ভালোবাসা দিবসে ...

প্রতিদিনই ভালোবাসা

প্রতিদিনই ভালোবাসা

পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেইÑ সুবীর নন্দীর এমন সোজাসাপটা, সুরেলা এবং বেদনাবিধুর ঘোষণার পরও থেমে নেই ভালোবাসা, থেমে নেই ভালোবাসা দিবস পালন। এমনকি ‘সখি ভালোবাসা কারে কয়’Ñ প্রশ্নটির সর্বজনগ্রাহ্য মীমাংসা আজও হল না, তাতে কী? ভালোবাসা তো তাতে আটকে থাকছে না। প্রেমে পতন ছাড়া কিছু নেইÑ এই অমোঘ সত্য মেনে নিয়ে মানুষ প্রতিনিয়ত প্রেমে পড়ছে। ‘বড়ো প্রেম কেবল কাছে টানে নাÑ দূরেও ঠেলিয়া দেয়’। এই ভবিষ্যদ্বাণীকে অগ্রাহ্য করে মানুষ প্রেম করতে কার্পণ্য করে না, সে দূরেই ঠেলে দিক আর শূন্যেই ভাসিয়ে দিক। কাজেই, ‘প্রিয়, ফুল খেলার নয় অদ্য, ধ্বংসের মুখোমুখি আমরাÑ’ কে শুনছে এই নিষেধাজ্ঞা?

১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। কীভাবে এবং কোথা থেকে এই ধূলিমাটির পৃথিবীতে ভালোবাসা দিবসের সূত্রপাতÑ তা নিয়ে নানা মত রয়েছে। খুব সম্ভবত সবেচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত এই যে, তৃতীয় শতাব্দীতে রোমে সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন নামক এক ধর্মযাজক ছিলেন। তৎকালীন শাসক দ্বিতীয় ক্লডিয়াস বিশ্বাস করতেন, যেসব পুরুষের বউ আছে, তাদের তুলনায় যাদের বউ এবং পরিবার নেইÑ তারাই ভালো সৈনিক হতে পারে। এই বিশ্বাস থেকেই এই মহাজ্ঞানী ও বিচক্ষণ (?) সম্রাট তরুণদের জন্য বিবাহ নিষিদ্ধ করেছিলেন। সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন সম্রাটের এই অন্যায্য ভাবনা মেনে নিতে পারেননি। প্রতিবাদস্বরূপ, তিনি তরুণদের গোপনে বিয়ের ব্যবস্থা করে দিতেন। ব্যাপারটা জানাজানি হলে, যা হয় আর কি, রাজা ভ্যালেন্টাইনকে হত্যা করেন আর ভ্যালেন্টাইন পরিণত হন প্রেমের মূর্ত প্রতীকে। পুরো কাহিনি আরও মেলা প্যাঁচগোচ আছে, তবে সংক্ষেপে এই হচ্ছে সার ইতিহাস।

তবে ইতিহাস কেইবা কপচাতে যায়। ১৪ তারিখ ভালোবাসা দিবস এ তো সবারই জানা। বছরজুড়েই ভালোবাসা যাবে, ভালোবাসা বিলানো যাবে ভালোবাসা পাওয়া যাবে, তবে বছরের এই দিনটা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হওয়ায় এই দিনের ভালোবাসাবাসিতে বুকে একটু বাড়তি বল পাওয়া যায়Ñ এই যা। যে বালিকাকে বহুদিন যাবৎ নানা সংকোচে বলা যাচ্ছে না, আমি তোমাকে ভালবাসি। তাকে ১০ তারিখের যদি বলা যায়, আগামি ১৪ তারিখ তুমি ফ্রি থেকো একসঙ্গে লাঞ্চ করব তাহলেই তো অনেকখানি কাজ এগিয়ে যায়। বালিকা যদি সত্যি সত্যি ১৪ তারিখে একটু সাজগোজ করে লাঞ্চ করতে আসে তাহলে তো সবুজ সংকেত পাওয়াই গেল। আর যদি না আসেÑ তাহলে বিষয়টা একটু তলিয়ে দেখতে হবে। সে কি ১৪ তারিখে বাসা থেকেই বের হয়নি নাকি অন্য কোথাও, অন্য কারও সনে সময় দিচ্ছে। দুটো সম্ভাবনার যাই ঘটুক না কেন ‘সমুদ্রে পেতেছি শয্যা শিশিরে কীইবা ভয়’, আগামি বছরের ১৪ তারিখে নিশ্চয়ই সুযোগ এই আশায় বুক বেঁধে লাঞ্চটি একা একা সেরে আগামি বছরের জন্য জোর প্রস্তুতি নেয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। বাস, ট্রেন এবং নারীর পেছনে কখনও দৌড়াতে নেই এই অন্ত্যজ আপ্য বাক্যটির চলতি ভাষ্য হচ্ছেÑ প্রেম ও প্রজাপতির পেছনে ছুটতে যেওনা, স্থির থাক, একদিন আপনাআপনি ওটি তোমার কাঁধে এসে বসবে। সবুরে মেওয়া ফলে এ তো অতি প্রাচীন প্রবাদ। অতএব নো টেনশন।

ভ্যালেন্টাইন ডে পালনের রীতিটি পশ্চিমে বহুকাল ধরেই প্রচলিত ছিল। বাংলাদেশে এটি হালে পালিত হচ্ছে, বলা যায়, সাড়ম্বরেই উদযাপিত হচ্ছে। বলে রাখা ভালো যে, বাংলাদেশে ভালোবাসা দিবসের আমদানিকারক অধুনালুপ্ত একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা। শুরুতে ততটা আহামরিভাবে শুরু না হলেও, হালে এটি মহাজনপ্রিয়। এটি এখন রীতিমতো আপামর উৎসবে পরিণত হয়েছে। হƒদয়চর্চার পাশাপাশি বাংলাদেশে এটির বাণিজ্যিক গুরুত্ব মোটেও কম না। ফুল ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে পাড়ার ফার্স্টফুডের দোকান পর্যন্ত এই দিনে রীতিমতো সাজো সাজো রব পড়ে যায়। ফুল বিক্রি হয় ম্যালা, তরুণ-তরুণীরা লাইন ধরে কার্ডের দোকান থেকে কার্ড কেনে। চকলেট, ফ্যাশন হাউসÑ কোথায় নেই ভালোবাসা দিবসের বাণিজ্যিক আলোড়ন।

আশার কথা, ফেব্রুয়ারি মাসে দিবসটা পালিত হয় বলে বহু তরুণ এবং তরুণী এই ইটকংক্রিটের শহরে একটু নির্জনতার খোঁজে পাড়ি জমায় বইমেলায় এবং সেখানে গিয়ে আবিষ্কার করে আরও লাখো তরুণ-তরুণী লাইন দিয়ে বইমেলায় ঢুকছে। লেখক খুশি, খুশি প্রকাশক। ভালোবাসা দিবসের তোড়ে বইয়ের বেচাবিক্রিও তুমুল।

ধুর্জটি প্রসাদ সিংহ বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে প্রেম নামক পদ্ধতিটি আবিষ্কার করলেন বঙ্কিমচন্দ। কর্তাদের বারণ কেউ মানল না। তারপর এলেন রবিবাবু।

তিনিই আমাদের সবাইকে প্রেমে পড়তে শিখিয়েছেন। তারই ভাষা দিয়ে আমরা প্রেম করি, তারই ভাব দিয়ে আমরা প্রেমে পড়িÑ গুরুজন ও গুরুদাসবাবুর বাঁধা সত্ত্বেও। ’ আর বঙ্গদেশে ভালোবাসা দিবসের প্রচলনের কথা তো পূর্বাহ্নেই বলা হয়েছে।

কবি আবু হাসান শাহরিয়ার বলেছেন, পাখি যদি ডাকে, তবে প্রতিদিন ভ্যালেন্টাইন ডে। বছরজুড়ে পাখি ডাকুক, বছরজুড়েই মানুষ ভালবাসুক। আজকের এই বিশেষ দিনটা থেকে যেন পৃথিবীর সব পাখি এবং মানুষ সেই প্রেরণাই পায়।