স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের স্বপদে থেকে নির্বাচন ইস্যুতে বিভ্রান্তিতে ইসি

স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পদে থেকে সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে বিভ্রান্তিতে রয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশন এ বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাদেরও ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। কমিশন সচিবালয় থেকে এ বিষয়ে ইসির কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে ফাইল উপস্থাপন করেছে। সেখান থেকে সিদ্ধান্ত এলে তা রিটার্নিং কর্মকর্তাদের জানিয়ে দেওয়া হবে। তবে, এ বিষয়ে অতীতের মতো কোনও পরিপত্র জারির সম্ভাবনা কম। নির্বাচন কমিশন সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।

অতীতের নির্বাচনগুলো পর্যালোচনা ও ইসির সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে থেকে নির্বাচন না করার বিষয়ে আদালতের আদেশ থাকলেও স্থানীয় সরকারের অন্যান্য পরিষদে এ বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই। অতীতে দেখা গেছে, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে থেকে কারও কারও সংসদ নির্বাচনের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ রকম পদে থেকে নির্বাচিত হয়ে বর্তমান দশম সংসদের একাধিক ব্যক্তি রয়েছেন বলে জানা গেছে। আবার কোনও কোনও ক্ষেত্রে রিটার্নিং অফিসার প্রার্থিরা বাতিল করেছেন। এক্ষেত্রে তাদের কেউ কেউ তা মেনে নিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন, কেউ কেউ পদত্যাগ করে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। আবার কেউ কেউ কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে গিয়ে রায় পেলে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।

নির্বাচন কমিশনের গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশে (আরপিও) জাতীয় নির্বাচনে অযোগ্য প্রার্থীর বিষয়ে বিদ্যমান আরপিও ১২(১)(গ) অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনও ব্যক্তি প্রজাতন্ত্রের বা কোনও সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের কোনও লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকলে নির্বাচেনে অংশ নিতে পারবেন না। আর লাভজনক পদ বলতে প্রজাতন্ত্রে বা সরকারি সংবিধবদ্ধ কর্তৃপক্ষ বা ৫০ ভাগের অধিক সরকারের অংশীদারিত্ব রয়েছে, এমন কোনও কোম্পানিতে সার্বক্ষণিকভাবে নিয়োজিত কোনও পদ বা অবস্থানকে বোঝানো হয়েছে।

আরপিও’র একই ধারায় আরও বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের বা কোনও সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের বা প্রতিরক্ষার কর্ম বিভাগের চাকরি থেকে পদত্যাগ বা অবসরের পরে তিন বছর এবং বরখাস্ত অপসারণ বা বাধ্যতামূলক অবসরের পর পাঁচ বছর পার না হলে তিনি প্রার্থী হওয়ার যোগ্য হবেন না। এ ধরনের কোনও প্রতিষ্ঠানে চাকরি শেষ করার পরে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ শেষ বা চুক্তি বাতিলের তিন বছর পার না হলে তিনি প্রার্থী হওয়ার যোগ্য হবেন না।

স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নির্বাচন করতে পারবেন কিনা, এ বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা রয়েছে। আর অতীতে কমিশন থেকেও ভিন্ন ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধি পদে থেকে নির্বাচন করতে পারবেন না বলে ড. শামসুল হুদা কমিশন থেকে এ সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করা হলে তা আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। ওই সময়ে ঢাকা সিটির মেয়র সাদেক হোসেন খোকা, চট্টগ্রাম সিটির মেয়র মহিউদ্দীন আহমেদ চৌধুরী ও সিলেট সিটির মেয়র বদরুদ্দীন আহমেদ কামরান ইসির সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে আদালতে হেরে যান। তাই সিটি মেয়রদের বিষয়ে ওই আদেশটি একটি নির্দেশনা দেখিয়ে দিয়েছে। কিন্তু একই সময়ে ঠাকুরগাঁও, টাঙ্গাইল ও ঝিনাইদহের মহেশপুরের পৌরসভার মেয়ররা আদালতে রিট করলে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ইসির পরিপত্র স্থগিত হয়ে যায়। পরে পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এসব মেয়র পরে আর ওই মামলা পরিচালনা করেননি।

সরকারি অফিস, গাড়ি ও ভাতা গ্রহণকে লাভজনক পদ আখ্যায়িত করে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে থেকে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই বলে কমিশনের কর্মকর্তারা অভিমত ব্যক্ত করলেও বর্তমান দশম সংসদে অন্তত তিন জন এমপি রয়েছেন, যারা পদে থেকে নির্বাচন করে জয়ী হওয়ার পরে পদত্যাগ করেছেন। উত্তরাঞ্চলের একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানও পদে থেকে এমপি নির্বাচিত হয়ে বর্তমান সংসদে রয়েছেন।

জানা গেছে, গত ১৩ নভেম্বর ব্রিফিং ও প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকালে একাধিক রিটার্নিং কর্মকর্তা স্থানীয় সরকার পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা পদে থেকে নির্বাচন করতে পারবেন কিনা, তার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। একইসঙ্গে এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ সমজাতীয় আরও কিছু পদধারীর বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হবে, তা জানতে চাওয়া হয়। ওই সময় কমিশন থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ কিছু বিষয়ের ব্যাখ্যা দিলেও স্থানীয় সরকার পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে কী হবে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেনি। কমিশন এ বিষয়ে পরে ব্যাখ্যা দিয়ে জানাবে বলে ওই কর্মশালায় প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে, রবিবার পর্যন্ত বিষয়টি জানানো হয়নি বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে টাঙ্গাইলের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসন শহীদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে এই বিষয়গুলো জানতে চাওয়া হয়েছিল। কমিশন তাৎক্ষণিক কোনও ব্যাখ্যা দেয়নি। জানিয়েছিল, পরবর্তী সময়ে জানাবে কিন্তু এখনপর্যন্ত ব্যাখ্যাটি পাইনি।’

জানতে চাইলে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পৌরসভা চেয়ারম্যানরা হাইকোর্ট থেকে রায় নিয়ে আসছেন ফলে তারা পদে থেকেই নির্বাচন করতে পারবেন। তবে, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা পদে থেকে নির্বাচন করতে পারবেন না—এমনটি সুস্পষ্টভাবে আইনে উল্লেখ নেই। আমরা বিষয়টি সুস্পষ্ট করার জন্য আইনগুলো পর্যালোচনা করছি। পদত্যাগ করে করবেন নাকি স্বপদে থেকে নির্বাচন করবেন—আইনে এর স্পষ্ট কিছু নেই। এজন্য আমরা আইনগুলো পর্যালোচনা করে তা রিটার্নিং অফিসারদের জানিয়ে দেবো।’

কমিশনার রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নির্বাচনি আইনে লাভজনক পদে থেকে নির্বাচন করতে পারবেন না বলে উল্লেখ রয়েছে। আর লাভজনক পদের ব্যাখ্যাও আইনে রয়েছে। সেটার আলোকেই কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে এই কমিশনার বলেন, ‘ওই আইনে যদি স্থানীয় সরকার পরিষদ লাভজনক হয়, তারা পদে থেকে ভোট করতে পারবেন না। আর যদি লাভজনক না হয়, তারা পারবেন। তবে, কমিশনের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে কেউ আদালতে গেলে, সেখান থেকে রায় নিয়ে এলে তো আমাদের কিছু করণীয় থাকবে না। কারণ আদালতের হাত অনেক লম্বা।’ কমিশন থেকে এ বিষয়ে একটি ব্যাখ্যা শিগগিরই রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হবে বলেও জানান এই কমিশনার।