সৈকতের আকাশে উড়লো ডলফিন হাতি বাঘ!

নিচে সাগরের সঙ্গে বালুকাবেলার মিতালি, আর মৎস্যকন্যা উড়ছেন আকাশে! এই উড়ানের সঙ্গী হয়েছে ঈগল, ডলফিন, গুবরে পোকা, হাতি। তাদের মধ্যে মাথা তুল বাঘ মামা কি হালুম বলে ভয় দেখাচ্ছে?
মনোলোভা রঙবাহারি এসব ঘুড়ির সঙ্গে উড়ে উড়ে শুক্রবার ছুটির বিকালে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতকে নির্মল রাখার শপথ নিলেন পর্যটকরা।

অবশ্য ওড়াওড়ি, ঘোরাঘুরি আর শপথের মধ্যে থেমে থাকল না কক্সবাজারের ‘জাতীয় ঘুড়ি উৎসব’। আসন্ন বিশ্ব ঘুড়ি উৎসবে বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে নিতে বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঘুড়িগুলোর কারিগরি উৎকর্ষ সাধনের গুরুগম্ভীর কথাও সেখানে এল।

শুক্রবার বিকালে কক্সবাজারের সুগন্ধা বিচে বাংলাদেশ ঘুড়ি ফেডারশেনের আয়োজনে জাতীয় ঘুড়ি উৎসব উদ্বোধন করেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল। বিশেষ অতিথি হয়ে এসেছিলেন ঘুড়ির দুনিয়ার ‘উন্নত’ দেশ চীনের রাষ্ট্রদূত ঝাং ঝু।

কক্সবাজার সৈকতে ঘুড়ি ফেডারেশনের আয়োজনে চলছে ঘুড়ি উৎসব। ছবি: মাহমুদ জামান অভি কক্সবাজার সৈকতে ঘুড়ি ফেডারেশনের আয়োজনে চলছে ঘুড়ি উৎসব। ছবি: মাহমুদ জামান অভি বিকালে মূল আয়োজন শুরুর আগেই সুগন্ধা বিচে নিয়ে আসা হয় ২৫ ফুট দীর্ঘ টেরাকোটা টেপা পুতুল, সৈকত সেজে ওঠে ছোট বড় নানান রঙের বেলুনে।
তারপর বাকশো, ফুটবল, মাছরাঙা, অক্টোপাস, কামরাঙা, সাপ, ব্যাঙ আর পেঁচার মত নানান ঢঙের, নানান রঙের ঘুড়ির হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গেল শীতের আকাশের নীল জমিনে।

আকাশে এই খেলার নেশায় জলকেলি ভুলে তীরে ফিরলেন পর্যটকের দল। ছেলে বুড়ো- সবার হাতে ঘুড়ির নাটাই, সাগরের জোয়ার যেন আনন্দ হয়ে ছলকালো চোখে মুখে।

অভি উৎসবের উদ্বোধন ঘোষণা করে প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল বললেন, “আমাদের ছেলেমেয়েরা ঘরবন্দি হয়ে যাচ্ছে। তাদের নির্মল আনন্দের ছোঁয়ায় আনতে হবে। প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক ঘুড়ি তার অন্যতম মাধ্যম হতে পারে।”
সেই সঙ্গে কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতকে রক্ষা করতে পরিবেশবাদীদের সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড আরও বাড়াতে বললেন তিনি।

এবারের জাতীয় ঘুড়ি উৎসবের শ্লোগান ছিল ‘চাই নির্মল সৈকত ও সাগরের কক্সবাজার’। এ বিষয়ে শুক্রবার সকালে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অডিটোরিয়ামে একটি সেমিনারও হয় বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের উদ্যোগে।

ঘুড়ির কারিগরি

জাতীয় ঘুড়ি ফেডারেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আল মামুন মৃধা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এবার ঘুড়ি উৎসবে সৈকত রক্ষার পাশাপাশি তারা বাংলাদেশের ঘুড়ির মানোন্নয়নের দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন।

মাহমুদ জামান অভি আগামী ২০ এপ্রিল চীনের ওয়েফাংয়ে বসছে বিশ্ব ঘুড়ি প্রতিযোগিতার পঞ্চম আসর। সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান আরো দৃঢ় করতে চায় জাতীয় ঘুড়ি ফেডারেশন।
কক্সবাজারে জাতীয় ঘুড়ি উৎসবের দ্বিতীয় দিন শনিবার সুগন্ধা বিচে আয়োজন করা হবে ঘুড়ি কাটাকাটি প্রতিযোগিতার। সেখানে দেশি ঘুড়ি নিয়ে অংশ নেবেন বাংলার ঘুড়ি নির্মাতারা। তাদের মধ্যে সেরা দুজনকে নিয়ে যাওয়া হবে চীনের বিশ্ব আসরে।

আল মামুন মৃধা জানালেন, এর আগে বাংলাদেশ বিশ্ব ঘুড়ি প্রতিযোগিতায় ‘কাইট ফাইটিং’ বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। তবে ঘুড়ির কারিগরি শৈলীতে বাংলাদেশ বেশ পিছিয়ে আছে। তাই ফেডারেশন এবার নজর দিচ্ছে ‘ইনোভেশন’ বিভাগে।

কক্সবাজার সৈকতে ঘুড়ি ফেডারেশনের আয়োজনে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী ঘুড়ি উৎসব। নানা রঙের ঘুড়ি হাতে আনন্দে মাতোয়ারা অংশগ্রহণকারীরা। ছবি: মাহমুদ জামান অভি কক্সবাজার সৈকতে ঘুড়ি ফেডারেশনের আয়োজনে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী ঘুড়ি উৎসব। নানা রঙের ঘুড়ি হাতে আনন্দে মাতোয়ারা অংশগ্রহণকারীরা। ছবি: মাহমুদ জামান অভি “কাইটের প্রোপার ডায়নামিক অ্যাপ্লিকেশনে, কালার কম্পোজিশনে আমরা এখনও বেশ পিছিয়ে। ব্যাপারটা আসলে ফিনানশিয়াল। সাপোর্ট পাই না বলে আমরা এই দিকটি নিয়ে এখনও ঠিকভাবে কাজ করতে পারছি না।”
মামুন বলেন, ঘুড়ির কারিগরি আর সৌকর্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে চীন। সে দেশের প্রকৌশলী ও শিল্পীরা ঘুড়ির ‘অ্যারোডায়নামিক থিম’ ও ‘ডাইভারসিফেকশন’ নিয়ে নিয়মিত কাজ করেন। ঘুড়ি তাদের কাছে কেবল শখ বা উৎসবের উপলক্ষ্য নয়, ঘুড়িকে তারা পর্যটন শিল্পের স্মারকে পরিণত করেছে।

“আমাদের দেশের পর্যটনেও যদি ঘুড়িকে প্রাধান্য দেওয়া হত, তাহলে আমাদের ঘুড়ির ঐতিহ্যের কথাও বিশ্ব জানত।”

এ বছরের বিশ্ব ঘুড়ি উৎসবে ‘স্পেশালাইজড কাইট’, ‘কাইট ব্যালে’সহ কয়েকটি শাখায় লড়াই করতে বাংলাদেশ ঘুড়ি ফেডারেশন প্রস্তুত হবে বলে জানান মামুন।

মাহমুদ জামান অভি তিনি বলেন, বাংলাদেশে সাধারণত যেসব কাগুজে ঘুড়ি দেখা যায়, তার বেশিরভাগই পকেট ঘুড়ি। তবে বক্স ঘুড়ি, ডেল্টা ঘুড়ি, পেন্টাগোনাল, হেক্সগোনাল ঘুড়ি তৈরিতেও ‘বেশ সাফল্য’ এসেছে।
“এবারের ঘুড়ি উৎসবে নিয়ে আসা হবে ব্যাটারি চালিত অ্যালিমিনিটেড ঘুড়ি। সিম্বলিক এই ঘুড়িটি এখন বাংলাদেশ নিয়মিতভাবে তৈরি করছে। মোদ্দা কথা, ঘুড়ি নির্মাণে যে বৈচিত্র্য এসেছে, তাতে সরকারি অর্থায়ন আরো বাড়লে আমরা বিশ্ব ঘুড়ি উৎসবের জন্য প্রস্তুতি নিতে পারতাম আরো ভালোভাবে।”

বিকল্প পেশায় ঝুঁকছে ঘুড়ির কারিগররা

এবারের ঘুড়ি উৎসবে যোগ দিয়েছেন ঢাকার কায়েতটুলীর ঘুড়ি নির্মাতা মোহাম্মদ জাভেদ।

তিনি বলেন, চাহিদার অনুপাতে পারিশ্রমিক কমে যাওয়ায় ঘুড়ি শ্রমিকদের অনেকেই এখন বিকল্প পেশায় মনোযোগ দিচ্ছেন।
“ঘুড়ি উৎপাদনের যত খরচ হচ্ছে, বিক্রিতে তত টাকা আসছে না আমাদের। ঘুড়ি নির্মাতারা তো হারিয়েই গেছে। এখন আমরা যারা পৈতৃক পেশা ধরে রেখেছি, তারাও পার্ট টাইম জবের মত চলটা ধরে রেখেছি।”

তিনি জানান, ঘুড়ি বানিয়ে আগে সপ্তাহে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকাও আয় করা সম্ভব ছিল। এখন পাঁচ হাজার টাকাও আসে না।

“আমরা ঘুড়ি বানিয়ে পাইকারিতে যত টাকায় বিক্রি করি, খুচরা বিক্রি করলে তার চেয়ে লাভ হয় দ্বিগুণ। কিন্তু বাজার তো ব্যবসায়ীরা দখল করে আছেন। লাভ না হলে এ পেশায় থাকবে কেন!”
ঘুড়িকে জনপ্রিয় করতে কাজ করছে ঢাকার বেশ ক’টি সংগঠন। লায়ন অ্যান্ড ড্রাগন এর মধ্যে একটি।

এ সংগঠনের আনিসুর রহমান বলেন, “ঘুড়ি ফেডারেশন দেশব্যাপী ঘুড়িকে জনপ্রিয় করে তোলার চেষ্টা করছে। এখন সরকার এগিয়ে এলে শিল্পীরা রক্ষা পায়। ঘুড়ি শিল্পকে কুটির শিল্প হিসেবেও অনুদান দিতে পারে সরকার।”

কক্সবাজার সৈকতে ঘুড়ি উৎসবের প্রথম দিন শেষে সন্ধ্যার পর উড়ানো হয় ফানুস। ছবি: মাহমুদ জামান অভি কক্সবাজার সৈকতে ঘুড়ি উৎসবের প্রথম দিন শেষে সন্ধ্যার পর উড়ানো হয় ফানুস। ছবি: মাহমুদ জামান অভি উৎসবের প্রথম দিনের শেষে সৈকতে ছিল বাংলার বাঘ রক্ষায় ‘বাঘ ছানার নৃত্য’ ও ফানুস উড়ানোর আয়োজন।
আর শনিবার বিকালে থাকছে ‘নৃত্যরত হাওয়াই মানুষ’, ভয়ঙ্কর ‘ড্রাগন’, আকর্ষণীয় ‘চরকি’, ফানুস আর এয়ারশিপের মত ঘুড়ি ডিসপ্লের আয়োজন।

রাতে ‘বাংলা বৈরী দানবদাহনের’ মধ্য দিয়ে শেষ হবে জমকালো ঘুড়ি উৎসব।