৬ বছর ধরে অধরা কিশোরী অপহরণের রহস্য

৬ বছর ধরে অধরা কিশোরী অপহরণের রহস্য

৬ বছর ধরে অধরা কিশোরী অপহরণের রহস্য
১২ বছর বয়সী একটি মেয়েকে তার শোবার ঘর থেকে অপহরণ করা হয়। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য বিহারের এক গ্রামে মাঝরাতে এই ঘটনা ঘটে ছয় বছর আগে। এই অস্বাভাবিক ঘটনার প্রেক্ষিতে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত ফেডারেল গোয়েন্দা সংস্থাকে আদেশ দেয় তদন্তের, কিন্তু তারা কিছুই উদ্ধার করতে পারেনি।

এখনো মেয়েটির বাবা-মা বিশ্বাস করে যে সে বেঁচে আছে।

যেভাবে অপহরণ হলো মেয়েটি
মুজাফ্ফরপুরে সে রাতে ভীষণ বৃষ্টি হচ্ছিল। মাঝরাতে অতুল্য চক্রবর্তী ঘুম থেকে উঠলেন টয়লেটে যাবেন বলে। তিনি দেখলেন বাড়ির উঠোনে আলোকিত করে রাখে যে দুটো বাতি তা জ্বলছে না।

তিনি নিজের শোবার ঘরে ফিরে এলেন এবং স্ত্রী মৈত্রীকে ঘুম থেকে ডেকে তুললেন। স্ত্রীকে প্রশ্ন করলেন যে সে ঘুমাতে যাওয়ার আগে বাতি জ্বালাতে ভুলে গিয়েছিলেন কি-না। কিন্তু মৈত্রী জানান, তিনি ভোলেন নি। তিনি দ্রুত তোষক সরিয়ে বিছানা থেকে উঠে পড়েন।

এই দম্পতি মুজাফ্ফরপুরে তাদের দোতলা বাড়িতে থাকেন।দ্রুত দৌড়ে তারা নিচতলার বারান্দায় চলে গেলেন।

এরপর টর্চ-লাইটের আলোতে এই দম্পতি যা দেখতে পেলেন বন্ধ বারান্দার দুটো দরজাই অর্ধেকটা খোলা। আতঙ্কে তাদের চোখের ঘুম ছুটে গেল। আতঙ্কিত মা পাশের শোবার ঘরে ছুটে চলে গেলেন যেখানে তার ১২ বছর বয়সী মেয়ে নভারুনা ঘুমাচ্ছিল।

দুর্বল এবং লাজুক মেয়েটি বাড়িতেই সে দিনটি কাটিয়েছিল। হাতে হেনা লাগিয়েছিল, এরপর কার্টুন দেখে টেলিভিশনে । এবং তারপর রাতের খাবারের জন্য পাউরুটি ও কলা খেয়েছিল।

বাতি জ্বলে ওঠার পর দেখা গেল একটি গোছানো সিল্কের শাল, একটি বালিশ এবং মশারি বিছানার ওপর জায়গা মত রয়েছে। কিন্তু বিছানায় কেউ নেই।

সে এখানে নেই, সে নেই! এই বলে মিসেস চক্রবর্তী রাতের নির্জনতা ভেঙে চিৎকার করে ওঠেন।
২০১২ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার নবারুণা চক্রবর্তী নিখোঁজ হয়ে যান। অথবা তারিখটা হয়তো ১৯শে সেপ্টেম্বর দিনের প্রথমভাগেও হতে পারে।

মেয়েটি ‘উধাও’ হয়ে গেলো
তদন্তকারীরা ধারণা করেন, জানালার লোহার শিক খোলার পর অন্তত একজন ব্যক্তি ওই রুমে প্রবেশ করেছিল।

সে সম্ভবত মেয়েটির কণ্ঠরোধ করে এবং ঘুমন্ত মেয়েটিকে চেতনা-নাশক প্রয়োগ করে। সে জেগে উঠে আতঙ্কে প্রস্রাব করে দেয়, বিছানার চাদর ভেজা। এরপর তাকে বারান্দা দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়।

তদন্তকারীদের ধারণা অপহরণকারী ঘরের ভেতর থেকে দুটো দরজা খুলে দেয় যাতে আরও লোকজন ঘরে ঢুকতে পারে। তারা মেয়েটিকে বাড়ির পেছনের দিকে দরজা দিয়ে বের করে নিতে সাহায্য করে – সামনের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল।

কয়েক গজ দূরে মূল রাস্তায় একটি গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। বৃষ্টির রাতে এভাবে মেয়েটিকে নিয়ে অপহরণকারী মিলিয়ে গেল।

নবারুনার বাবা-মায়ের বিশ্বাস সে এখনো বেঁচে আছে এবং তার অপহরণকারী বহাল তবিয়তে আছে। তদন্ত-দলের সদস্যরা অবশ্য মনে করেন, মেয়েটি আর জীবিত নেই কিন্তু তারা স্বীকার করছে যে অপহরণকারীরা নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

ওই ঘটনার এক মাস পরে, পুলিশ তিনজনকে আটক করে যাদের মধ্যে চক্রবর্তী পরিবারের একজন দূর-সম্পর্কের আত্মীয় ছিলেন।

পুলিশ বলে, এই তিনজন “কিছু একটা গোপন করছে”, কিন্তু তাদের এই অপরাধে অভিযুক্ত করার মত কিছু খুঁজে পায়নি। নয়মাস কারাগারে থাকার পর তাদের ছেড়ে দেয়া হয়।

এরপর সেবছর ২৬শে নভেম্বর স্থানীয় পুলিশ একটি প্লাস্টিকের ব্যাগের ভেতর কিছু মাথার খুলি চক্রবর্তী পরিবারের বাড়ির কাছে নর্দমায় পায়। পৌর কর্মীরা এসে সেই ব্যাগ তুলে এনে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে।

হাড়গোড় পরীক্ষা
এরপর সেদিনই পরের দিকে, পুলিশ চক্রবর্তী পরিবারকে জানায় যে তাদের মেয়ের শরীরের হাড় পাওয়া গেছে। তবে মেয়েটির বাবা-মা তা এই তথ্য মেনে নিতে প্রত্যাখ্যান করে এবং প্রশ্ন তোলে: প্রমাণ কোথায়?

পরের মাসে সরকারি একটি হাসপাতালে হাড়ের ফরেনসিক পরীক্ষা হয় । ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করেন চিকিৎসকরা।

পরীক্ষক এরপর পরীক্ষার সমাপ্তি টানেন এই মর্মে যে, এসব হাড় “মানব শরীরের হাড়ের প্রৃকতির এবং একজন ব্যক্তির, একটি মেয়ের যার বয়স আনুমানিক ১৩ থেকে ১৪ বছর, যার মৃত্যু হয়েছে এগুলো পাওয়ার ১০ থেকে ২০ দিন পূর্বে”। মৃত্যুর কারণ “নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি”।

পরীক্ষক আরও বলেন পরনের কাপড়ে থেকে অনুমান করা যায় যে বিকৃত দেহাবশেষ (একটি) টিনএজ মেয়ের।

চক্রবর্তী পরিবার অবশ্য সবসময়ই বিশ্বাস করে এসেছে যে, ওইসব হাড়গোড় তাদের মেয়ের নয়। এবং ব্যাগটি সেখানে পরিকল্পিতভাবে ফেলা হয়েছে। ২০১৪ সালে তারা ডিএনএ টেস্ট করতে রাজি হন। কিন্তু তারা বলেন এর ফলাফল তাদের কাছে জানানো হয় নি।

এই হাড় যদি আমার মেয়ের সত্যিই হয়ে থাকে তাহলে তদন্তকারীরা ডিএনএ টেস্টের ফলাফল কেন আমাদের জানাচ্ছে না?” বিস্ময় প্রকাশ করেন মিস্টার চৌধুরী।

কেন্দ্রীয় অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এজেন্সি সিবিআই যারা ২০১৪ সালে তদন্ত-ভার নেয় তারা বলে, যা ঘটেছে তা ছিল ব্লাইন্ড কিডন্যাপিং-কাম-মার্ডার কেস” অর্থাৎ কোনও কুল-কিনারা করা যায়নি এমন অপহরণ কাম হত্যার ঘটনা।

যে শহরে আইনের প্রয়োগ নেই
মুজাফফরপুর, ভারতের অন্যতম দরিদ্র একটি রাজ্যের ক্ষয়িষ্ণু একটি শহর যা সস্তা কাপড়, বিশেষ একধরনের বালা আর গ্যাংস্টারদের জন্য পরিচিত।

মুক্তিপণের জন্য অপহরণ আর খুন এখানে সাধারণ ঘটনা। এখানে অনেক মানুষের জমির প্লট বল প্রয়োগ করে কিংবা ভয়-ভীতি দেখিয়ে সস্তায় কিনে তা গ্রাস করে নিতে চায় “ল্যান্ড মাফিয়া” বা “ভূমি দস্যুরা।”

চক্রবর্তীদের শতবর্ষী পুরনো ভগ্নপ্রায় বাড়িটি বিক্রি করে দেয়ার পরিকল্পনা চলছে দীর্ঘদিন। মিস্টার চক্রবর্তী ওষুধ কোম্পানির একজন অবসরপ্রাপ্ত সেলস রিপ্রেজেনটেটিভ, বয়স ৬৬ বছর।

অপহরণের ঘটনার দিন পনেরো আগে তিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রির ব্যাপারে একটি চুক্তিতে সই করেন- একজন এজেন্টের কাছে ৩০ মিলিয়ন রুপিতে বিক্রির জন্য তিনি অগ্রিম অর্থ গ্রহণও করেন।

এই বিক্রির খবর শহরে ছড়িয়ে পড়লে মিস্টার চক্রবর্তী চুক্তি বাতিল করতে বাধ্য হয় এবং তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী আরেক জনের কাছে বাড়ি বিক্রি করেন। এমনকি স্থানীয় পুলিশ তার বাড়িতে আসে এবং তাকে চুক্তি বাতিল করতে বলে, জানান মি চক্রবর্তী।

এটা ছিল পরিষ্কার স্থানীয় পুলিশও গ্যাংদের সাথে চক্রান্তে লিপ্ত এবং তারার তাকে চুক্তি বাতিলের জন্য এবং তা অন্য পার্টির কাছে বিক্রি করার জন্য চাপ দিচ্ছিল। আমি প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছিলাম। তারপরই আমার মেয়েটি নিখোঁজ হল।

তার অপহরণের সাথে সাথে এই বাড়িটি কার্যত ক্রাইম সিনে পরিণত হল এবং এর বিক্রির প্রক্রিয়াও স্থগিত হয়ে গেল।

পরবর্তী কয়েক বছরে পুলিশ নবারুনার পরিবার, আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধবী, এবং শিক্ষকদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।। চক্রবর্তীদের বাড়ির ভেতরে তল্লাশি হয়েছে, তার ডায়েরি নিয়ে যাওয়া হয়েছে যদি কোন তথ্য পাওয়া যায়।

পুলিশ জানিয়েছে একটিতে কিছু ছবি এবং স্টিকার ছিল, আর অন্যটিতে নিজের “স্বপ্নপুরুষের গুণাবলী কেমন হবে সে নিয়ে লেখা” লিখেছিল নবারুনা।

তার বাড়ির সেপটিক ট্যাংকও পুলিশ পরীক্ষা করেছে মৃতদেহের সন্ধানে কারণ পুলিশের সন্দেহ ছিল , সে ‘অনার কিলিং’ এর স্বীকার হল কি-না। দিল্লিতে যে হোস্টেলে এই দম্পতির বড় মেয়ে থাকছে সেখানেও নজরদারি চালায় পুলিশ।

পুলিশের সম্পৃক্ততা
অন্তত ১০০ জনের মোবাইল ফোনের রেকর্ড, পরিবারের সদস্য এবং সন্দেহভাজন সবারটাই পরীক্ষা করা হয়েছে। বেশ কয়েকটি জায়গায় রেইড দেয়া হয়েছে ।

নবারুনাকে খুঁজে পেতে আমরা আন্তরিক চেষ্টা চালিয়েছি। বিজ্ঞানসম্মত ভাবে তদন্ত চালিয়েছি, নানারকম পরীক্ষা করা হয়েছে” আদালতকে অবহিত করে পুলিশ।

সর্বশেষ মাসে সিবিআই সুপ্রিম কোর্টে বলে তারা এপ্রিলে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে, আটদিন তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং আদালত তাদের জামিন দেয়ার আগে ৯০ দিনের জন্য তাদের জুডিশিয়াল কাস্টডিতে রিমান্ডে পাঠানো হয়। তাদের বাড়ি এবং অফিস তল্লাশি করে সন্দেহজনক কিছু মেলেনি।

কিন্তু ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ মোড় হল, গোয়েন্দা বাহিনী জানায় তারা তিনজন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে যারা এই ঘটনার ঘটনার সময় সরাসরি তদন্তের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।

আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দাও
মেয়ের অপেক্ষায় থাকা হৃদরোগী মিস্টার চক্রবর্তীকে রাতের পর রাত ঘুমহীন কাটানোয় অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ খেতে হচ্ছে। ঘটনার পার থেকে দুইবছর ধরে মিসেস চক্রবর্তী প্রায় প্রতিদিনই থানায় ধর্না দিচ্ছেন মেয়ের খোঁজ মিলল কি-না জানতে।

পুলিশদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “আমার সাথে খেলা খেলো না, আমার মেয়েকে আমার কাছে ফিরিয়ে দাও”।
এই বছরগুলোতে মিস্টার চক্রবর্তী শোকগ্রস্ত পিতার চরিত্র থেকে রাগী, একজন গোয়েন্দায় পরিণত হয়েছেন যিনি মেয়ের নিখোঁজ রহস্যের ক্লু খুঁজে বের করার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন।

তিনি পুলিশের সাথে কথোপকথনের চার গিগাবাইট ফোনালাপ এবং ‘রহস্যময় ফোনকল’ রেকর্ড করেছেন নিজের মোবাইল ফোনে। মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর এসব ফোন আসে তার কাছে।

পরিষ্কার হাতের লেখায় বিশদভাবে তিনি পাঁচটি ডায়েরি লিখেছেন, যেখানে তদন্তকারীদের সাথে তার আলাপের বিস্তারিত রয়ছে। এই ঘটনার ওপর একটি বই লেখা শুরু করেছেন তিনি এবং ইতোমধ্যে ১৭০ পৃষ্ঠা লেখা শেষ হয়েছে।

রাজনীতিবিদ, বিচারক, এবং প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট বরাবরে তিনি চিঠি লিখেছেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে দেখা করে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে তদন্তের শম্বুকগতি নিয়ে নালিশ করেছেন।

চক্রবর্তীদের বাড়িটি এখন দু:খ আর যন্ত্রণার এক আবাস।

নবারুনার সমস্ত কাপড়, স্কুল ইউনিফর্ম, গোলাপি সাইকেল, পুতুল, পড়ার ফোল্ডিং টেবিল, ছবি আঁকার রং তুলি, খাতা, তার ব্যবহারের জিনিসপত্র সবকিছু তার রুমে সাজানো-গোছানো রয়েছে। যেন মেয়েটি কোথাও না কোথাও আছে। যেকোনো মুহূর্তে এসে রুমে ঢুকবে।

নবারুনা ফিরে আসবে, সেজন্য আমরা তার সবকিছু জায়গা-মতো রেখে দিয়েছি। তার বয়স এখন ১৮। এখন তাকে দেখতে কেমন হয়েছে-আমি অবাক হয়ে সেটাই ভাবি”-ছয়বছর আগে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এক সন্তানের পিতার এ এক অসহায় অপেক্ষা।