পিছু হটছেন এরশাদ

বারবার তিনশ আসনে নির্বাচন করার ঘোষণা দিলেও শেষ মুহূর্তে সেই অবস্থান থেকে পিছু হটছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনশ আসনে নয়, বরং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোটের হয়ে নির্বাচন করবেন সাবেক এই রাষ্ট্রপতি। তার রাজনৈতিক জোট সম্মিলিত জাতীয় জোটকেও মহাজোটে নির্বাচন করতে যাচ্ছে।

দুই একদিনের মধ্যে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন বন্টনের বিষয়টি সমাধান হবে। আসন চূড়ান্ত হলেই সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যৌথভাবে প্রেস ব্রিফিং করে জাতীয় পার্টি মহাজোটে নির্বাচনের ঘোষণা দেবে। দলটির নীতি নির্ধারণী সূত্র এতথ্য নিশ্চিত করেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নীতি নির্ধারণী সদস্য জানান, তিনশ আসনে নির্বাচনে জোটের শরিক দল ও জাতীয় পার্টির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের প্রচণ্ড চাপ থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত মহাজোটের হয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি আমরা। এমনকি সন্তোষজনক আসন না পাওয়া সত্বেও পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান বেগম রওশন এরশাদ, কো চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও দলের মহাসচিব এবি এম রুহুল আমিন হাওলাদার মহাজোটে নির্বাচনে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আসন চূড়ান্ত হয়ে গেলে যে কোন সময় মহাজোটের যৌথ ঘোষণা আসবে।

জানা গেছে, আসন বন্টন নিয়ে সন্তুষ্ট নয় জাতীয় পার্টি জোট। জোটের শরিক ও নিজেদের জন্য তারা ৭০টি আসন চাইলে শেষ পর্যন্ত ৫০টি আসন পেতে চায় তারা। প্রয়োজনে ৪০/৪৫টি আসন দিয়ে আরো ১০/১৫টি আসন উম্মুক্ত করে দেওয়ার দাবি করছে জাতীয় পার্টি জোট। কিন্তু জাতীয় পার্টির ‘উইনেবল ক্যান্ডিডেট কম’ যুক্তি দেখিয়ে ৩০টির বেশি কোন আসন দিতে রাজি নয় আওয়ামী লীগের চৌদ্দদলীয় জোট।

সূত্র জানায়, সম্মানজনক আসন পাওয়ার আশায় আওয়ামী লীগের সঙ্গে দরকষাকষি করছে জাতীয়দলটি। তার মধ্যে জোটের শরিকদলগুলোর চাপ রয়েছে। সম্মানজনক আসন না পেলে তিনশ আসনে নির্বাচন করতে আগ্রহী দলের নেতাকর্মীরা। জাতীয় পার্টি ও শরিক দলগুলোর সম্মানজনক আসন নয় তো তিনশ আসনে নির্বাচনের জন্য শীর্ষনেতাদের চাপ দিচ্ছেন। কেউ কেউ প্রকাশ্য ক্ষোভও ঝাড়ছেন পার্টি অফিসে। কর্মীদের ক্ষোভ-বিক্ষোভে অসহায় হয়ে পড়েছেন পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ, দলের মহাসচিবসহ শীর্ষনেতারা। এ বিষয়টিও আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আসন বাড়াতে শেষ মুহূর্তে দরকষাকষি করছেন জাপা নেতারা।

জানা গেছে, সম্মানজনক আসন বন্টন নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক চলছে জাতীয় পার্টির নীতি নির্ধারকদের। শনিবার এ নিয়ে কথা বলতে জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল বঙ্গবন্ধু এভিনিউর আওয়ামী লীগ অফিসে যান। তারা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসময় জাতীয় পার্টির মহাসচিব ছাড়াও দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কাজী ফিরোজ রশীদ, জিয়াউদ্দিন বাবলু, মুজিবুল হক চুন্নু, মশিউর রহমান রাঙ্গা, সোলাইমান শেঠ ও সুনীল শুভরায়। তারা জাতীয় পার্টি ও জোটের শরিকদলের আসনের জন্য সর্বোচ্চ দরকষাকষি করেন বৈঠকে। আসন বাড়াতে জোটের শরিকদলগুলোর প্রচণ্ড চাপ ও তৃণমুল নেতাকর্মীদের ক্ষোভ বিক্ষোভ তুলে ধরেন। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উইনেবল কোন ক্যান্ডিডেটকে বাদ দেওয়া হবে না। তবে অহেতুক নির্বাচনে জিতবেন না, এমন প্রার্থী দেওয়ার জন্য চাপাপাপি করবেন না। কারণ এখানে আবেগের কোন সুযোগ নাই, বরং তীব্র প্রতিযোগিতা করে নির্বাচনে জিতে আসতে হবে আমাদের। তারপরও জাপা নেতাদের আসন বাড়ানোর বিষয়টি মহাজোটনেত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ ও সর্বোচ্চ চেষ্টার আশ্বাস দেন ওবায়দুল কাদের।

বৈঠক সূত্র জানায়, আসন বন্টন নিয়ে ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে জাপা প্রতিনিধি দলের দীর্ঘক্ষণ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, এখন আসন ভাগাভাগির বিষয়টি আলাপ-আলোচনার পর্যায়ে আছে। কাল–পরশুর মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।

তিনি বলেন, ‘আমরা ইন্টারনাল আলোচনা করছি। ১৪ দল, জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য শরিক দলের সঙ্গেও আমরা কথা বলেছি।’ জাতীয় পার্টিকে কয়টি আসন দেওয়া হচ্ছে? জানতে চাইলে মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, তা এখন পরিষ্কার নয়। শরিকদেরকে জন্য কতটি আসন দেওয়া হবে? এ প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, ৬৫ থেকে ৭০টির বেশি আসন দেওয়া হচ্ছে না।

বৈঠকের বিষয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার সাংবাদিকদের বলেছেন, আসন ভাগাভাগিকে গুরুত্ব কম দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নির্ভুলভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টি পথ চলতে চায়। তিনি বলেন, ‘যেসব আসন আমরা চাই, সেগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রকৃতপক্ষে আমরা লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য নির্ভুল পথ চলতে হবে, এখানে আবেগের সুযোগ নেই।’

জাতীয় পার্টি কতটি আসন পেয়েছে? জানতে চাইতে রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, ‘আমরা আশাবাদী, চূড়ান্ত হওয়ার সময় আরও ভালো কিছু পাব, এই আশা করছে জাতীয় পার্টি।’ জানা গেছে, আওয়ামী লীগ যেসব আসন দিতে চাচ্ছে তাতে কপাল পুড়বে বর্তমান অনেক এমপি ও হেভিওয়েট নেতার। এমপি হওয়ার লোভে যারা সম্প্রতি জাতীয় পার্টিতে এসে কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করেছেন তাদের কপালেও দুশ্চিন্তার ভাজ। মনোনয়ণ পাচ্ছেন কিনা এখনো নিশ্চিত নন তারা। ফলে, মনোনয়ন প্রত্যাশী সবাই ‘মহাজোটের’ হয়ে নির্বাচনের জন্য অনুগত নেতাকর্মীদের নিয়ে দলের চেয়ারম্যান এরশাদ ও মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারের উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছেন। ত্যাগী নেতাকর্মীদের উপেক্ষা করে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে মনোনয়নের লোভে যাদের দলে ভেড়ানো হয়েছে, আসন পাওয়ার বিষয়টি অনিশ্চিত হওয়ায় তারাও চাপ দিচ্ছেন। সবমিলিয়ে আসন নিয়ে চরম বিপাকে পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ ও মহাসচিব হাওলাদার। পরিস্থিতি সামাল দিতে আসন বাড়ানোর জন্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গেও একাধিকবার কথা বলেছেন পার্টির চেয়ারম্যান ও মহাসচিব। বিরোধীনেতা রওশন এরশাদকে দিয়েও সরকারের সঙ্গে সম্মানজনক আসনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সাবেক এই রাষ্ট্রপতি। দফায় দফায় আলোচনা ও বৈঠকের মাধ্যমে আসন চূড়ান্ত করা নিয়ে দরকষাকষি চলছে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিতে।

সূত্র জানায়, আসন বন্টনের বিষয়টি দুই একদিনের মধ্যে চূড়ান্ত হবে। জাপার সিনিয়র কো চেয়ারম্যান ও বিরোধীনেতা রওশন এরশাদই মহাজোট প্রধান শেষ হাসিনার সঙ্গে কথা বলে আসনের বিষয়টি ফয়সালা করবেন বলে জানা গেছে। যে কোন সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিরোধীনেতার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।