সেই ‘অবাধ্য’ সন্তান পলাশকে নারায়ণগঞ্জে দাফন করলেন বাবা

বিমান ছিনতাই করতে গিয়ে কমান্ডো অভিযানে নিহত পলাশ আহমেদ ওরফে মাহিবি জাহানের মরদেহ নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলায় তার গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়েছে।

তার বাবা পিয়ার জাহান সরদার বলেছিলেন, রাষ্ট্রবিরোধী কাজে জড়ানো ‘অবাধ্য’ সন্তানের লাশ তিনি নিতে চান না। তবে পরে পুলিশ সোমবার রাতেই তাকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে চট্টগ্রামে যায়।

চট্গ্রামের পতেঙ্গা থানার ওসি উৎপল বড়ুয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছেলের মরদেহ শনাক্ত করেন পিয়ার জাহান। পরে কফিন বুঝে নিয়ে তিনি রওনা হন বাড়ির পথে।

সোনারগাঁ থানার ওসি মনিরুজ্জামান জানান, মঙ্গলবার ভোরে পলাশের লাশ নিয়ে সোনারগাঁও উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের দুধঘাটা গ্রামে পৌঁছান পিয়ার জাহান। জানান শেষে পারিবারিক কবরস্থানে পলাশকে দাফন করা হয়।

রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বিজি-১৪৭ রোববার বিকালে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের পরপরই এক যুবক অস্ত্র ঠেকিয়ে জিম্মি করেন পাইলটসহ ক্রুদের।

ওই অবস্থায় বিমানের পাইলট চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে বিমানটি নামান। যাত্রী ও ক্রুদের নামিয়ে আনার পর কমান্ডো অভিযানে মারা পড়েন ওই যুবক।
পুলিশকে লাশটি বুঝিয়ে দেয়ার পর সেই রাতেই লাশের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত করা হয়। নিহতের নাভির ডান পাশে গুলির চিহ্ন পাওয়ার কথা জানায় পুলিশ।

সোমবার র‌্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিমান ছিনতাইকারীর আঙুলের ছাপ তাদের ক্রিমিনাল ডেটাবেইজে থাকা এক অপরাধীর সঙ্গে মিলে গেছে। তার নাম পলাশ আহমেদ, বাড়ি নারায়ণগঞ্জে।

এদিকে নারায়াণগঞ্জ পুলিশের একটি দল ওই বিমান ছিনতাইকারীর একটি ছবি নিয়ে রোববার রাতেই পিয়ার জাহান সরদারের বাড়িতে যায়। তিনি ওই ছবি নিজের ছেলে পলাশের বলে শনাক্ত করার পর পুলিশ বাড়িতে তল্লাশি চালায়।

২৪ বছর বয়সী পলাশ মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করে এসএসসি পড়ার মধ্যেই বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় থাকা শুরু করেছিলেন। ‘কবর’ নামের একটি সিনেমায় পার্শ্ব চরিত্রেও তিনি অভিনয় করেন।

প্রথমে বগুড়ার এক তরুণী ও পরে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী অভিনেত্রী শামসুর নাহার শিমলার সঙ্গে পলাশের বিয়ে হয়। মাস তিনেক আগে পলাশকে তালাকের নোটিস পাঠন শিমলা।

এক সময় সৌদি আরবে থাকা পিয়ার জাহান সরদারের ভাষায়, পলাশ ছিল তার ‘অবাধ্য’ সন্তান। কাজের জন্য তাকে বিদেশে পাঠানো হলেও সে টাকা উড়িয়ে দেশে ফিরে এসেছে।

বিদেশে পাঠানোর কথা বলে এলাকার মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়া, এমনকি ‘অপহৃত হওয়ার নাটক করে’ নিজের বাবার কাছ থেকে টাকা আদায়ের মত ঘটনাও পলাশ ঘটিয়েছেন বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।

র‌্যাব বলছে, ২০১২ সালে একটি অপহরণ মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন পলাশ। তখন তার বয়স মাত্র ১৮ বছর ১৫ দিন।

পলাশের সঙ্গে বিভিন্ন ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীর’ নিয়মিত ওঠাবসা ছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে তার সাবেক স্ত্রী শিমলার পরিবারের পক্ষ থেকে।
বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনায় সোমবার রাতে সিভিল এভিয়েশনের পক্ষ থেকে সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং বিমান-নিরাপত্তা বিরোধী অপরাধ দমন আইনে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থানায় একটি মামলা করা হয়। পলাশের পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় আরও কয়েকজনকে সেখানে আসামি করা হয়।

বিমান ছিনতাইয়ের সময় পলাশের হাতে পিস্তল ছিল বলে কমান্ডো অভিযানের পর সেনা ও বিমান বাহিনীর কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। পলাশ কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়েছিলেন বলেও দাবি করেছিলেন ওই বিমানের একাধিক যাত্রী।

তবে পুলিশের পক্ষ থেকে পরে বলা হয় ওই পিস্তল খেলনা। আর মামলার এজাহারে বলা হয়, উড়ন্ত বিমানে পটকা জাতীয় বস্তুর বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পলাশ যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন।

কমান্ডো অভিযানের পর বিমান ছিনতাইয়ের কারণ সম্পর্কে সিভিল এভিয়েশন ও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ‘স্ত্রীর বিষয়ে’ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চাইছিলেন ওই যুবক।

আর মামলার এজাহারে লেখা হয়েছে, “উক্ত দুষ্কৃতকারী তার কিছু দাবি-দাওয়া প্রধানমন্ত্রীকে শুনতে হবে বলে চিৎকার করে। অন্যথায় সে বিমানটি তার কাছে থাকা বিস্ফোরক দিয়ে ধ্বংস করে দেবে মর্মে হুমকি দেয়।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত দল ঝড়তোলা ওই ঘটনা তদন্ত করে দেখছেন।