বিএনপির যেসব নেতা বিদেশে

বিএনপির বেশকিছু নেতা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে থাকা এসব নেতার বেশির ভাগেরই বিরুদ্ধে রয়েছে রাষ্ট্রদ্রোহ, হত্যা ও দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগে এক বা একাধিক মামলা। আইনি ঝামেলা এড়াতেই মূলত দেশান্তরী হয়েছেন তারা। তবে এ নিয়ে দলের অন্য নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছে চাপা ক্ষোভ। দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া যেখানে কারাভোগ করছেন, সেখানে বিদেশে পাড়ি জমানো এসব নেতাকে নিয়ে বাকিদের মধ্যে কাজ করছে একধরনের অসন্তুষ্টি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির নেতাদের মধ্যে দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান করছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ, ভাইস চেয়ারম্যান কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন (কায়কোবাদ), সাদেক হোসেন খোকা ও ড. ওসমান ফারুক। এ তালিকায় আরও আছেন আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আ ন ম এহসানুল হক মিলন, ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন আহমেদ অসীম ও মাহিদুর রহমান। এ ছাড়া ক্ষুদ্র ঋণ বিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সভাপতি এম এ কাইয়ুম, সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, আনোয়ার হাসেন খোকন, মহিদুর রহমান ও নির্বাহী কমিটির সদস্য মোশাররফ হোসেনও রয়েছেন দেশের বাইরে।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ১/১১ সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকার সময় অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর তিনি ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। তখন থেকে দেশটিতে তিনি পরিবারসহ রাজনৈতিক আশ্রয়ে অবস্থান করছেন। তার বিরুদ্ধে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলাসহ ২১টি মামলা চলমান।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ ভারতে অবস্থান করছেন। ২০১৫ সালের ১১ মে ভারতে অনুপ্রবেশের অভিযোগে সে দেশে গ্রেফতার হয়েছিলেন তিনি। তার বিরুদ্ধে দেশে ১৪টি মামলা চলমান বলে জানা গেছে। তার স্ত্রী হাসিনা আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ভারতে সালাহউদ্দিনের অবস্থার কোনও পরিবর্তন নেই। তিনি নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং ওষুধ সেবন করছেন।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন (কায়কোবাদ) দুবাইয়ে অবস্থান করছেন বলে একটি সূত্রে জানা গেছে। তার বিরুদ্ধে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। আরেক ভাইস চেয়ারম্যান ও ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা ২০১৪ সালের ২৪ মে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন। ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য দেশটিতে যাওয়ার পর তিনি আর দেশে ফেরেননি। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে বলেও জানা গেছে।

বিএনপির আরেক ভাইস চেয়ারম্যান ড. ওসমান ফারুক যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। ২০১৭ সালে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ উঠলে তিনি দেশ ছাড়েন। এছাড়াও তার নামে একাধিক মামলা রয়েছে।
বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আ ন ম এহসানুল হক মিলন মালয়েশিয়ায় রয়েছেন বলে জানা গেছে। ২০১৬ সালে দেশ ছাড়েন তিনি। মাঝে মধ্যে তাকে মালয়েশিয়ার বিএনপির কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে দেখা যায়। তার নামে ৩১টি মামলা রয়েছে বলে দলের দফতর সূত্রে জানা গেছে।

আরেক আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন আহমেদ অসীম ২০১৭ সাল থেকে লন্ডনে অবস্থান করছেন। তাকে লন্ডনের বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা যায়। তার বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা রয়েছে। আরেক আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মাহিদুর রহমান লন্ডনেই থাকেন বলে জানা গেছে। তিনি তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ বলেও সূত্রের দাবি।

বিএনপির ঋণ বিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সভাপতি এম এ কাইয়ুম মালয়েশিয়ায় আছেন বলে জানা গেছে। ২০১৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ইতালির নাগরিক তাভেল্লা সিজার হত্যাকাণ্ডে নির্দেশদাতা হিসেবে তার নাম উঠে আসে। এরপর আত্মগোপন করেন এই নেতা। এছাড়াও তার নামে একাধিক মামলা রয়েছে।

সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির ও আনোয়ার হাসেন খোকন দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনে আছেন বলে জানা গেছে। তারাও তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ বলে জানা গেছে। তবে এ দুই নেতার নামে কোনও মামলা আছে কিনা, তা জানা যায়নি।

বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মোশাররফ হোসেন মালয়েশিয়ায় আছেন। তিনি সেখানকার বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বলেও জানা গেছে। তার নামেও কোনও মামলা আছে কিনা, তা জানা যায়নি।

বিএনপির একটি সূত্র জানায়, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে লন্ডনে কিছুসংখ্যক নেতার একটি বলয় গড়ে উঠেছে। সে কারণে লন্ডনে অবস্থান করা এসব নেতার সঙ্গে দলের অন্য নেতাদের তেমন কোনও যোগাযোগ হয় না। তারা সব সময় তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন।

এ বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আহমেদ আজম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতিটি পদের গুরুত্ব আছে। এখন কেউ যদি পদ পেয়ে নিরাপদে বিদেশ অবস্থান করেন, তাহলে তাদের বিষয়ে দলের নীতিনির্ধারকরা চিন্তাভাবনা করবেন। এখানে আমার তো মন্তব্য করার কিছু নেই।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিদেশে থাকার বিষয়টি ভিন্ন। কারণ, দেশের এই পরিস্থিতিতে তার ফিরে আসা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তবে যেখানে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে রয়েছেন সেখানে কীভাবে অন্য নেতারা বিদেশে পালিয়ে থাকেন? দলীয় প্রধান যদি কারাগারে থাকতে পারেন তাহলে তারা কেন পারবেন না?’

তিনি বলেন, ‘বিদেশে পালিয়ে থাকা এসব নেতার বিষয়ে দলকে নতুন করে ভাবতে হবে বলে আমি মনে করি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একজন যুগ্ম মহাসচিব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত কয়েক বছরে কত বার জেলে যেতে হয়েছে তা নিজেও বলতে পারবো না! খালেদা জিয়ার কারাগারে যাওয়ার পর কর্মসূচি পালনকালে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকতে হয়েছে তিন মাসের মতো। আন্দোলন করতে গিয়ে ৪১টি মামলার আসামি হয়েছি। আর কিছু নেতা আছেন, পদ নিয়ে নিরাপদে বিদেশ বসে আছেন।’

তিনি বলেন, ‘দল যদি কোনোদিন ক্ষমতায় আসে তখন দেখা যাবে আমাদের চাইতে দলে তাদের কদর বেড়ে গেছে। এটাই হচ্ছে সুবিধাবাদীদের আসল রূপ। তারা দলের বিপদে কখনও পাশে থাকে না।’