সিনিয়রদের কাঁধে ভর করে আর কতদিন পার হবে বাংলাদেশ?

এবার ওয়েস্ট ইন্ডিজে গিয়ে টেস্টে খাদের কিনারায় টাইগাররা। খাদের কিনারায় বলাও বোধকরি কম হয়ে গেলো। বলা যায়, পারফরমেন্সের গ্রাফ নিচে নামতে নামতে একেবারে ক্যারিবীয়ান সাগরের তলদেশে গিয়ে ঠেকেছে। তবে বিস্ময়করভাবে সেই ভগ্নস্তুপ তথা সমুদ্রের তলানিতে থেকে একদিনের সিরিজে আবার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে টিম বাংলাদেশ।

সেটা অবশ্যই দলগত অর্জন, প্রাপ্তি ও সাফল্য। ইতিহাস-পরিসংখ্যানে লিখা থাকবে ২২ জুলাই গায়ানার প্রোভিডেন্স স্টেডিয়ামে স্বাগতিক উইন্ডিজকে ৪৮ রানে হারিয়ে আবারও জয়ের পথ খুঁজে পেয়েছে বাংলাদেশ; কিন্তু ভেতরের কাহিনী হলো, এই জয়ও এসেছে সিনিয়রদের কাঁধে ভর করে। এ সাফল্য ‘পঞ্চ পান্ডবের’ মধ্যে চার সিনিয়র- তামিম, সাকিব, মুশফিক ও মাশরাফির ডানায় উড়ে আসা।

খুব সংক্ষেপে ওই ম্যাচের চালচিত্র দেখে নেয়া যাক। টস জিতে আগে ব্যাট করা বাংলাদেশ করেছে ২৭৯ রান। যার প্রায় ৯০ শতাংশ স্কোর মানে ২৫৭ রানই এসেছে তিন সিনিয়র তামিম (১৩০*), সাকিব (৯৭ ) ও মুশফিকের (৩০) ব্যাট থেকে। মাত্র একটি বল খেলার সুযোগ পাওয়া ‘পঞ্চ পান্ডবের’ আরেক সদস্য মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ শেষ বল খেলে বাউন্ডারি হাঁকিয়েছেন। তার মানে ১ বলে তার সংগ্রহ ৪। সব মিলে ২৬১। বাকি ১৮ রান এসেছে অন্য খাত থেকে। যার মধ্যে ১৫ (লেগবাই ৭, ওয়াইড ৮) আবার অতিরিক্ত।

বাকি যে দুই ব্যাটসম্যান ব্যাট করার সুযোগ পেয়েছেন- সেই ওপেনার এনামুল হক বিজয় (০) আর মুশফিকুর রহীমের আগে চার নম্বরে প্রমোশন পাওয়া সাব্বির রহমান রুম্মন (৩)। এই দু’জনের সংগ্রহ মোটে ৩। ওপেনার এনামুল হক বিজয় দ্বিতীয় ওভারে শূন্য রানে ফেরত যাওয়ায় শুরুতেই বিপর্যয়। সে অনিশ্চিত যাত্রা ও ধাক্কা সামলে দেন দুই সিনিয়র তামিম ও সাকিব। দ্বিতীয় উইকেটে তাদের জুড়ে দেয়া ২০৭ রানের বিশাল জুটিতেই গড়ে ওঠে লড়াকু পুঁজির ভিত। শেষ দুই ওভারে ওঠে ৪৩ রান। এর মধ্যে ৩৪ রান করেন মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ।

‘পঞ্চ পান্ডব’ তথা পাঁচজন সিনিয়র ক্রিকেটারের সাফল্যের সাতকাহন শেষ হয়নি। আরও আছে। বোলিংয়েও ঘুরে-ফিরে সেই ‘বড়দের বড়’ মাশরাফি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ৩৭ রানে ৪ উইকেট শিকারী টাইগার অধিনায়ক।

তার মানে কি দাঁড়ালো? ‘পঞ্চ পান্ডব’ তথা সিনিয়ররাই ত্রাতা। ত্রানকর্তা। কেউ কেউ হয়তো ভাবছেন। এ আবার নতুন কি? মাশরাফি, তামিম, মুশফিক, সাকিব ও মাহমুদউল্লাহ যে টিম বাংলাদেশের ‘নিউক্লিয়াস’ বা চালিকাশক্তি- অনেক দিন আগে থেকেই। বছর হিসেব করলে ১০ পেরিয়ে গেছে। এ দীর্ঘ সময় বড়দের ডানায় উড়ছে বাংলাদেশ।

খুব বেশিদিন আগের কথা নাইবা বললাম। আসুন ২০১৫ সাল থেকে শুরু করি। গত চার বছরের (২২ জুলাই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে শেষ ওয়ানডেসহ) কথাই বলি। এ সময়ের পরিসংখ্যান মেলে ধরি। দেখবেন নামেই ‘টিম বাংলাদেশ’। আসলে এখানেও হাতে গোনা কজন ক্রিকেটার, বিশেষ করে পাঁচ সিনিয়র তারকার ওপরই নির্ভরশীল টিম বাংলাদেশ।

আসুন পরিসংখ্যানটা মিলিয়ে নিই। শেষ ৪৮ মাসে ৪৭টি ওয়ানডে ম্যাচ (তিনটি ম্যাচ বাতিল, পরিত্যক্ত কিংবা ফল নিষ্পত্তিহীন) খেলেছে টাইগাররা। জয়-পরাজয় বা ফল নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৪ ম্যাচে। যাতে মাশরাফি, তামিম, সাকিব, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহ ও মোস্তাফিজদের জয়ের পাল্লা ভারি। তারা জিতেছে ২৪টিতে। বছর অনুযায়ী হিসেব করলে বাংলাদেশ ২০১৫ সালে ১৮ ম্যাচে অংশ নিয়ে জিতেছে ১৩ টিতে। ২০১৬ সালে অবশ্য পরাজয়ের পাল্লা ভারি। ওই বছর টাইগারদের জয়ের সংখ্যা মাত্র ৩টি।

২০১৭ সালে মোট ম্যাচ ছিল ১৪টি; কিন্তু তিনটি প্রকৃতির বৈরি আচরণের কারণে পরিত্যক্ত, ফল নিষ্পত্তিহীন। ১১টির মধ্যে বাংলাদেশ ৪টিতে জিতেছে। আর এ বছর, মানে ২০১৮ সালে এখনও পর্যন্ত ছয় ম্যাচ খেলে মাশরাফির দল জিতেছে ৪টিতে।

এই জয় গুলোর ৮০ ভাগই এসেছে সিনিয়র তথা পঞ্চ পান্ডবের কার্যকর তথা ম্যাচ উইনিং পারফরমেন্সের ওপর ভর করেই। চার বছরে পাওয়া ২৪ জয়ের ২৩ টিতেই ম্যাচ সেরা পারফরমার বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। টাইগারদের ওই জয়গুলোর মধ্যে একজন মাত্র বিদেশি হয়েছেন ম্যাচ সেরা। তিনি কাইল কোয়েৎজার। স্কটল্যান্ডের ওপেনার। ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে (২০১৫ সালের ৫ মার্চ) স্কটিশদের বিপক্ষে টাইগাররা ৬ উইকেটে জিতলেও ১৫৬ রানের অনবদ্য ‘বিগ হান্ড্রেডের’ (১৩৪ বলে ১৫৬) ইনিংস খেলে ম্যাচ সেরা হন ওই স্কটিশ ওপেনার।

এ ছাড়া ২৩ ম্যাচেই বিজয়ী বাংলাদেশের কোন না কোন ক্রিকেটারের হাতেই উঠেছে ম্যাচ সেরার পুরস্কার। এর মধ্যে সর্বাধিক ছয়বার ম্যাচ সেরা তামিম ইকবাল। দ্বিতীয় সর্বাধিক চারবারের যৌথ ম্যাচ সেরা সাকিব আল হাসান এবং মুশফিকুর রহীম। তৃতীয় সর্বাধিক তিনবার ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার জেতার কৃতিত্ব দুজনের; বাঁহাতি পেসার মোস্তাফিজুর রহমান ও এ মুহূর্তে দলের বাইরে থাকা বাঁ-হাতি ওপেনার সৌম্য সরকারের।

এ ছাড়া অধিনায়ক মাশরাফি, মাহমুদউল্লাহ ও ইমরুল কায়েস একবার করে ম্যাচ সেরার পুরস্কার জেতেন। সংখ্যা তত্ত্বে ২৩বার ম্যান অব দ্য ম্যাচের ১৬টিই ‘পঞ্চ পান্ডব’ মানে তামিম, সাকিব, মুশফিক, মাশরাফি ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের। অতএব ম্যাচ জয়ের কারিগর, রূপকার যাই বলা হোক না কেন, এখানেও ঘুরে ফিরে সেই বড়দেরই প্রাধান্য।

একটা দলের ১৪-১৫ জন ক্রিকেটারের পাঁচ-ছয় জন প্রায় দীর্ঘ এক যুগ ধরে খেলছেন। তারা খুব স্বাভাবিকভাবেই দলের নিউক্লিয়াস হবেন। দল তাদের ওপরই নির্ভর করবে। তারাই ব্যাটিং ও বোলিংয়ের মূল চালিকাশক্তি থাকবেন। এটা অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। অনেক দলেরই এমন কিছু মূল পারফেরমার থাকেন। তারাই ঘুরে ফিরে ব্যবধান গড়ে দেন।

বাংলাদেশের ওয়ানডে স্কোয়াডের পাঁচ সিনিয়র মাশরাফি (১৮৬), সাকিব (১৮৬), মুশফিক (১৮৫), তামিম (১৮০) এবং মাহমুদউল্লাহ (১৫৪) মিলে খেলেছেন ৮৯১টি ম্যাচ। কাজেই তাদের অবদান বেশি থাকবে, তাদের ম্যাচ জেতানো ভূমিকাও বড় হবে- সেটাই স্বাভাবিক। পাশাপাশি তরুণ, উদীয়মান তথা নতুনদেরও বড়দের সঙ্গে কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে দলকে সার্ভিস দেয়ার কথা। দলের সাফল্যে নতুনদেরও কম বেশি অবদান থাকাও স্বাভাবিক।

কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য, বাংলাদেশের নতুনরা সে অর্থে ভীষণ অনুজ্জ্বল। গত চার বছরের ইতিহাস-পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যাবে, এই সময়ের মধ্যে অভিষেক হওয়া দুজন মাত্র তরুণ নিজেকে মেলে ধরেছেন। বড়দের পাশাপাশি নিজেদের ‘উইটিলিটি পারফরমার’ বা কার্যকর হিসেবে প্রমাণ দিয়েছেন। তারা হলেন, বাঁহাতি টপ অর্ডার সৌম্য সরকার এবং কাটার মাস্টার মোস্তাফিজুর রহমান।

সৌম্য ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে না পারলেও ক্যারিয়ারের শুরুর পরপরই পাকিস্তান ও দক্ষিণ আফ্রিকার মত প্রচন্ড শক্তিশালী দলের বিপক্ষে উত্তাল উইলোবাজিতে মাঠ মাতানোর পাশাপাশি জয়ের নায়ক বনে তিন তিনবার ম্যাচ সেরা হয়েছেন। আর বাঁ-হাতি কাটার মাস্টার মোস্তাফিজও নিজেকে ম্যাচ উইনিং বোলার হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

এছাড়া আর একজন নতুন পারফরমাররাও সে অর্থে আলো ছড়াতে পারেননি। এনামুল হক বিজয়, লিটন দাস, সাব্বির রহমান আর মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতরা হঠাৎ আলোর ঝলকানি দিলেও পরক্ষণে দপ করে নিভে যাচ্ছেন। সবচেয়ে বড়, পাঁচ সিনিয়র তারকার বাইরে আরেক সিনিয়র ব্যাটসম্যান ইমরুল কায়েক এবং সৌম্য ও মোস্তাফিজ ছাড়া অন্য কোন পারফরমার গত চার বছর একবারের জন্যও ওয়ানডেতে ম্যাচ সেরার পুরস্কার জিততে পারেননি।

এটা ভাবা যায়! এর মধ্যে ২০১৪ সালের ১ ডিসেম্বর ওয়ানডে অভিষেক হওয়া সৌম্য সরকার ২০১৫ সালে ঘরের মাঠে পাকিস্তান আর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে যে দ্যুতি দেখিয়েছিলেন, সেটাও দিনকে দিন ফিকে হয়ে এখন ‘সলতে’র আগায় মিটিমিটি করে জ্বলছে। মোস্তাফিজও গত বছর ১৯ মে, ডাবলিনে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে (৪/২৩) শেষ ম্যাচে সেরা হয়েছেন। এরপর আর ম্যাচ নির্ধারণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেননি।

তরুণদের জ্বলে উঠতে না পারা এবং দলে তাদের অবদান কম থাকার কারণেই সিনিয়র নির্ভরতা মোটেও কমেনি। বরং দিনকে দিন বাড়ছে। বাড়তে বাড়তে এমন এক জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে যে, বাংলাদেশ ওয়ানডে স্কোয়াড এখন পুরোপুরি ‘বড়দের’ ওপর নির্ভরশীল।

বড়রা ভাল খেললে সাফল্যর দেখা মেলে। আর বড়রা খারাপ খেললে ব্যর্থতা ও পরাজয় হয় সঙ্গী। এমন অবস্থাই চলছে। কিন্তু আর কতদিন? কতকাল আর মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ত্রাণকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন?