সেই ‘পঞ্চ পান্ডবের’ রথেই পিস্ট ওয়েস্ট ইন্ডিজ

তাদের কত নাম! অনেকেই ডাকেন ‘পঞ্চ পান্ডব’। কেউ কেউ বলেন, ‘ফ্যান্টাস্টিক ফাইভ’। আবার কেউবা সহজ-সরল ভাষায় উচ্চারণ করেন, পাঁচ সিনিয়র।

যে নামেই ডাকা হোক না কেন, এটা ধ্রুব তারার মত সত্য যে, এ মুহূর্তে একদিনের সীমিত ম্যাচে মাশরাফি, তামিম, সাকিব, মুশফি ও মাহমুদউল্লাহ- এই পাঁচজনই বাংলাদেশের চালিকাশক্তি। প্রাণশক্তি বা ‘নিউক্লিয়াস’।

দিনক্ষণ হিসেব কষে বের করা কঠিন। তবে মাশরাফি ছাড়া বাকি চারজন গড়-পড়তা ১০ থেকে ১২ বছর ধরে জাতীয় দলে খেলছেন। মাশরাফির প্রায় দেড়যুগ হয়ে গেছে। এছাড়া সাকিব-মুশফিক ২০০৬ আর মাহমুদউল্লাহ ও তামিম ২০০৭ থেকে জাতীয় দলে খেলছেন। সবারই অন্তত এক দশক কিংবা এক যুগের মত খেলা হয়ে গেছে জাতীয় দলের হয়ে।

শুধু খেলছেন বললে কম বলা হবে। দারুন সার্ভিস দিচ্ছেন বলাই যুক্তিযুক্ত এবং সেটাও ধারাবাহিকভাবে ও নিয়মিত। আগের কথা নাইবা বলা হলো। সেই ২০০৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ থেকে মাশরাফি, তামিম, সাকিব ও মুশফিক ম্যাচ জেতানো নৈপুণ্য দেখিয়ে আসছেন। এই ১০-১১ বছর জাতীয় দল যত ওয়ানডে জিতেছে তার বেশিরভাগ জয়ের রূপকার এই শীর্ষ ও সিনিয়র তারকারা।

এবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজেও টাইগারদের জয়ের স্থপতি এই পাঁচ সিনিয়র ক্রিকেটার। তরুণরা মাঝে-মধ্যে জ্বলে উঠলেও দপ করে নিভে যাচ্ছেন। এবার ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে টেস্ট সিরিজে সিনিয়ররা কেউই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেননি। তাই প্রথম টেস্টে ইনিংস ও ২১৯ রান এবং শেষ ম্যাচে ১৩৮ রানের বড় হার হলো সঙ্গী।

এরপর ওয়ানডে সিরিজের শুরুতে তামিম, সাকিব, মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ ব্যাট হাতে জ্বলে ওঠায় ব্যাটিং ডিপার্টমেন্টের দৈন্যদশা কেটে গেছে। অধিনায়ক মাশরাফির বোলিং ক্যারিশমায় পেস বোলিং ডিপার্টমেন্টের জীর্ণ চেহারাও পাল্টে গেছে। প্রথম ওয়ানডে শেষে ৪৮ রানের জয়ের প্রায় ৯৫ ভাগ কৃতিত্ব ও অবদান ‘পঞ্চ পান্ডবের।’

দ্বিতীয় ম্যাচ ৩ রানের ব্যবধানে হারলেও তামিম, সাকিব, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহ ও মাশরাফি ঠিকই পারফর্ম করেছেন। আর শনিবার শেষ ম্যাচে ১৮ রানের জয়ের স্থপতিও ওই পাঁচ সিনিয়র।

আসুন এক পলক দেখে নেই এবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে ‘ফ্যান্টস্টিক ফাইভের’ টোটাল পারফরমেন্স। তিন ম্যাচের প্রথমটিতে বাংলাদেশ জিতেছে ৪৮ রানে।

খুব সংক্ষেপে সে ম্যাচের চালচিত্র। টস জিতে আগে ব্যাট করা বাংলাদেশ করেছে ২৭৯ রান। যার প্রায় ৯০ শতাংশ স্কোর মানে, ২৫৭ রানই এসেছে তিন সিনিয়র তামিম (১৩০*), সাকিব (৯৭) আর মুশফিকের (৩০) ব্যাট থেকে। মাত্র একটি বল খেলার সুযোগ পাওয়া ‘পঞ্চ পান্ডবের’ আরেক সদস্য মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ শেষ বল খেলে একটি বাউন্ডারি হাঁকিয়েছেন। তার সংগ্রহ ৪। অধিনায়ক মাশরাফি ব্যাটিং পাননি। তিনি ছাড়া বাকি চার সিনিয়র মিলে করেন ২৬১। ২৭৯’র ২৬১’ই চার সিনিয়রের। বাকি ১৮’র মধ্যে ১৫ রানই (লেগবাই ৭, ওয়াইড ৮) অতিরিক্ত। দুই তরুণ ব্যাটসম্যান ওপেনার এনামুল হক বিজয় (০) আর সাব্বির রহমান রুম্মন (৩) দুজনে মিলে করেছেন মাত্র ৩ রান।

এবার দেখা যাক দ্বিতীয় ম্যাচে সিনিয়রদের ব্যাটিংয়ের অবস্থা। ওই ম্যাচে ক্যারিবীয়দের করা ২৭১ রানের পিছু ধেয়ে জয়ের একদম হাত মেলানো দূরত্বে গিয়ে ৩ রানে হার মানে মাশরাফি বাহিনী। দ্বিতীয় ম্যাচেও বাংলাদেশের সংগ্রহের বড় অংশ আসে চার সিনিয়র উইলোবাজ তামিম (৫৪), সাকিব (৫৬), মুশফিক (৬৮) ও মাহমুদউল্লাহর (৩৯) ব্যাট থেকে। এর সাথে অধিনায়ক মাশরাফি ১ রান যোগ করলে দ্বিতীয় ম্যাচে পঞ্চ পান্ডবের সংগ্রহ দাঁড়ায় ২১৮। আর তিন তরুণ বিজয় ২৩, সাব্বির ১২ ও মোসাদ্দেক ৩- তিনজন মিলে করেছেন মোটে ৩৮ রান। অতিরিক্ত ছিল ১২।

শনিবার শেষ ম্যাচে বড়দের পারফরমেন্স আরও নজরকাড়া। তারাই আসলে খেলেছেন। দলও জিতিয়েছেন। এই ম্যাচে বাংলাদেশের ৩০১ রানের ২৫৫ রানই এসেছে পাঁচ সিনিয়র তামিম (১০৩), সাকিব (৩৭), মুশফিক (১২), মাশরাফি (৩৬) ও মাহমুদউল্লাহর (৬৭) ব্যাট থেকে। আর সেখানে তিন তরুণ এনামুল বিজয় (১০), সাব্বির (১২) ও মোসাদ্দেক (১১*) মিলে করেছেন ৩৩ রান মাত্র। অতিরিক্ত থেকে আসে ১৩ রান।

তিন ম্যাচে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের ব্যাট থেকে এসেছে দুটি সেঞ্চুরি। দুটিই করেছেন তামিম (প্রথম ম্যাচে ১৬০ বলে ১৩০* এবং শেষ ম্যাচে ১২৪ বলে ১০৩)। এর বাইরে হাফ সেঞ্চুরি হয়েছে পাঁচটি। দুটি করেছেন সাকিব (৯৭ ও ৫৬)। দুই শতরানের পাশে তামিম (দ্বিতীয় ম্যাচে ৫৪) হাফ সেঞ্চুরিও হাঁকিয়েছেন। এছাড়া মুশফিকুর রহীম (দ্বিতীয় ম্যাচে ৬৮) ও মাহমুদউল্লাহও (শেষ ম্যাচে ৬৭*) একবার করে পঞ্চাশে পা রাখেন।

সেখানে তিন তরুণ এনামুল বিজয়, সাব্বির রহমান রুম্মন আর মোসাদ্দেকের কারো ব্যাট থেকে পঞ্চাশ দুরের কথা ৩০ রানের ইনিংসও বেরিয়ে আসেনি। বিজয় তিন ম্যাচে (০+২৩+১০) = ৩৩। সাব্বির প্রথম ম্যাচে ব্যাট পাননি। দুই ম্যাচে করেছেন (১২+১১) = ২৩ রান। আর দুই ইনিংস খেলা মোসাদ্দেকের সংগ্রহ (৩+১১) = ১৪। মানে এই তিন তরুণ তিন ম্যাচ মিলে করেছেন মোটে ৬০ রান।

সেখানে পাঁচ সিনিয়র তামিম (১৩০+৫৪+১০৩ = ২৮৭), সাকিব (৯৭+৫৬+৩৭ = ১৯০), মুশফিক (৩০+৬৮+১২ = ১১০) ও মাহমুদউল্লাহ (৪+৩৯+৬৭ = ১১০) এবং অধিনায়ক মাশরাফিও (১*+৩৬ = ৩৭) মিলে করেছেন ৭৩৪ রান। ভাবা যায়! সিনিয়রদের সাথে তরুণদের রান তোলার অনুপাত ১২ : ১।

এতো গেল ব্যাটিংয়ের চিত্র। আসুন দেখা যাক বোলিংয়ের অবস্থা। বাংলাদেশের বোলাররা তিন ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের যে ২৫ উইকেটের পতন ঘটিয়েছেন তার ৯টি পকেটে পুরেছেন পঞ্চ পান্ডবের দুই শীর্ষ তারকা মাশরাফি (৭) আর সাকিব (২)।

তবে তুলনামূলকভাবে তরুণ বোলাররা ভাল করেছেন। তিন তরুণ মোস্তাফিজ (৫), মিরাজ (৩) ও রুবেল (৫) মিলে পেয়েছেন ১৩ উইকেট। আর কোন বোলার একটি উইকেটও পাননি। বাকি তিনটি ছিল রান আউট। প্রতি ম্যাচে একজন করে ক্যারিবীয় ব্যাটসম্যান রান আউট হয়েছেন। এই হলো সংক্ষেপে ‘পঞ্চ পান্ডবের’ পারফরমেন্স। তরুনদের পারফরমেন্স যার ধারে কাছেও নেই। পঞ্চ পান্ডবের এই পারফরম্যান্সের কাছেই মূলতঃ পিষ্ট হয়েছে স্বাগতিক ওয়েস্ট ইন্ডিজ।