কক্সবাজারের মুমিনুল কোহলিকে টপকে ছুঁলেন তামিমকে!

রোস্টন চেজের বলটা রেশমি টাইমিংয়ে পয়েন্ট ও কভারের মাঝ দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন বাউন্ডারিতে। গ্যালারির আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন কোনো কোনো দর্শক। তাঁদের মুখে পরিতৃপ্তির হাসি, হাতে করতালির বৃষ্টি। মুমিনুল সেই ভালোবাসার বৃষ্টিতে ভিজে আকাশের দিকে চাইলেন। যেন বলতে চাইলেন, এই মাঠ, এই দর্শক, অনেক দিয়েছে। আমি কৃতজ্ঞ!

‘টেস্ট বিশেষজ্ঞ’ তকমা পেলেও মুমিনুলের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন নেই। আজকের ইনিংসের কথাই ধরুন। প্রথম ওভারেই সৌম্য সরকারকে হারিয়ে দল বিপদে। এখান থেকে মুমিনুল দলকে টেনে তুলেছেন নিরাপদ পথে। না, ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো ধৈর্য নিয়ে ইনিংসটি তিনি খেলেননি। ধৈর্য তো ছিলই, এর সঙ্গে বাজে বল পেলেই সেটিকে সীমানায় পাঠিয়েছেন। সেঞ্চুরিটা এসেছে ১৩৫ বলে, যেখানে ফিফটি তুলতে খেলেছেন মাত্র ৬৯ বল! হ্যাঁ, ৯ চার আর ১ ছক্কায় মুমিনুলই খেলেছেন এমন দ্যুতিময় স্ট্রোক সমৃদ্ধ ইনিংস। জহুর আহমদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের সঙ্গে মুমিনুলের নিশ্চয়ই আত্মারই এক সম্পর্ক আছে।

এই ‘আত্মার’র সম্পর্কটা তো আছেই। টেস্ট ক্যারিয়ারে এ নিয়ে আট নম্বর সেঞ্চুরি তুলে নিলেন মুমিনুল। তাঁর এই আট সেঞ্চুরির মধ্যে ছয়টিই জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে! বাংলাদেশের আর কোনো ব্যাটসম্যানেরই এক মাঠে এতগুলো টেস্ট সেঞ্চুরি নেই। ক্রিকেটের ‘রোমান্টিক’ সমর্থকেরা ভাবতে পারেন, মুমিনুল একদিন এই পথে মাহেলা জয়াবর্ধনেকেও ছাপিয়ে যাবেন। টেস্ট ক্রিকেটে এক মাঠে (সিংহলিজ স্পোর্টস গ্রাউন্ড) সর্বোচ্চ ১১ সেঞ্চুরির রেকর্ডটি এখনো লঙ্কান কিংবদন্তির দখলে।

মুমিনুল সেই রেকর্ডের খাতায় দাঁড়ালেন চার সাবেকের পাশে—গ্রাহাম গুচ (লর্ডস), রিকি পন্টিং (অ্যাডিলেড ও সিডনি), ম্যাথু হেইডেন (মেলবোর্ন) আর মাইকেল ভন (লর্ডস)। নামগুলো খেয়াল করেছেন? এক মাঠে সর্বোচ্চ ছয়টি করে সেঞ্চুরি করেছেন তাঁরা। আর তাঁদের পাশে বসতে গিয়ে মুমিনুল পেছনে ফেললেন শচীন টেন্ডুলকার, জ্যাক হবস, হাবার্ট সাটক্লিফ, গ্যারফিল্ড সোবার্স, সুনীল গাভাষ্কারদের মতো কিংবদন্তিদের। নির্দিষ্ট একটি মাঠে তাঁদের সেঞ্চুরিসংখ্যা সর্বোচ্চ পাঁচটি।

এ তো গেল এক মাঠে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির রেকর্ডের কথা। বছরটাও কিন্তু মুমিনুলের জন্য পয়া। সেটি এমনই যে স্বয়ং বিরাট কোহলিও মুমিনুলের পেছনে! বাকিরা যেখানে সর্বোচ্চ দুটি করে সেঞ্চুরি পেয়েছেন সেখানে শুধু কোহলি আর মুমিনুলই এ বছর চারটি করে সেঞ্চুরির দেখা পেলেন। আর এই পথে মুমিনুল বর্তমান বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যানটিকে পেছনে ফেলেছেন ইনিংসের হিসেবে। ২০১৮ সালে এ পর্যন্ত চারটি সেঞ্চুরি করতে কোহলি খেলেছেন ১৮টি ইনিংস। মুমিনুল (১৩ ইনিংস) তাঁর চেয়ে ৫ ইনিংস কম খেলেই চার সেঞ্চুরির দেখা পেলেন। ভারতীয় অধিনায়ককে (৫৮.৭৯) স্ট্রাইকরেটেও পেছনে ফেলেছেন মুমিনুল (৬৬.৫৫)।

টেস্টে মুমিনুলের অভিষেক ২০১৩ সালে। অর্থাৎ গত পাঁচ বছরে মুমিনুল যেখানে মাত্র ৪ সেঞ্চুরি পেয়েছেন সেখানে শুধু এ বছরেই তুলে নিলেন আরও ৪টি সেঞ্চুরি। যার শুরুটাও ছিল এই জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে—গত জানুয়ারিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সেঞ্চুরি করেছিলেন দুই ইনিংসেই। এরপর গত মাসে মিরপুরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১৬১ রানের সেই ইনিংসটি। ‘ডাবল’ তুলে নিতে না পারায় যে ইনিংসটি নিয়ে তাঁর আক্ষেপ হওয়ার কথা। ‘পয়া’ জহুর আহমেদে মিরপুরের সেই আক্ষেপ ঘোচানোর সুযাগটা ছিলই। কিন্তু সেটি হারিয়ে ফেলে আক্ষেপটা আরও বাড়িয়েছেন। দুর্দান্ত এই ইনিংসটির শেষটা বেশ দুর্বল। ১২০ রানে ইনিংসটি থামল উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে। ব্যাট আর প্যাডের মাঝখানে যে বিরাট গ্যাপটা রেখে শ্যানন গ্যাব্রিয়লের বলটা যেভাবে খেললেন সেটি দেখে নিজের ওপরই রাগ হতে পারে মুমিনুলের।
তবে একটি ব্যাপার এখন সবারই জানা। টেস্টে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরি এখন তামিমের সঙ্গে মুমিনুলেরও। সতীর্থকে ধরতে মুমিনুল এই পথে কোহলির পাশে বসেছেন, আবার পেছনেও ফেলেছেন। ভ্রুকুটির কিছু নেই। সতীর্থকে ধরতে কখনো কখনো বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যানদেরও পেছনে ফেলতে হয়!