লাশ নিয়ে টানাটানি

কক্সবাজারে ‘সাংবাদিক’ শফি ছুরিকাঘাতে মারলো স্ত্রী রোজিনাকে!

কক্সবাজার শহরের পাহাড়তলীতে ‘সাংবাদিক’ নামধারী মোহাম্মদ শফির ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন তারই স্ত্রী রোজিনা আক্তার (২৫)।

ঘটনাটি বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ঘটলেও কক্সবাজার সদর হাসপাতালে দুইদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর শনিবার বিকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। এই ঘটনায় পালিয়ে রয়েছেন কথিত সাংবাদিক মোহাম্মদ শফি।

নিহত রোজিনা আক্তার পাহাড়তলী এলাকার মোঃ শফির মেয়ে।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হিমঘরে (লাশঘর) বোনের লাশের জন্য অপেক্ষা করা বড় বোন রুমা কক্সবাজার ভিশন ডটকমকে জানান, সাত-আট বছর আগে ছোট বোন রোজিনা ও শফি প্রেম করে বিয়ে করে। কয়েকমাস ভাল করে কাটলেও তারপর থেকে তাদের দুইজনের পরিবারে কলহ শুরু হয়। বিভিন্ন সময় ছোট-খাটো বিষয় নিয়ে রোজিনাকে অমানবিকভাবে নির্যাতন করতো স্বামী মোহাম্মদ শফি।

নিহতের বড় বোন রোমা বলেন, আমার ছোট বোনকে প্রেম করে বিয়ে করলেও তার আগে আরও একটি বউ আছে শফির। কথাটি গোপন রেখে ওই সময় বোনকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে বিয়ে করে শফি।

নিহতের বাবা মোঃ শফি কক্সবাজার ভিশন ডটকমকে জানান, মেয়ের বিয়ে হওয়ার পর থেকে প্রথম স্ত্রী থাকায় ২য় সংসারে অশান্তি লেগেই থাকতো। এ নিয়ে এলাকায় অনেকবার বিচার-শালিশও হয়েছে।

তিনি জানান, মেয়ে রোজিনাকে মারধর করলে সে বাবার বাড়ি চলে আসতো। আবারও সামাজিক ভাবে বিচার-শালিশ হওয়ার পর মেয়েকে নিয়ে যেতো স্বামী মোহাম্মদ শফি।

সদর হাসপাতালের লাশঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বড় বোন রোমা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার ছোট বোন সংসার টিকাতে অনেকবার চেষ্টা করেছিল। তাই বারবার এলাকার বিচারের মাধ্যমে স্বামী শফির ঘরে ফিরে গেছে রোজিনা। কে জানতো এভাবেই নৃশংস ভাবে হত্যা করবে আমার ছোট বোনটিকে।

রোমা আরও বলেন, আমার বোনকে বারবার শরীরে আঘাত করার কারণে সামাজিকভাবে বিচার না পাওয়ায় আদালতের মাধ্যমে একটি নারী নির্যাতন মামলাও করেছিল রোজিনা আক্তার। এর আগেও একবার বোনকে অমানষিক নির্যাতন করে রাতের আঁধারে এলাকার ছরাতে ফেলে দিয়েছিল শফি।

স্বামীর ছুরিকাঘাতে নিহত স্ত্রী রোজিনা যে ভাড়া বাসায় থাকতেন তার পাশেই ভাড়া বাসায় থাকতেন বড় বোন রোমা।

রোজিনার বাসার পাশ্ববর্তী মানুষের কাছ থেকে তিনি জেনেছেন, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে স্বামী শফি রোজিনাকে বেধড়ক মারধর করে। ওই সময় গলা ধাক্কা দেয়ায় সিঁড়ি থেকে পড়ে যান রোজিনা। পরে টেনে-হিচড়ে ঘরে ঢুকিয়ে আবারও শরীরে আঘাত করে স্বামী। তাতেও ক্লান্ত হয়নি নরপশু স্বামী শফি। এক পর্যায়ে পেটের নিচে উপর্যোপরি ছুরিকাঘাত করে ঘাতক স্বামী মোহাম্মদ শফি। ওই সময় স্ত্রীকে ক্ষতবিক্ষত করে পালিয়ে যায় স্বামী।

শুক্রবার ভোরে এই ঘটনার খবর পেয়ে পরিবারের স্বজনরা ঘর থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে আসেন গুরুতর আহত রোজিনাকে। সেখানে দুইদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর রোববার বিকালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রোজিনা আক্তার।

নিহত রোজিনার সংসারে ৫ বছরের জান্নাতুল নাঈমা নামে একটি কন্যা সন্তানও রয়েছে। ওই কন্যা সন্তানকে দাদার বাড়িতে রেখে পালিয়ে গেছে ঘাতক স্বামী মোহাম্মদ শফি।

এই ঘটনার তদন্তকারী কর্মকর্তা কক্সবাজার সদর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ইমরান বলেন, প্রথমে আমরা শুনেছিলাম গুলিতে নিহত হয়েছে। লাশের সুরতহালে কোন গুলির আঘাত পাওয়া যায়নি। তবে পেটের নিচে ধারালো ছুরির কয়েকটি আঘাত পাওয়া গেছে। এই আঘাতেই তার মৃত্যু হতে পারে।

এসআই ইমরান জানান, স্বামীর ধারালো ছুরির আঘাতে রোজিনা সদর হাপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়ার পর শনিবার বিকালে লাশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই বাড়ি নিয়ে গেছেন। সেখান থেকে আবার ময়নাতদন্ত করার জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালে আনা হয়েছে।

এ বিষয়ে কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদ উদ্দিন খন্দকার জানান, এই ঘটনায় নিহতের বাবা মোঃ শফি বাদি হয়ে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।

ওসি জানান, আসামীকে ধরার জন্য পুলিশ চেষ্টা চালাচ্ছেন।

প্রসঙ্গত, মোহাম্মদ শফি কক্সবাজার শহরের পাহাড়তলীর ইউছুলোর ঘোনা এলাকার আবুল হাকিম মাঝির ছেলে। সে কক্সবাজারের একটি পত্রিকার সম্পাদকের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে কার্ড ভাড়া নিয়ে চলতো। মফস্বলে ওই কার্ড নিয়ে সরকারী বেসরকারী বিভিন্ন সময় দপ্তরে দপ্তরে চাঁদাবাজি করতো।

বিভ্রান্তি

এদিকে কথিত সাংবাদিক শফির ছুরিকাঘাতে স্ত্রী হত্যার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিক মহলে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে, কে এই শফি? অনেকেই দৈনিক যুগান্তর প্রতিনিধি শফি উল্লাহ শফি কিনা জানতে নানা জায়গা থেকে কক্সবাজার ভিশন ডটকমে ফোন আসতে শুরু করে। পরে নিশ্চিত হওয়া যায়, এই শফি মূলতঃ সাংবাদিক নামধারি একজন শহরের পাহাড়তলী এলাকার বাসিন্দা।

এ ব্যাপার বিভ্রান্ত না হতে সকলের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন সাংবাদিক সমাজ।