জিএম রহিম উল্লাহর জানাযায় কান্না আর কান্না, গ্রামেই চির সমাহিত

জিএম রহিম উল্লাহর জানাযায় কান্না আর কান্না

কক্সবাজার কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে বিশাল প্রান্তরজুড়ে কেবলই মানুষ আর মানুষ। মাঠ পেরিয়ে সেই জনস্রোত পেরিয়ে গেছে কক্সবাজার ষ্টেডিয়াম আর পৌর প্রিপ্যারেটরি উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠ পর্যন্ত। কত মানুষ হতে পারে? এই প্রশ্ন না তুলে বলা যায়, এতো মানুষ আসলো কোত্থেকে!

লাখো জনতার সেই জনস্রোতে কেবল একটিই আওয়াজ। শুধুই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ। তরুণ যুব বৃদ্ধ সবার চোখেই কান্নার অশ্রু। তারা তাদের নেতা জিএম রহিম উল্লাহর জন্য কাঁদছেন।

এমন দৃশ্যের দেখা মিললো কক্সবাজার সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জিএম রহিম উল্লাহর নামাজে জানাযায়। তিনি মঙ্গলবার ভোররাতের যে কোন সময়ে কক্সবাজার শহরের আবাসিক হোটেল সাগরগাঁওতে ইন্তেকাল করেন। নিজের শ্বশুরের মালিকানাধীন এই হোটেলে তিনি মাঝে মাঝেই রাত্রীযাপন করতেন।

বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় নামাজে জানাযার সময় নির্ধারিত ছিল। কিন্তু সকাল ৯টার মধ্যেই কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠ লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। সময় যতই গড়াতে থাকে জানাযায় মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। এক সময় কেন্দ্রীয় ঈদগাঁহ মাঠের বিস্তীর্ণ প্রান্তর পেরিয়ে মানুষ চলে মাঠের পূর্ব ও উত্তর পাশের রাস্তায়। সেই রাস্তা পেরিয়ে মানুষের ঢল নামে স্টেডিয়াম ও পৌর প্রিপ্যারেটরী উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠেও।

এই জনতার অধিকাংশেরই চোখে ছিল অশ্রু। তাদের প্রিয় নেতাকে হারিয়ে কাঁদছিলেন তারা। এক একজন বক্তা তাদের স্মৃতিচারণ করছিলেন আর উপস্থিত জনতা হাউ-মাউ করে কেঁদে উঠছিলেন।

জানাযাপূর্ব সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে নেতারা বলেন, জিএম রহিম উল্লাহ ছিলেন একজন মানবতাবাদী নেতা। সাহসী নেতা। তিনি পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে যেতেন। নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। তাঁর মতো সাহসী ও মিশুক নেতা এই মুহুর্তে আর নেই।

তারা আরও বলেন, জিএম রহিম উল্লাহ এমন নেতা ছিলেন যার ঘরে মাঝে মাঝেই রান্না করার চাউল থাকতো না। বাড়িওয়ালা বাড়ি ছাড়তে নোটিশ দিয়েছে।

তাদের মতে, জিএম রহিম উল্লাহ জীবনের সারাটা সময় রাজনীতিই করেছেন। ব্যবসার পেছনে ছুটেননি। ব্যবসার পেছনে ছুটলে হয়তো তিনিও টাকাওয়ালা নেতা হতে পারতেন। যদিও তিনি কখনওই তাঁর অভাব অভিযোগ কাউকে বুঝতে দেননি।

এতে বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় শুরা পরিষদ সদস্য মাওলানা আবদুল হালিম, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ চেয়ারম্যান কর্ণেল অব. ফোরকান আহমদ, সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল, সাবেক সাংসদ লুৎফুর রহমান কাজল, কক্সবাজার পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান, জামায়াতের চট্টগ্রাম মহানগর আমীর মুহম্মদ শাহজাহান, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সলিম উল্লাহ বাহাদুর, কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক মেয়র সরওয়ার কামাল, জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা মোস্তাফিজুর রহমান প্রমূখ।

এছাড়াও আরও বক্তব্য রাখেন জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর ও ঝিলংজা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল গফুর, টেকনাফের হোয়াইক্ষ্যং ইউপি চেয়ারম্যান ও জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা নুর আহমদ আনোয়ারী, ইসলামী ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় ছাত্র আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক তৌহিদ হোসেন, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এডভোকেট ফরিদ উদ্দিন খান, অধ্যক্ষ নুর হোসেন সিদ্দিকী, কুমিল্লা ভিকটোরিয়া কলেজের সাবেক ভিপি অধ্যক্ষ রেজাউল করিম, কক্সবাজার শহর জামায়াতের আমীর সাইয়েদুল আলম, ইসলামী ঐক্যজোটের কক্সবাজার জেলা সভাপতি হাফেজ মাওলানা সালামত উল্লাহ, রামু উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা জামায়াতের আমীর ফজলুল্লাহ মো. হাসান, ব্যবসায়ী ও জামায়াত নেতা জাহাঙ্গীর কাশেম, সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান শহিদুল আলম বাহাদুর, জেলা ছাত্র শিবির সাবেক সভাপতি হেদায়েত উল্লাহ, জেলা ছাত্র শিবির সভাপতি রবিউল আলম, শহর ছাত্র শিবির সভাপতি রিদুয়ানুল হক জিসান প্রমূখ।

পরিবারের সদস্যদের পক্ষে বক্তব্য রাখেন জিএম রহিম উল্লাহর ভাইপো ও জেলা যুবলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক জাহেদ ইফতেখার। এই বক্তব্য পর্ব পরিচালনা করেন জেলা জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক শামসুল আলম বাহাদুর ও শহর জামায়াত সেক্রেটারি আবদুল্লাহ আল ফারুক।

জিএম রহিম উল্লাহর নামাজে জানাযায় ইমামতি করেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আবদুল হালিম।

পরে তার মরদেহ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে যাওয়া হয় সদর উপজেলাধীন ভারুয়াখালী ইউনিয়নের বানিয়াপাড়া এলাকায়। ওখানেই জোহরের নামাজের পর আরেক দফা জানাযা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে জিএম রহিম উল্লাহকে চির সমাহিত করা হয়।

প্রসঙ্গত, জিএম রহিম উল্লাহ মঙ্গলবার (২০ নভেম্বর) ভোর রাতের কোন এক সময়ে কক্সবাজার শহরের ঝাউতলা এলাকার আবাসিক হোটেল ‘সাগর গাঁও’য়ের ৩১৬ নাম্বার কক্ষে একাকী ও ঘুমন্ত অবস্থায় এই পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন। পারিবারিক ও দলীয় সূত্রগুলোর ধারণা, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করে থাকতে পারেন।

জিএম রহিম উল্লাহ মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫৪ বছর। তিনি ৪ কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের বাবা। তিনি সদর উপজেলার ৪ নাম্বার ওয়ার্ডের বানিয়াপাড়ার আবদুল হাকিম ও দিলদার বেগম দম্পতির ছেলে। তারা ৪ ভাই ও ৩ বোন। তিনি ভাই-বোনদের মধ্যে সবার ছোট। কক্সবাজার সরকারী কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সেলিম উল্লাহর ছোট ভাই হলেন জিএম রহিম উল্লাহ।

জিএম রহিম উল্লাহর শ্বশুরের মালিকানাধীন এই হোটেলে মাঝে মধ্যেই তিনি রাত্রীযাপন করতেন। তিনি এই হোটেলটি দেখাশুনা করতেন। হোটেল সূত্র মতে, সোমবার (১৯ নভেম্বর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে হোটেলে এসে জিএম রহিম উল্লাহ চতুর্থতলার ৩১৬ নাম্বার কক্ষে যান। ওখানেই তিনি রাত্রীযাপন করেন।

হোটেল সূত্র জানায়, সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে হোটেল ঢোকার পর সকালে জিএম রহিম উল্লাহর কোন সাড়া না পেয়ে তাদের মধ্যে অস্থিরতা শুরু হয়।

তাদের মতে, জিএম রহিম উল্লাহ হোটেলটিতে অবস্থান করলে সকাল ৯টার মধ্যে হোটেল বয়দের ফোন করে রাস্তার কথা বলেন। কিন্তু মঙ্গলবার সকাল ১১টা পর্যন্তও হোটেল কক্ষ থেকে কোন নাস্তার অর্ডার না আসায় হোটেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহেদুল ইসলাম ও হোটেল বয়রা জিএম রহিম উল্লাহ অবস্থানকারি কক্ষে গিয়ে ডাকাডাকি করেন। কিন্তু সাড়া না পেয়ে বেলা ২টার দিকে বিকল্প চাবি দিয়ে দরজা খুলে দেখা যায়, জিএম রহিম উল্লাহ মারা গেছেন।

হোটেলটির ব্যবস্থাপক মোঃ আবদুল মান্নান জানান, অন্যদিন সকালে নাস্তার কথা বললেও আজ মঙ্গলবার কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে দুপুর দুইটার দিকে শ্যালক শাহেদুল ইসলাম এক্সট্রা চাবি নিয়ে কক্ষে ঢুকে পড়েন। ওই সময় মৃত অবস্থায় দেখতে পান জিএম রহিম উল্লাহকে।

সবারই ধারণা করছেন, তিনি ঘুমন্ত অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন।

এদিকে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে হোটেল সাগর গাঁওয়ের ৩১৬ নাম্বার কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীরা জিএম রহিম উল্লাহর মরদেহ ঘিরে কান্নাকাটি করছেন। ওই সময় হোটেলের ওই কক্ষে সাদা বেডসিট দিয়ে জিএম রহিম উল্লাহকে ঢেকে রাখা হয়েছে। আর হোটেলের সর্বত্র জামায়াতে ইসলামী নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের লোকারণ্য হয়ে আছে।

প্রসঙ্গত, জিএম রহিম উল্লাহর পরিবারে রয়েছেন স্ত্রী সাজেদা বেগম, চার মেয়ে ও এক ছেলে। তিনি ১৯৮২ সালে এসএসপি পাসের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করেন।