ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না

জাতীয় সম্মেলনের ছয় মাস ও কেন্দ্রীয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচনের সাড়ে তিন মাস অতিবাহিত হয়ে গেলেও পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করতে পারে নি আওয়ামী লীগের ভাতৃপ্রতিম সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। কমিটি কবে পূর্ণাঙ্গ হবে তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। কমিটির আকার কেমন হবে, তা নিয়ে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নন দলটির দুই শীর্ষনেতা।

এর আগে বেশ কয়েকবার কমিটি ঘোষণা হবে এমন গুঞ্জন শোনা গেলেও তা বাস্তব রূপ নেয়নি। সর্বশেষ চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে কমিটি পূর্ণাঙ্গ হওয়ার গুঞ্জন শোনা গিয়েছিলো। তবে কেন্দ্রীয় শীর্ষ দুই নেতা বলছেন, ইতোমধ্যে কমিটি গঠনের সব প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়ে গেছে। যেকোনো দিন পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা হবে। এরই মধ্যে ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদকের কাছ থেকে রোববার (১৮ নভেম্বর) কমিটি পূর্ণাঙ্গ হওয়ার আভাস পাওয়া গেলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না।

ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির শীর্ষ নেতৃত্ব কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার ক্ষেত্রে সদ্য সাবেক কমিটির শীর্ষ দুই নেতাকে দোষারোপ করছেন। অন্যদিক সদ্য সাবেক কমিটির শীর্ষ নেতৃত্ব দোষারোপ করছেন বর্তমান নেতৃত্বকে। তাই কমিটি গঠন এখন জটিল আকার ধারণ করেছে।

ছাত্রলীগ সূত্রে জানা যায়, কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গের ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের ঐতিহ্য হলো সাবেক কমিটির নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া। তবে বর্তমান কমিটি সে ঐতিহ্য ভঙ্গ করেছে। তারা সাবেক কমিটির নেতাদের সঙ্গে কমিটির বিষয়ে কোনো আলোচনা করেন নি। কমিটি গঠনের বিষয়ে একবারই বসা হলেও সেখানে কমিটি গঠনের বিষয়ে কোনো আলোচনা হয় নি। সেখানে কিভাবে কমিটি হতে পারে, অতীতের কমিটিগুলো কিভাবে হয়েছিল সেসব বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে।

এ বিষয়ে ছাত্রলীগের গত কমিটির বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচনের পরপরই তাদের খুব বেশি অনুসারী থাকে না। এজন্য কমিটি গঠনের পরে নিজেদের প্রয়োজনে সাবেক কমিটির শীর্ষ নেতৃত্বের অনুসারীদের ওপর দীর্ঘ একটা সময় তাদের নির্ভর করতে হয়। তবে ধীরে ধীরে তাদের অনুসারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। বর্তমান কমিটির শীর্ষ নেতৃত্বের বেলায়ও একই ঘটনা ঘটেছে। তবে এখন তারা সাবেক কমিটির নেতাদের সাইডে ফেলে দিতে চাচ্ছেন।

তারা জানান, ছাত্রলীগের মাহমুদুল হাসান রিপন-মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন কমিটির পরে বদিউল আলম সোহাগ-সিদ্দিকী নাজমুল আলম কমিটির সময়ে ছাত্রলীগের সিন্ডিকেট ও নন সিন্ডিকেট নামে নেতারা আলাদা হয়ে যায়। তখন রিপন-রোটনের অনুসারীদের অবমূল্যায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে পরবর্তীতে তাদেরকে কমিটিতে স্থান দেয়া হয়। সম্প্রতি হল কমিটির নেতাদের অগ্রাহ্য করে ছাত্রলীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গের চিন্তা করলে হল কমিটির নেতারা তাতে বাধা দেন। পরবর্তীতে গত ৬ নভেম্বর রাতে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর বাসায় প্রথম দফা এবং পরবর্তীতে বাংলা মোটরের গোল্ডেন চিমনি রেস্টুরেন্টে দ্বিতীয় দফা বৈঠক হয় হল শাখা ছাত্রলীগের নেতাদের। সেখানে হল শাখার নেতারা তাদেরকে পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে না রাখার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কৈফিয়ত চান। প্রধানমন্ত্রীর কাছে হল শাখার নেতাদের বক্তব্য তুলে ধরা হবে জানিয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছেই ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্ব সেদিনের বৈঠক শেষ করেন। পরের দিনই নিজেদের অবস্থান জানান দিতে এবং নিজেদের মধ্যে কমিটি নিয়ে আলোচনা করার জন্য মধুর ক্যান্টিনে বসেন ঢাবির হল শাখার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা। এসময় অন্যদের সেখানে প্রবেশ করতে দেয়া হয় নি।

সংগঠনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সম্মেলনের দীর্ঘ আড়াই মাস অপেক্ষার পর নতুন নেতৃত্ব ঘোষণায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা খুশি। অন্যদিকে যারা কমিটিতে পদ প্রত্যাশী তাদের মধ্যে কাজ করছে মানসিক অস্থিরতা। তাই সব অস্থিরতাকে কাটিয়ে উঠতে দ্রুত ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করতেই প্রধানমন্ত্রী তাগিদ দিয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পদ প্রত্যাশী এক নেতা বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, বর্তমান কমিটির শীর্ষ নেতৃত্ব হল তথা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখাকে বাদ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের যে অশুভ চিন্তা করছেন তা সফল হবে না। হল কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে বাদ দিয়ে কমিটি গঠনের চিন্তা অবশ্যই উদ্দেশ্যে প্রণোদিত। এটা ছাত্রলীগের জন্য কোনো শুভ সংকেত নয়। এতে ছাত্রলীগের নিজেদের মধ্যেই অন্তর্কোন্দল সৃষ্টি হতে পারে। তাই ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের কাছে হল কমিটির নেতাদের মূল্যায়নের দাবি জানাচ্ছি।

জানা যায়, ২০১১ সালে কমিটি নির্বাচিত হওয়ার পরপরই তখনকার সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়া সত্ত্বেও নির্বাচিত হওয়ার চার মাস তিন দিনে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হয়। কিন্তু বর্তমান নেতারা নির্বাচিত হওয়ার পর খুব শিগগিরই পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা এখনো পূর্ণ করা হয়নি। এদিকে পদ পাওয়ার আশায় নেতাদের পেছনে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন পদ প্রত্যাশীরা। কবে তারা ছাত্রলীগের পরিচয় পাবেন এমন অপেক্ষারও যেন প্রহর শেষ হচ্ছে না। পদ প্রত্যাশী এমন অনেকে নানাভাবে ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন।

বর্তমান কমিটির পদ প্রত্যাশী ও সাবেক কমিটির বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, ছাত্রলীগ কীভাবে চলবে, কত দিন কমিটি থাকবে, তার সবই বলা আছে গঠনতন্ত্রে। কিন্তু দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে সেই গঠনতন্ত্র উপেক্ষিত। ফলে সংগঠনে সংকটের শেষ নেই।

এ বিষয়ে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বলেন, আপা (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) ব্যস্ত থাকায় হচ্ছে না। তবে আপার সাথে এ ব্যাপারে কথা হয়েছে। ইনশাআল্লাহ রোববার আই হোপ হয়ে যাবে।

কমিটি গঠনে সাবেক কমিটির নেতাদের অসহযোগিতা ও দেরি করাকে দোষারোপ করেছেন তিনি। তিনি বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, বুধবার আমার বা সভাপতির ফোন তারা ধরে নাই। তাদের লিস্ট দেয়ার কথা, কিন্তু তারা লিস্ট দেয় নাই। আমরা এ নিয়ে বসেছিলাম। আমাদের কমিটি প্রস্তুত করা আছে, কিন্তু তারা ইচ্ছা করেই দেরি করছে। তাদের বলে দিন একদিনে যাতে সব কমপ্লিট হয়, দুই দিনের সময় নেই।

তবে ছাত্রলীগ সভাপতি রেজোয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের মুঠোফোনে গত তিন দিনে বেশ কয়েকবার কল দেয়া হলেও তিনি কল রিসিভ না করায় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায় নি।

অভিযোগের বিষয়ে ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক কমিটির সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, ছাত্রলীগের ইতিহাসে লিস্ট দিয়ে কোনো সময়েই কমিটি হয় নাই। তাই লিস্ট দেয়ার তো কোনো প্রশ্নই আসে না।

তিনি বলেন, কমিটি গঠনের জন্য আমাদেরকে নিয়ে বসতে আপা (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন। নেত্রী সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন আগের কমিটির নেতাদের মধ্যে যাদের এ কমিটিতে নেতা হওয়ার বয়স আছে তাদেরকে কমিটিতে রাখার জন্য।

জাকির বলেন, আমরা কার লিস্ট দিবো, আমাদের ব্যক্তিগত কেউ তো এখানে নেই। এখানে সবাই ছাত্রলীগের নেতা। একদিনই তারা কমিটি গঠনের বিষয়ে আমাদের সঙ্গে বসেছিল। সেখানে কমিটির ক্রাইটেরিয়া নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। কিভাবে কমিটি হতে পারে, অতীতের কমিটিগুলো কিভাবে হয়েছিল সে বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে। তবে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা নিয়ে সেখানে কোনো আলোচনা হয় নি।

এ বিষয়ে ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক কমিটির সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, তুলনামূলকভাবে সাবেক হওয়ার পর আমাদের ব্যর্থতা কম, তাদের (শোভন-রাব্বানী) ব্যর্থতা বেশি। এজন্যই তারা নিজেরা নিজেরা বসছে। প্রধানমন্ত্রীর কথার বাইরে আমরা যেতে পারি না। প্রধানমন্ত্রী বলেছে, আমাদের দুইজনকে সঙ্গে নিয়ে একসঙ্গে কমিটি নিয়ে তার কাছে যেতে। সেখানে আমাদের দুইজনেরই স্বাক্ষর থাকবে। লিস্ট তো কিছুই না। যারা এর আগে রাজনীতি করেছে তারাই কমিটিতে পদ পাবে।

সময় দিয়েও দেখা করছেন না শোভন-রাব্বানী

তিন দফা সময় দিয়েও ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির সভাপতি রেজোয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী সদ্য সাবেক কমিটির শীর্ষ দুই নেতা সাইফুর রহমান সোহাগ ও এস এম জাকির হোসাইনের সঙ্গে বৈঠকে বসেন নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে এস এম জাকির হোসাইন বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, আমাদের দেরি করার সুযোগ নেই। কারণ গতকাল সন্ধ্যা ৭টায়, তার আগের দিন রাত ৯টায় সময় দিয়েও তারা আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসে নি। আজকে বিকাল ৫টায় তাদের আসার কথা ছিল, এখনও তারা আসে নি। অথচ তারা বলে আমাদেরকে নাকি তারা পায় না। কমিটি গঠনের বিষয়ে আমরা আন্তরিক। নেত্রী যেহেতু বলছেন, তাই আমরা কমিটি গঠনের বিষয়ে সহযোগিতা করতে চাই।

এ বিষয়ে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজোয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর মুঠোফোনে কল দেয়া হলেও তারা কল রিসিভ করেন নি।

ছাত্রলীগে কোনো আংশিক কমিটি নেই?

এ বিষয়ে ছাত্রলীগের গত কমিটির বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, সংগঠনের গঠনতন্ত্রে ‘আংশিক কমিটি’ বলে কিছু নেই। তারা অভিযোগ করে বলেন, নিজস্ব অনুসারীদের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে পদ দিতেই আংশিক কমিটি গঠনের চিন্তা করছে বর্তমান কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক। তাদের পক্ষ থেকে পরবর্তীতে কমিটি গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ করার কথা বলা হলেও সেক্ষেত্রে বর্তমান কমিটির নেতাদের নিজস্ব অনুসারীদের পদায়ন হবে, মূল্যায়ন হবে না মাঠের পরীক্ষিত নেতাদের।

এ বিষয়ে ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক কমিটির সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদেরকে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার জন্য বলেছেন। আমরা আংশিক কমিটির পক্ষে না। অবশ্যই পূর্ণাঙ্গ কমিটি হবে। ছাত্রলীগে আংশিক কমিটি হয় না। আমি এবং জাকির কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গের ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য সবসময় প্রস্তুত আছি।

এ বিষয়ে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজোয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর মন্তব্য পাওয়া যায় নি।

এ প্রতিবেদন লেখার সময় ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক কমিটির সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন বর্তমান কমিটির নেতাদের সঙ্গে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ১১-১২ মে ছাত্রলীগের ২৯তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। সম্মেলনের পরপর ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে নতুন কমিটি ঘোষণা করার কথা থাকলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিভিন্ন ইস্যুর কারণে ছাত্রলীগের নতুন কমিটির নেতৃত্ব নির্ধারণ ও ঘোষণা করতে বেশ সময় লেগে যায়। প্রায় আড়াই মাস পর গত ৩১শে জুলাই নতুন কমিটি ঘোষিত হয়। এতে কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পান রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন, সাধারণ সম্পাদক হন গোলাম রাব্বানী।