ধরপাকড় নয়, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র বাছাইয়ের নির্দেশ পুলিশ সদর দফতরের

রাজনৈতিক মামলা ও ধরপাকড়ে আপাতত ধীরগতিতে চলার নির্দেশনার পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ নির্বাচনি কেন্দ্রের তালিকা করার নির্দেশে দেওয়া হয়েছে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের। পুলিশ সদর দফতর থেকে সব জেলার পুলিশ সুপারদের এ সংক্রান্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়। একইসঙ্গে সোমবার (১২ নভেম্বর) ডিএমপি’র সদর দফতরে মাসিক অপরাধ সভায় এ সংক্রান্ত নির্দেশনা দেন কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। পাশাপাশি মামলা ও ধরপাকড় না করলেও বিভিন্ন এলাকায় বিরোধী মতাদর্শী, প্রভাব রয়েছে কিন্তু মামলা নেই, এমন ব্যক্তিদের তালিকা করতে বলা হয়েছে। পুলিশ সদর দফতর ও ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

পুলিশ সদর দফতরের এআইজি মিডিয়া মো. সোহেল রানা বলেন, ‘আমরা নির্দিষ্ট কোনও দল, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে টার্গেট করে মামলা বা ধরপাকড় করি না। যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বা আইন ভঙ্গ করে, কেবল তাদের বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পুলিশে আইনের বাইরে গিয়ে কিছু করার সুযোগ নেই।’ ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র বাছাই ও তালিকা প্রণয়ন প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দফতরের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এসব আমাদের নিয়মিত কাজের অংশ। আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে আমাদের কিছু কাজ করতে হয়। কারণ, শৃঙ্খলা ভঙ্গ হতে পারে এমন জায়গাগুলোতে আমাদের আগাম প্রস্তুতি রাখতে হয়।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডিএমপি হেডকোয়ার্টার্সের সভায় রাজধানীর ভেতরে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র বাছাই করে ‘রেড’, ‘ইয়োলো’ ও ‘গ্রিন’ এই তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করতে বলা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র বিবেচনায় সেসব এলাকায় পর্যাপ্ত সংখ্যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হবে। একই সঙ্গে আসনগুলোতে বিভিন্ন রাজনৈতিকদলের বিশেষ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলও বিবেচনায় আনতে বলা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা রেঞ্জের আওতাধীন একজন পুলিশ সুপার জানান, নির্বাচনের সময় নানা বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কখনও ঝুঁকিপূর্ণ বা অধিক গুরুত্বপূর্ণ, কম ঝুঁকিপূর্ণ বা কম গুরুত্বপূর্ণ এবং স্বাভাবিক ক্যাটাগরিতে কেন্দ্রগুলো ভাগ করা হয়। এসব ক্ষেত্রে কেন্দ্রের অবস্থান, যোগাযোগ ব্যবস্থা, প্রভাব বিস্তারের সম্ভাব্যতা ও প্রার্থীদের নিজ নিজ এলাকার কেন্দ্রগুলো বিবেচনায় আনা হয়। কারণ, কোনও প্রার্থীর নিজ এলাকার কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের কোনঠাসা করার সম্ভাবনা থাকে। একারণে এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়ে থাকে।

পুলিশ সদর দফতর ও ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে,নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়ায় নতুন করে আর রাজনৈতিক মামলা ও ধরপাকড় নিষেধ করা হয়েছে। তবে যাদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই মামলা রয়েছে বা যারা ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি, তাদেরকে গ্রেফতারে কোনও সমস্যা নেই। এছাড়া, রাস্তায় সরাসরি কেউ বিশৃঙ্খলা করলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে অসংখ্য ‘গায়েবি’ মামলা হওয়ার কারণে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিব্রতকর অবস্থার মুখোমুখি হয়েছেন। কারণ, কিছু মামলায় এমন ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে, যারা ঘটনার সময় বিদেশে অবস্থান করছেন বা অনেক আগেই মৃত্যুবরণ করেছেন। এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে যেকোনও মামলায় আসামি করার ক্ষেত্রে প্রত্যেকের বিষয়ে যাচাই-বাছাই করতে বলা হয়েছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সূত্রে জানা গেছে, গত অক্টোবর মাসে রাজনৈতিক বিবেচনায় ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় ৩৬টি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় ৭৪ জনকে গ্রেফতারের পাশাপাশি এজাহারে বিরোধী রাজনৈতিক দলের এক হাজার ৫৭৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অনেকগুলো মামলায় অজ্ঞাত হিসেবে কোনও সংখ্যা উল্লেখ না করে ‘আরও অনেকে’ লেখা হয়েছে।

মামলার নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ গত অক্টোবর মাসে ছয় হাজার ৩২৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এসবের মধ্যে ৫৪ ধারা ও ডিএমপি অ্যাক্টে গ্রেফতার করা হয়েছে ১১৭০ জনকে। বাকিদেরকে মাদক, ছিনতাই, খুনসহ নিয়মিত অন্যান্য মামলা এবং সিআর, জিআর, সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে গ্রেফতার করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব গ্রেফতারের মধ্যে বেশিরভাগই বিরোধী রাজননৈতিক দলের নেতাকর্মী।

সংস্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নভেম্বর মাসের ১ তারিখ থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ১৯টি রাজনৈতিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় ১৩৬ জনকে গ্রেফতারের পাশাপাশি ৩৭১ জনের নাম এজাহারে উল্লেখ রয়েছে। বেশ কয়েকটি মামলায় অজ্ঞাত হিসেবে ‘আরও অনেকে’ উল্লেখ করা হয়েছে। নভেম্বরের প্রথম নয় দিনে নিয়মিত মামলা ও পরোয়ানাভুক্ত মিলিয়ে মোট ২৫৮১ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে শুধু ৫৪ ধারা ও ডিএমপি অ্যাক্টেই গ্রেফতার করা হয়েছে ৩১৭ জনকে।