সু চির ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ, এবার মিয়ানমারে নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ

 

মিয়ানমারের ডি ফ্যাক্টো নেতা অং সান সু চির ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করতে একাধিক নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ গড়ে উঠতে শুরু করেছে। যারা দল গঠন করার চেষ্টা করছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক হাউস স্পিকার থেকে শুরু করে সামরিক জান্তাবিরোধী আন্দোলনের জনপ্রিয় ছাত্র নেতা। সংগঠিত করার চেষ্টা চলছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের দ্বারা গঠিত দলগুলোকেও। সংশ্লিষ্টরা এককভাবে সরকার গঠনের স্বপ্ন না দেখলেও, যৌথভাবে ছোট ছোট দলের ঐক্য গড়ে তুলতে আগ্রহী। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, রাখাইনে রোহিঙ্গা নিপীড়ন, রাখাইনের বৌদ্ধদের স্থানীয় প্রশাসনে প্রত্যাশিত মাত্রায় ভূমিকা রাখতে না দেওয়া, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের শুল্কমুক্ত পণ্য রফতানির সুযোগ বাতিল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি, সংস্কার প্রক্রিয়ার গতি শ্লথ হয়ে যাওয়ার মতো বিষয়ে সু চি ও তার দল ‘ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাট ডেমোক্রেসির’ (এনএলডি) জনসমর্থন কমার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

এনএলডি ২০১৫ সালে ভূমিধস বিজয় পেয়েছিল। সংসদে ২৫ শতাংশ আসন মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত থাকলেও দলটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে সমর্থ হয়। মিয়ানমারে ২০২০ সালে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সামনের নির্বাচনে এনএলডি জিতে আসলেও গত নির্বাচনের চেয়ে দলটির ফলাফল খারাপ হবে। ‘টাগাউং ইন্সটিটিউট অব পলিটিকাল স্টাডিজের’ গবেষক ইয়ে মিও এইন মন্তব্য করেছেন, এনএলডি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করবে কি না তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে, তাদেরকে কোয়ালিশন সরকার গঠনের কথা ভাবতে হবে।
গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে দলটি প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জন করতে পারেনি। ১৩ আসনের মধ্যে ওই নির্বাচনে এনএলডি মাত্র ৭ আসন পায়। অন্যদিকে সেনা সমর্থিত রাজনৈতিক দলের আসন সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। কাচিন প্রদেশে দলটির নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের একজন দাশি লা সেং। তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘুরা অন্যান্য দলের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। আমাদের দলের সক্ষমতার ওপর এখন পুরোপুরি ভরসা করা সম্ভব নয়। মানুষের আস্থা অর্জনের জন্য আমাদের আরও বেশি চেষ্টা করতে হবে।’ গত নভেম্বরের উপনির্বাচনে কাচিন প্রদেশের একটি আসন হারিয়েছে সু চির দল এনএলডি।
সামরিক শাসকদের একজন ছিলেন শি মান। তিনি মিয়ানমার সংসদের সাবেক স্পিকার এবং সু চির সঙ্গেই এতদিন ঘনিষ্ঠ ছিলেন। গত সপ্তাহে তিনি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন, যার নাম ‘ইউনিয়ন বেটারমেন্ট পার্টি।’ সেনা সমর্থিত ‘ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির’ প্রধানের পদ থেকে তাকে ২০১৫ সালে সরিয়ে দেওয়া হয়। অপেক্ষাকৃত উদারপন্থীদের নিয়ে আলাদা হয়ে যান তিনি।
মিয়ানমারে নতুন দল নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন আরেক রাজনীতিবিদ। তার নাম কো কো গি। তিনি ১৯৮৮ সালে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের নিয়ে গঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি অন্যান্য রাজনৈতিক বলয়ের কর্মীদেরও উৎসাহ দিচ্ছেন কো কো গি। তিনি মনে করেন, তাদের কেউ এককভাবে সরকার গঠন করতে না পারলেও, জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করার চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। তার রাজনৈতিক দলের নাম ‘পিপলস পার্টি।’ তার ভাষ্য, ‘আমরা এককভাবে যদি নাও পারি, তাহলেও জোটগতভাবে আমরা সংসদে যেতে পারি। আমরা যদি এক হয়ে দাঁড়াই, তাহলে আমাদের ভোট ভাগ হবে না।’
সু চির দল কেন আগামী নির্বাচনে খারাপ ফলাফল করতে পারে এবং কেন তার দলের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের তোড়জোড় চলছে তার কারণ ব্যাখ্যা রয়টার্স বেশ কিছু বিষয় উল্লেখ করেছে। সু চির দিক থেকে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি রোহিঙ্গা সংকট। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। সন্ত্রাসবিরোধী শুদ্ধি অভিযানের নামে শুরু হয় নিধনযজ্ঞ। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হতে থাকে ধারাবাহিকভাবে। এমন বাস্তবতায় নিধনযজ্ঞের বলি হয়ে রাখাইন ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয় প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা। আগে থেকে উপস্থিত রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় দশ লাখে। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চির বিরুদ্ধে এ নিয়ে আন্তর্জাতিক জনমত প্রবল হয়ে ওঠে। দাবি ওঠে তার নোবেল পুরস্কার বাতিলের।
অন্যদিকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বলেছে, রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের কারণে তারা মিয়ানমারকে আর আর শুল্ক মুক্ত পণ্য রফতানির সুযোগ নাও দিতে পারে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশটির টেক্সটাইল খাত। আর এ খাতে যুক্ত বেশিরভাগ মানুষই সু চির দল জেতে এমন আসনের বাসিন্দা।

আরাকান আর্মির তৎপরতাও নতুন করে মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এনএলডির জন্য। জাতিগতভাবে বামার না হলেও বৌদ্ধ ধর্মীয় আরাকানিদের নিয়ে স্বায়ত্তশাসিত এলাকা গড়ে তোলার লক্ষ্য সশস্ত্র সংগঠনটির। ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’ (আইসিজি) মন্তব্য করেছে, আরাকান আর্মির বর্ধিত তৎপরতা দেখে বোঝা যায়, রাখাইনের বাসিন্দাদের দাবি আদায়ের আন্দোলন রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে ত্যাগ করে সশস্ত্র সংঘাতের দিকে সরে যাচ্ছে। রাখাইনের বৌদ্ধ ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী দল ‘আরাকান ন্যাশনাল পার্টিকে’ ২০১৫ সালে বড় সমর্থন পেতে দেখা গেছে। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনে তাদেরকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কোনও পদ দেওয়া হয়নি। এতে সু চির দল এনএলডির বিরদ্ধে বৃদ্ধি পেয়েছে স্থানীয়দের ক্ষোভ।