জোটের সমর্থনে স্বতন্ত্র প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত জামায়াতের

আগামী নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের সমর্থনে স্বতন্ত্র মার্কা নিয়ে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে জামায়াত। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় দলটির কোনও মার্কা নেই। এক্ষেত্রে স্বতন্ত্র মার্কা নিয়েই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটির নীতিনির্ধারকরা। ইতোমধ্যে এ সিদ্ধান্ত দলের সর্বস্তরে জানানো হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের  বলেন, ‘আমরা জোটগতভাবে নির্বাচন করবো এবং যেহেতু আমাদের মার্কা বাতিল করা হয়েছে, সে কারণে স্বতন্ত্র হিসেবেই প্রার্থীরা নির্বাচন মোকাবিলা করবেন।’

তবে এ সিদ্ধান্তের খবর এখনও জোটের প্রধান শরিক বিএনপিকে জানায়নি জামায়াত। রবিবার (১১ নভেম্বর) রাত নয়টার দিকে জোটের সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘জামায়াত এখনও আমাদের জানায়নি কীভাবে তারা নির্বাচন করবে।’

জামায়াত নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র মার্কা নিয়ে প্রার্থিতা করার বিষয়ে বহু আগেই সিদ্ধান্ত হয়েছে। শনিবার (১০ নভেম্বর) ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা উঠলে জামায়াতের প্রতিনিধি মাওলানা আবদুল হালিম একদিনের সময় চান।

জামায়াত সূত্রগুলো বলছে, ইতোমধ্যেই প্রায় ১০০ আসনে তাদের প্রার্থীদের নার্সারি করা হয়েছে। তবে জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বাস্তবতায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাদের চাহিদার পূর্ণ ফল যে আসবে না, তা পূর্বানুমিত। শেষ পর্যন্ত এই তালিকা ৫০ এ গিয়ে ঠেকতে পারে, এমন ইঙ্গিত ছিল জামায়াতের একজন কেন্দ্রীয় নায়েবে আমিরের। তার ভাষ্য ছিল, ‘বিগত নির্বাচনগুলো থেকে এবার তো বেশি চাওয়া হবেই।’

যদিও বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন প্রবীণ সদস্য জানিয়ে রেখেছেন— নিবন্ধন নেই, মার্কা নেই, এমন বাস্তবতায় জামায়াতের সামনে জাতীয় নির্বাচন। বিগত নির্বাচনগুলোতে অন্যতম শরিক হিসেবে জোটের সমর্থন পেলেও এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। সুনির্দিষ্টভাবে জামায়াতের বাতিল হওয়া ‘দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে’ বিগত দিনে ২০-২১টি আসনে জেতার রেকর্ড আছে দলটির। এবারও সেই আসনগুলোর ওপর গুরুত্ব দিতে বলা হবে।

২০০১ সালে চার দলীয় জোটের ব্যানারে ৩১টি, এরমধ্যে জোটবদ্ধভাবে ৩০টি এবং এককভাবে একটিতে নির্বাচন করে জামায়াত। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ৩৯টি আসনে জোটগত সমর্থন পেলেও চারটি থেকে দলীয়ভাবে করে। দলটির তৃণমূলের অভিমতের ভিত্তিতে এবার তাদের দাবি ৬২টি। তবে চূড়ান্তভাবে ত্রিশটি আসনে ন্যূনতম ছাড় চায় জামায়াত।

১৯৮৬ সালের ৭ মে জাতীয় সংসদের তৃতীয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামি ৭৬টি আসনে মনোনয়ন দিয়েছিল। ওই নির্বাচনে দলটি ১০টি আসনে বিজয়ী হয়। ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ১০ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে জামায়াত। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ১৮টি আসনে বিজয়ী হয়। এই নির্বাচনে দলটি ২২২ জন প্রার্থী দিয়েছিল। ১৯৯৬ সনের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ৩টি আসনে জয়ী হয়।২০০১ সনের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ১৭টি আসন পায়। মহিলা আসনগুলো থেকে ৪টি আসনে জয়ী হয় তারা। ২০০৮ সনের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ২টি আসনে বিজয়ী হয়। ওই নির্বাচনে দলটি জোটগতভাবে ৩৯টি ও ৪টিতে এককভাবে নির্বাচন করে। এছাড়া, প্রথম ও দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগের ব্যানারে নির্বাচন করেছিল জামায়াত।

জামায়াতের নেতাকর্মীরা বলছেন, একাদশ জাতীয় নির্বাচনে দল হিসেবে টিকে থাকাটা বেশি জরুরি। এছাড়া, সরকারবিরোধী রাজনৈতিক ঐক্য তৈরিকালে দলটিকে কেন্দ্র করে প্রায় দু’মাসের বেশি সময় কেটেছে। বিষয়টি সুরাহা হওয়ার পরই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়। জামায়াত বরাবরই বলে এসেছে, তারা বৃহত্তর ঐক্যে বাধা হবে না।

জোটের সমর্থনে কীভাবে স্বতন্ত্র প্রার্থিতা করা হবে— এমন প্রশ্ন ছিল কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার এক সদস্যের কাছে। নাম প্রকাশ না করে তিনি বলেন, ‘জোটগতভাবে মানে জোটের সমর্থনে থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থিতা, সেখানে ফ্রন্ট বা জোটের অন্য কোনও প্রার্থী থাকবে না। এই সমঝোতার মধ্য থেকেই নির্বাচন করবে জামায়াত।’

উল্লেখ্য, রবিবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন জামায়াত ইসলামীর সাবেক দুই সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী ও কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির আ ন ম শামসুল ইসলাম। দুজনই চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া) আসন থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে উপজেলা জামায়াতের আমির ও উপজেলা চেয়ারম্যান জহিরুল ইসলাম মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন।