বিমান চলাচল (বেবিচক) কর্তৃপক্ষের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সংবাদ মাধ‌্যমকে বলেন, ‘কমান্ডো অভিযানে নিহত মাহাদীর কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া আলামতগুলো আমরা দেখেছি। কয়েক টুকরো প্লাস্টিকের পাইপ পাওয়া গেছে, যেগুলো লাল রং করা ছিল। পাইপের দু’পাশে লাল স্কচ টেপ মোড়ানো। পাইপগুলো এক করে স্কচ টেপ পেঁচিয়ে তার সঙ্গে লাল, হলুদ, কালো বৈদ্যুতিক তার মোড়ানো ছিল। এরপর পাইপগুলোর ওপর একটা ঘড়ি ও চার্জ লাইটের এলইডি লাইট যুক্ত সার্কিট বোর্ড লাগানো ছিল। প্রাথমিকভাবে দেখে যে কেউ বোমা ভাববে।’

তিনি বলেন, ‘ধারণা করছি এগুলো আলাদা আলাদা করে বিমানবন্দরে নিয়ে আসে সে। বিমানবন্দরে প্রবেশের পর কোনও এক সময়ে টয়লেটে গিয়ে শরীরে যুক্ত করে নিতে পারে।

এক্স-রে মেশিনে এসব ধরা না পড়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘চেকিংয়ে আমাদের প্রধান টার্গেট অস্ত্র ও বিস্ফোরক। তার সঙ্গে এ ধরনের কিছু্ই ছিল না। এক্স-রে মেশিনে সলিড মেটাল বস্তু সহজে ধরা পড়ে। মেশিনের আলোক রশ্মি মেটাল বস্তু ভেদ করে যেতে পারে না, এ কারণে সলিড মেটাল শনাক্ত সহজ। আলাদা করে কয়েক টুকরো প্লাস্টিকের পাইপ, ঘড়ি, বৈদ্যুতিক তারের খণ্ড এক্স-রে মেশিনে নিরাপত্তা হুমকিজনক বস্তু হিসেবে শনাক্ত হবে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি ১৪৭ নম্বর ফ্লাইটটি রবিবার বিকাল ৫টায় দুবাইয়ের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়ে যায়। ফ্লাইটটি চট্টগ্রাম হয়ে দুবাইয়ে যাওয়ার কথা ছিল। ফ্লাইটের অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রীরা অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল এবং আন্তর্জাতিক রুটের যাত্রীরা আন্তর্জাতিক টার্মিনাল দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের যাত্রীদের কো-বাসে করে বে-তে থাকা বিমানে ওঠানো হয়। বাসে চড়ে গিয়েই বিমান উঠে মাহাদী।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বিমানটি পাঁচটায় ছেড়ে যাওয়ার ১৫ মিনিটের মধ্যে পলাশ অস্ত্রহাতে বিমান ছিনতাইয়ের কথা বলে ভয়ভীতি দেখানো শুরু করে। নিজের শরীরে জড়ানো নকল বোমা বিস্ফোরণের ভয়ও দেখায় সে। এরমধ্যেই ৫টা ৪১ মিনিটে বিমানটি চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে।

ফ্লাইটির ক্যাপ্টেন ছিলেন মোহাম্মদ গোলাম শাফি ও ফার্স্ট অফিসার ছিলেন মুনতাসির মাহবুব। এতে ক্রেবিন ক্রু ছিলেন শফিকা নাসিম নিম্মি, হোসনে আরা, শরিফা বেগম রুমা, শহিদুজ্জামান সাগর ও আব্দুস শাকুর মুজাহিদ।

বোয়িংয়ের তৈরি ৭৩৭ বিমানটির আসন সংখ্যা ১৬২টি, বিমানের প্রায় মাঝামাঝি স্থানে ছিনতাই চেষ্টাকারী পলাশের আসন ছিল ‘১৭-এ’তে।