রাজশাহী সিটি নির্বাচন

বাইরে উৎসব, ভেতরে ভয়

বাইরে উৎসব, ভেতরে ভয়

বাইরে উৎসব, ভেতরে ভয়

আচরণবিধি লঙ্ঘনের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে রাজশাহী, সিলেট ও বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা। পাল্টাপাল্টি অভিযোগ থাকলেও তিন সিটিতে উৎসবমুখর পরিবেশে প্রচার ছিল জমজমাট। কিন্তু উৎসবমুখর পরিবেশের আড়ালে এখন বিএনপিতে বিরাজ করছে ভয় ও শঙ্কা। খুলনা ও গাজীপুরের অভিজ্ঞতা এবং এই তিন সিটি নির্বাচনে এখন পর্যন্ত পুলিশের ভূমিকা বিএনপির এই শঙ্কা বাড়াচ্ছে।

অন্যদিকে মাঠে সরব উপস্থিতির পাশাপাশি পুলিশের ভূমিকায় বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনে করছে, তারা টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকায় অনেক উন্নয়ন হয়েছে। উন্নয়নের পক্ষে মানুষ নৌকায় ভোট দেবে।

রাত পোহালেই তিন বড় শহরে শুরু হবে ভোটযুদ্ধ। সবার নজর এখন এই তিন শহরের ভোটের দিকে। এই তিন সিটি নির্বাচনের তিন মাসের মাথায় শুরু হবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষণগণনা। তাই একই দিনে দেশের বড় তিন শহরের এই ভোটকে ঘিরে থাকছে বাড়তি নজর। কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশন (ইসি) দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রথম এক দিনে বড় তিনটি নির্বাচন করছে ইসি। এই নির্বাচন থেকে ইসির সক্ষমতার একটি ধারণা পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন নির্বাচনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

প্রচারের শেষ দিনে গতকাল শনিবার রাজশাহী ও সিলেট নগরী ছিল সরগরম। এই দুই সিটিতে প্রধান প্রধান প্রার্থী দিনভর প্রচার চালিয়েছেন। রাজশাহীতে সকাল থেকে বৃষ্টি কিছুটা বিড়ম্বনা তৈরি করলেও তা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। বৃষ্টি উপেক্ষা করে চলেছে প্রচার। সন্ধ্যায় প্রার্থীদের প্রচার আদতে রূপ নেয় ‘শোডাউনে’। সকাল থেকে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতের মেয়র প্রার্থী এবং কাউন্সিলর প্রার্থীদের প্রচারে সরগরম ছিল সিলেট নগরী। কার্যত পথসভা রূপ নেয় জনসভায়। তবে ভিন্ন চিত্র ছিল বরিশালে। দিনভর বরিশাল নগরী ছিল আওয়ামী লীগের দখলে। দুপুরে নগরের প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে নৌকার মিছিল হয়। পরে ফজলুল হক অ্যাভিনিউয়ে কয়েক হাজার নেতা-কর্মীর সমাবেশে বক্তৃতা করেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। অন্যদিকে দিনভর প্রচারে ছিল না বিএনপি। সন্ধ্যায় জেলা ও মহানগর কার্যালয় থেকে বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার ৭০-৮০ জন নেতা-কর্মী নিয়ে লিফলেট বিলি ও পথসভা করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।

এর আগে খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনেও প্রচার ছিল জমজমাট। ভোটের দিন সহিংসতা না হলেও পুলিশের গ্রেপ্তার এবং বাড়ি বাড়ি অভিযান চালিয়ে এক পক্ষকে মাঠছাড়া করা, পুলিশের ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকা, বিভিন্ন কেন্দ্রে বুথ দখল করে ব্যালটে সিল মারা, বিএনপির প্রার্থীর পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্রে ঢুকতে না দেওয়া, এজেন্টদের তুলে নেওয়াসহ বিভিন্ন অনিয়ম দেখা গেছে ওই দুই নির্বাচনে। বিপরীতে প্রচারে থাকলেও ভোটের দিন সেভাবে মাঠে দেখা যায়নি বিএনপিকে।

বিএনপি গতকাল অভিযোগ করেছে, খুলনা ও গাজীপুরের মতো এই তিন সিটি নির্বাচনেও ‘বিরোধী দলের ভোটার ও পোলিং এজেন্ট শূন্য’ করার নানা কৌশল নিচ্ছে সরকার।

বিএনপির স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, তিন শহরে তাঁদের কর্মী-সমর্থকদের গ্রেপ্তার, বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশি চালানো, পুরোনো মামলার সঙ্গে যোগ হওয়া নতুন মামলা তাঁদের ভাবাচ্ছে। তাঁরা মনে করছেন, এত দিন পর্যন্ত যে রকম পরিবেশ ছিল, তাতেও তাঁদের প্রার্থীর জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। কিন্তু ভোটের আগের দিন ও ভোটের দিন পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা কেমন হয়, সেটা নিয়ে তাঁরা বেশি শঙ্কিত।

ইসি সচিবালয়ের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ এ নিয়ে বলেন, ভোটের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। সহিংসতা ছাড়া উৎসবমুখর পরিবেশে প্রচার শেষ হয়েছে। আজ ভোটের ব্যালট পাঠানো হবে। বিএনপির অভিযোগের বিষয়ে সচিব বলেন, বিএনপি অভিযোগ করবেই। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকলে তারাও এ ধরনের অভিযোগ করত। পুলিশ আইনানুগভাবে দায়িত্ব পালন করছে। কেউ যদি আমলযোগ্য অপরাধ করে অথবা বহিরাগত কেউ যদি নির্বাচনী এলাকায় যায় অথবা যদি গোয়েন্দা তথ্য থাকে যে কেউ বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে, তাহলে পুলিশ তাঁদের আটক করবে।

১০ জুলাই থেকে প্রচার শুরু হয়েছিল তিন সিটিতে। সিলেটে শুরু থেকেই ছিল রাজনৈতিক সম্প্রীতি। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতের প্রার্থীসহ সবাই জমজমাট প্রচারে ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে পুলিশের ভূমিকায় বেকায়দায় পড়েছে বিএনপি। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে গতকাল পর্যন্ত সিলেট নগরের চার থানায় চারটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় বিএনপির ওয়ার্ড পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। বিএনপির আশঙ্কা, ভোটের আগমুহূর্তে নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হবে। অনেকে এটা নিয়ে ভয়ে আছেন। বিএনপির এখন মূল চ্যালেঞ্জ এই মামলার ঝুঁকি মোকাবিলা করে এজেন্টদের কেন্দ্রে নিয়ে যেতে পারা।

বিএনপির মেয়ার প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, পোলিং কর্মকর্তার তালিকায় কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। সরকার–সমর্থকদের এখানে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাঁরা আশঙ্কা করছেন, ভোট কারচুপিতে এসব কর্মকর্তাকে ব্যবহার করা হতে পারে।

বিএনপির এ ধরনের শঙ্কা থাকলেও সিলেটে বিএনপির রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী অনেকটা নির্ভার। সারা দেশে দীর্ঘদিন ধরে যেখানে জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশ করতে পারছেন না, নেতা-কর্মীদের বেশির ভাগ আত্মগোপনে, সেখানে সিলেটে দলটির প্রার্থীর প্রচার ছিল একেবারে নির্বিঘ্ন। এটা নিয়ে অনেকের মধ্যে প্রশ্নও তৈরি হয়েছে।

বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেছেন, বিএনপির নেতা-কর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে তল্লাশি ও হয়রানি করা হচ্ছে। গ্রেপ্তার-হয়রানি চলতে থাকলে আগামীকাল (আজ) আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বসে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত কঠোরও হতে পারে।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বরিশালে ইতিমধ্যে পুলিশ সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। রাজশাহীতে বিএনপির কার্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সিলেটে পরিবেশ যা একটু ভালো ছিল, সেখানেও বিএনপির নেতা-কর্মীদের নামে মামলা হচ্ছে। গতকালও একটি মামলা হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে বিএনপির নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। নির্বাচন একটি ঠাট্টা-তামাশার বিষয় হয়ে গেছে। সবাই জানে কী নির্বাচন হবে।

তবে আওয়ামী লীগের সূত্র জানায়, দলটি মনে করছে ভোটের মাঠে তাদের অবস্থান ভালো। বিএনপিও চাপে আছে। খুলনা ও গাজীপুরের মতো এই তিন সিটিতেও বিএনপি ভোটের দিন মাঠে থাকবে না। দলটি মনে করে, মানুষ উন্নয়নের পক্ষে নৌকায় ভোট দেবে। কারণ, এই সিটিগুলোতে এত দিন মেয়র ছিলেন বিএনপির। যে কারণে সেভাবে উন্নয়ন হয়নি। এবার রাজশাহী ও সিলেটে লিটন ও কামরানের অবস্থান ভালো। তাঁরা দুজন অভিজ্ঞ প্রার্থী। বরিশালে সাদিক আবদুল্লাহ প্রার্থী হিসেবে নতুন হলেও বরিশালের রাজনীতিতে তাঁদের পারিবারিক প্রভাব ব্যাপক। বিপরীতে বরিশালে বিএনপির মধ্যে কোন্দল আছে। এর বাড়তি সুবিধা আওয়ামী লীগ পাবে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান বলেন, তাঁরা আশা করছেন সুষ্ঠু, অবাধ ভোট হবে। জনগণ তিন সিটিতেই উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের পক্ষে, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদের বিপক্ষে নৌকায় ভোট দেবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএনপি যেসব অভিযোগ করছে, সেগুলো গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের অভ্যাস অভিযোগ করা। এখন জনগণের কাছে ভোট চাওয়ার জন্য তাদের কিছু বলার মতো নেই। এ কারণে তারা সহমর্মিতা পেতে এসব অভিযোগ করছে।

সামগ্রিক বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ সব সময় থাকবে। পুলিশের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ ছাড়া তিন সিটিতে এখন পর্যন্ত ভালো নির্বাচনের সব উপাদান আছে। বড় ধরনের কোনো সহিংসতা হয়নি, ভীতিকর কিছু হয়নি। ভোটের দিন কেন্দ্রে মানুষের উপস্থিতি কেমন হয়, কত শতাংশ ভোট পড়ে—তা দেখে হয়তো অনেক কিছু বোঝা যাবে। তিনি বলেন, উপমহাদেশের প্রায় সব দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের একধরনের প্রভাব সব সময় থাকে। এর মধ্যেই ইসিকে কাজ করতে হবে। নির্বাচন কর্মকর্তাদের বিষয়ে অভিযোগ থাকলে বিএনপির উচিত প্রমাণসহ লিখিতভাবে ইসিকে জানানো।

সূত্রঃ প্রথম আলো