ক্যান্সার নিয়ে যেভাবে দিন কাটছে নবম শ্রেণীর ছাত্রী আফরিনের

সময় এখন তার হেসে খেলে বেড়ানোর। বিদ্যালয়ে সহপাঠীদের নিয়ে একসঙ্গে পথচলার। কিন্তু না, মরণব্যাধি ক্যান্সার তার শরীরে বাসা বেঁধেছে। এক বছর ধরে সময় কাটছে বিছানায়। ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ছে তার শরীর। এই একজনের চিকিৎসা ব্যয় চালাতে গিয়ে এলোমেলো হয়ে গেছে পরিবারের অন্যদের জীবনও।

বলছিলাম আফরিন জান্নাতের (১৫) কথা। কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বিএমচর ইউনিয়নের দক্ষিণ বহদ্দারকাটা এলাকার মোহাম্মদ শফির মেয়ে। শফি একসময় বালু শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন।

২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষায় জিপিএ ৪ দশমিক ৬০ পেয়েছে আফরিন। ২০১৮ সালে নবম শ্রেণীতে মানবিক বিভাগে ভর্তি হলেও ফেব্রুয়ারি থেকে আর ক্লাসে যেতে পারেনি সে।

মোহাম্মদ শফি ও রেনোয়ারা বেগম দম্পতির চার মেয়ে ও দুই ছেলে। বড় ছেলে তারেক আজিজ কাজ নিয়েছেন তরকারির আড়তে। মেঝ ছেলে পোশাক কারখানায়। বড় মেয়ে জন্নাতুল নাইম এইচএসসি পরীক্ষার্থী থাকা অবস্থায় একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কাজ নিয়েছেন। মেঝ মেয়ে জন্নাতুল বকেয়া পেকুয়া শহীদ জিয়াউর রহমান উপকূলীয় কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনিও এখন টিউশনী করেন। আফরিনের ছোট বোন আশরাফা জান্নাত বহদ্দারকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী।

আফরিনের চিকিৎসা খরচ চালাতে ও পরিবারের ঘানি টানতে গিয়ে এখন পরিবারের অন্যদের পড়ালেখাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

আফরিনের বাবা মোহাম্মদ শফি জানিয়েছেন, ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত আফরিনের চিকিৎসায় সাত লাখ ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ১০ শতকের এক খন্ড জমি ছিল, তাও তিন লাখ টাকায় বিক্রি করে দিয়েছেন। এখন আর চিকিৎসার ব্যয় মেঠাতে পারছেন না তিনি।

আফরিন বলে, ২০১৭ সালে জেএসসি পরীক্ষা দেয়ার সময় বাম পায়ে প্রথম ব্যথা অনুভুত হয়। ধীরে ধীরে ব্যথা বাড়তে থাকে। ২০১৮ সালের ফ্রেব্রুয়ারি থেকে অন্যের সাহায্য ছাড়া হাটাচলা বন্ধ হয়ে যায়। এখন বিছানা থেকে উঠতে পারি না। বাম পায়ের হাটু পুরো ফুলে গেছে। তীব্র ব্যথা, ইচ্ছে হয় মরে যাই। মরে গেলেই তো সব শেষ!

দু’মিনিট পরেই আফরিন বলে উঠে ‘আমি বাঁচতে চাই। পৃথিবীতে এতো মানুষ থাকতে আমি মারা যাবো!’ এ কথা বলেই আফরিন অশ্রুভেজা চোখে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে অন্য মনস্ক হয়ে পড়ে।

বিছানায় তার পাশে সাধারণ জ্ঞানের একটি বই আছে। সে বইটি হাতে তুলে নিয়ে আবার কথা শুরু হয় তার, ‘এ বইয়ের সব আমার মুখস্থ। আমি জেএসসিতে জিপিএ-৫ পেতাম। কিন্তু হাঁটুর ব্যথায় ভালো করে পড়তে পারিনি। আচ্ছা, আমি কি বাঁচবো! যদি বেঁচে থাকি তাহলে আমি দেশের সেবা করতে করবো। সব ক্যান্সার রোগীর জন্য কাজ করবো। তাঁদের পাশে থাকবো।’

আদৌ তার এ স্বপ্ন পূরণ হবে! নাকি স্বপ্নের মৃত্যু ঘটবে-এখন সেটাই বড় প্রশ্ন।

আফরিনের বাবা বলেন, ১২-১৫ দিন পর চার ব্যাগ করে রক্ত দিতে হয়। প্রতিবার রক্ত দেয়ার পর কেমোথেরাপি দিতে হয়। রক্ত ও কেমোথেরাপি চকরিয়ার কোথাও দেয়া যায় না। এটার জন্য চট্টগ্রাম চলে যেতে হয়। আফরিন সোজা হয়ে বসতে পারে না। একারণে গাড়ি রিজার্ভ করতে হয়।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেডিওথেরাপি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ এম এ আউয়াল আফরিনের শরীরে বুন ক্যান্সার শনাক্ত করেন।

এম এ আউয়াল সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভালো চিকিৎসা পেলে আফরিন ভালো হবে। তাকে ঢাকা বা ভারতে গিয়ে চিকিৎসা নিতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

বহদ্দারকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জিনাত সোলতানা বলেন, ‘আফরিন খুব মেধাবী ছাত্রী। জেএসসির পরে সে শারিরীকভাবে অসুস্থ হয়ে গেলে সবাই তাকে পরামর্শ দিয়ে মানবিক বিভাগে ভর্তি করাই। কিন্তু সে আর ক্লাস চালিয়ে নিতে পারেনি। এখন তার জন্য খুব খারাপ লাগছে। কয়েকবার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মিলে আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছিলাম। কিন্তু ব্যয়বহুল খরচে তা খুব নগন্য।’
সাহায্যার্থে:
মোহাম্মদ শফি (আফরিনের বাবা)
হিসাব নম্বর-১৩৭০০১০৯১০৩১১
রূপালী ব্যাংক, চিরিংগা শাখা
এস এম হানিফের ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহিত