খালেদা-তারেক ছাড়াই বিএনপি?

বিএনপির সংশোধিত গঠনতন্ত্র গ্রহণ না করতে গতকাল বুধবার ইসিকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ আদেশের ফলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আপাতত দলটির নেতৃত্বে থাকতে পারবেন না। কারণ আগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দুর্নীতির মামলায় দ-িত কেউ বিএনপির নেতা হতে পারবে না। একই সঙ্গে বিএনপি থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য হবেন।
এর আগে গত ৩০ অক্টোবর মঙ্গলবার নিজেকে বিএনপির কর্মী দাবি করে কাফরুলের বাইশটেকের বাসিন্দা শাহ আলমের ছেলে মোজাম্মেল হোসেন নামে এক ব্যক্তি ‘বিএনপির সংশোধিত গঠনতন্ত্র অনুমোদন না করার’ জন্য ইসিতে আবেদন জমা দেন। এ ছাড়া একই দিন তিনি হাইকোর্টে একটি রিট করেন। গতকাল রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর হাইকোর্ট বেঞ্চ মোজাম্মেল হোসেনের আবেদনটি এক মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে ইসিকে নির্দেশ দেন। এই সময়ের মধ্যে বিএনপির সংশোধিত গঠনতন্ত্র গ্রহণ না করতেও ইসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় দুর্নীতির অভিযোগে দণ্ডিত ব্যক্তিকে পদে থাকার ধারা বাদ দেওয়ায় তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে আদালত রুল জারি করেছেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বিএনপির মহাসচিবসহ পাঁচ বিবাদীকে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য অ্যাডভোকেট মোমতাজ উদ্দিন আহমেদ মেহেদী। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আল আমিন সরকার ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল কেএম মাসুদ রুমী। পরে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল কেএম মাসুদ রুমী বলেন, ‘মোজাম্মেল হোসেন বিএনপি কর্মী, সে গতকাল ইসিতে একটি আবেদন দিয়ে বলেছে বিএনপির সংশোধিত গঠনতন্ত্র গ্রহণ না করতে। তিনি বলেন, গঠনতন্ত্র গ্রহণ করা হলে বিএনপিতে দুর্নীতিবাজ, অযোগ্য ব্যক্তিরা নেতা হওয়ার সুযোগ পাবেন। এ ছাড়া সংশোধনীটি সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আদালত তার বক্তব্যে সন্তুষ্ট হয়ে রুল ও অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিয়েছেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, প্রায় ৯ মাস আগে সংশোধিত গঠনতন্ত্র ইসিতে দাখিল করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন অনেক আগেই সেটি গ্রহণ করেছে। এখন যে রিট করা হয়েছে তার রিট দায়েরের কোনো এখতিয়ার (লোকাস স্ট্যান্ডি) নেই। আমরা রিটে সংক্ষুব্ধ পার্টি, কিন্তু রিট আবেদনের কোনো কপি আমাদের দাখিল করা হয়নি। এ ছাড়া সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রিট গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ একটি রাজনৈতিক দল সরকারের কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থা নয়। তাই এ বিষয়ে রিট চলে না। আমরা রিটের কপি পেলে আইনগত পদক্ষেপ নেব।
রিট আবেদনে উল্লেখ করা হয় বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় গত ৮ ফেব্রুয়ারি দ-প্রাপ্ত হন। ওই রায় ও আদেশের বিরুদ্ধে দণ্ডপ্রাপ্ত খালেদা জিয়া হাইকোর্টে আপিল করেন, যেটি আংশিক শ্রুত অবস্থায় রয়েছে। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও দুর্নীতির মামলায় ১০ বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন। এ ছাড়া একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় যাবজ্জীবন দ-প্রাপ্ত হয়েছেন। পলাতক থাকায় ওইসব দণ্ডের বিরুদ্ধে এখনো কোনো আপিল করেননি। সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদে সংসদ নির্বাচনের যোগ্যতা-অযোগ্যতার বিষয়ে বলা আছে। ওই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এটি পরিষ্কার যে, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। দুর্নীতির মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বিএনপির পদে থাকার অযোগ্যতার বিষয়ে দলটির গঠনতন্ত্রের সাত ধারায় উল্লেখ রয়েছে।
ওই সাত ধারায় কমিটির সদস্য পদের অযোগ্যতার বিষয়ে বলা হয়েছে ‘নিম্নোক্ত ব্যক্তিগণ জাতীয় কাউন্সিল, জাতীয় নির্বাহী কমিটি, জাতীয় স্থায়ী কমিটি বা যে কোনো পর্যায়ের যে কোনো নির্বাহী কমিটির সদস্য পদের কিংবা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী পদের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।’ তাঁরা হলেন (ক) ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশ নম্বর ৮-এর বলে দণ্ডিত ব্যক্তি। (খ) দেউলিয়া, (গ) উন্মাদ বলে প্রমাণিত ব্যক্তি, (ঘ) সমাজে দুর্নীতিপরায়ণ বা কুখ্যাত বলে পরিচিত ব্যক্তি; কিন্তু ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ জাতীয় কাউন্সিলে এই ৭ ধারা বাদ দিয়ে নতুনভাবে ৭ ধারা প্রতিস্থাপন করা হয়। সংশোধিত নতুন এই ধারায় বলা হয়েছে ‘প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে দলের একজন চেয়ারম্যান থাকবেন। ৩০ বছরের কম বয়স্ক কোনো ব্যক্তি দলের চেয়ারম্যান হতে পারবেন না।’ রিটে এই সংশোধনীকে অসৎ উদ্দেশ্য থেকে করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
এদিকে ইসিতে মোজাম্মেল হোসেনের দায়ের করা আবেদনে বলা হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নীতি ও আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমি বিএনপিতে যোগদান করি। বিএনপির গঠনতন্ত্রের ৭ ধারায় সমাজের দুর্নীতিপরায়ণ ও কুখ্যাত বলে পরিচিত কোনো ব্যক্তি বিএনপির জাতীয় কেন্দ্রীয়, নির্বাহী, স্থায়ী কমিটি বা যে কোনো পর্যায়ের কমিটিতে বা কমিটির সদস্য পদে কিংবা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী বলে বিবেচিত হবে না মর্মে উল্লেখ ছিল। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় বিএনপির গঠনতন্ত্রের ৭ ধারা সংশোধিত আকারে উপস্থাপন করে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হয়। এ পরিবর্তনে জাতীয়তাবাদী আদর্শে উজ্জীবিত কর্মী হিসেবে আমি বিস্মিত ও হতবাক। এই পরিবর্তন গ্রহণ না করার অনুরোধ করছি।
হাইকোর্টের আদেশের পর এ বিষয়ে ইসির পদক্ষেপ জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, সংক্ষিপ্ত আদেশ দিয়ে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। আগে পূর্ণাঙ্গ আদেশ হাতে আসুক তখন এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করা যাবে। ইসির অতিরিক্ত সচিব মোখলেছুর রহমান বলেছেন, সংগঠনের গঠনতন্ত্র নিয়ে আরপিওতে কিছু বলা নেই। সেখানে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা-অযোগ্যতা নিয়ে বলা আছে। রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বিধিমালার ৯ ধারার (ক)-তে বলা হয়েছে দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নতুন কমিটির নির্বাচিত সদস্যদের তালিকা এবং সংশ্লিষ্ট দলের এতদসংক্রান্ত সভার কার্যবিবরণীর অনুলিপি কমিশনে দাখিল করতে হবে। একই ধারার (গ)-তে বলা হয়েছে কমিশন, সময়, যে সকল বিষয়ের ওপর মন্তব্য বা ব্যাখা চাহিবে উহা পরিপালন।
গত ২৮ জানুয়ারি বিএনপির সংশোধিত গঠনতন্ত্র নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয় ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির কাউন্সিলে এসব সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। আট পৃষ্ঠার ওই সংশোধনী প্রস্তাবের বিষয়ে দলীয় চেয়ারপারসন ও কাউন্সিল অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে খালেদা জিয়া ইসিতে পাঠানো চিঠিতে লিখেছেন উপরোক্ত সংশোধনীগুলো কাউন্সিলের অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হলে কাউন্সিল সর্বসম্মতিক্রমে তা অনুমোদন করে। একই সঙ্গে কাউন্সিলের গৃহীত সংশোধনী অনুযায়ী অনুচ্ছেদ ও উপ-অনুচ্ছেদগুলোর ক্রমিকের অনিবার্য পরিবর্তন, ভাষা ও ছাপার ভুলগুলো সংশোধন করার প্রস্তাবও কাউন্সিলে অনুমোদন দেওয়া হয়।
ইসি কর্মকর্তা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো ইসির স্টেকহোল্ডার। দল হিসেবে কেউ গঠনতন্ত্র সংশোধন, সংযোজন কিংবা বিয়োজন করলে তা ইসিকে জানাবেন; তার আলোকে কমিশন ব্যবস্থা নেবে। তবে গঠনতন্ত্রে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিংবা রাষ্ট্রের বিরোধী কোনো ধারা সংযোজন করলে সেখানে আপত্তি জানাতে পারে ইসি। এর বাইরে সাংবিধানিক সংস্থা ইসির করণীয় কী, আদালতের নির্দেশনা পাওয়ার পর তা নিয়েও ব্যস্ত সময় পার করেন ইসির আইন শাখা। ইসি কর্মকর্তারা জানান, আদালতের আদেশের পর এ সংক্রান্ত আবেদনের ফাইল কমিশন থেকে চাওয়া হয়েছে। খুব দ্রুত এ নিয়ে পর্যালোচনায় বসবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বুধবার সন্ধ্যায় বলেন, ‘দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয়, জনসমর্থিত ও গণমানুষের একটি দল বিএনপি। মানুষের ইচ্ছা ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খালেদা জিয়া চেয়ারপারসন হয়েছেন, তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হয়েছেন। এখানে কারও নাক গলানোর অধিকার আছে বলে আমরা মনে করি না। কে কী বলল, তাতে আমাদের কিছু আসে-যায় না।’