ইয়াবার গ্রাম ফুলের ডেইল

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জালাল আহাম্মদের দুই ছেলে আর দুই মেয়ের মধ্যে বড় ইয়াছিন আরাফাত। বাবার মুদি দোকানে বসে ব্যবসায় সহযোগিতা করতেন তিনি। আবার ট্যুরিস্ট গাইড হিসেবেও কাজ করতেন। কিন্তু এক বছরের মধ্যেই তিনি হয়ে যান লাখপতি। বাবার ঝুপড়ির স্থানে নির্মাণ করেন একতলা ভবন। এর সঙ্গে আবার জমিও কেনেন। বাবার ব্যবসা আর ট্যুরিস্ট গাইডের কাজের আড়ালে ইয়াসিন করতেন ইয়াবা ব্যবসা। আর এতেই তার আর্থিক অবস্থা ফুলে-ফেঁপে ওঠে।

ইয়াসিন একা এ ব্যবসা করতেন না। ছড়িয়ে দিয়েছিলেন টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের গ্রাম ফুলের ডেইলে আরও অনেকে মধ্যে। ফুলের ডেইল গ্রামটির অবস্থান নাফ নদীর তীরে। নদীর ওপারেই মিয়ানমার। সেখান থেকে ইয়াবার চালান গ্রামে আনতেন ইয়াছিন। এরপর বেছে নিতেন গ্রামের অসহায়, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের। কক্সবাজার থেকে ঢাকার পথে ইয়াবা বহনে তাদের জড়িয়ে ফেলেন তিনি। বিনিময়ে ওই শিক্ষার্থীদের ঢাকায় মেসভাড়া ও লেখাপড়ার খরচ দিতেন ইয়াছিন।

ব্যবসা করে আর্থিক সামর্থকেই বাড়িয়ে নেননি তিনি। নিজের ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য যোগ দিয়েছিলেন স্থানীয় রাজনীতিতে। এক সময় ইউনিয়ন যুবলীগের প্রচার সম্পাদকও হন। হ্নীলা ইউনিয়ন যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলীর হাত ধরে ইয়াবা ব্যবসায় জড়ান ইয়াসিন। একইভাবে রাজনীতির পাঠও তার হাতেই।

ফুলের ডেইল গ্রামে ইয়াছিনের বাড়ি। ছবি: প্রথম আলোফুলের ডেইল গ্রামে ইয়াছিনের বাড়ি। ছবি: প্রথম আলোইয়াসিনদের ফুলের ডেইল গ্রামেই রয়েছেন পুরোদস্তুর ১৫ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী। তাঁদের সবাই কক্সবাজার থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ইয়াবা পাচারের জন্য গ্রামের অসহায়, গরিব শিক্ষার্থীদের বেছে নিতেন। তাই ফুলের ডেইল গ্রামটিকে ঢেকে ফেলেছে ইয়াবার কালো ছায়া।

এ বছরের ৩ এপ্রিল কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশের তৈরি ইয়াবা ব্যবসায়ীর তালিকায় ১ হাজার ১৫১ জনের নাম আছে। এর মধ্যে টেকনাফ উপজেলায় তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী ৯১২ জন, গডফাদার ৫২ জন। এদের ২২৯ জনের বাড়ি হ্নীলা ইউনিয়নে। আর ৫২ গডফাদারের মধ্যে ১৫ ইয়াবা ব্যবসায়ীর আবাসস্থল ফুলের ডেইল গ্রামে। তালিকার মধ্যে হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের পাঁচজন সদস্যও রয়েছেন। তাঁরা হলেন ৩ নম্বর ওয়ার্ডের শামসুল আলম বাবুল, ৫ নম্বর ওয়ার্ডের জামাল উদ্দিন,৭ নম্বর ওয়ার্ডের জামাল হোসেন, ৮ নম্বর ওয়ার্ডের নুরুল হুদা ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মোহাম্মদ আলী।

যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী ইয়াসিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মোহাম্মদ আলীও তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী। তাঁর হাত ধরেই ইয়াবা ব্যবসায় আসেন ইয়াসিন। মোহাম্মদ আলীর ছোট ভাই মো. শরীফ সৌদি আরবে বসে ফুলের ডেইল গ্রামের ইয়ারা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে। এ ছাড়া গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী ফুলের ডেইল গ্রামের বাসিন্দা সাবেক সাংসদ ও টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আলীর দুই ছেলে মো. রাশেদ ও মাহবুব মোরশেদের নামও ১৬ জন ইয়াবা ব্যবসায়ীর তালিকায় রয়েছে। তবে মাদক ব্যবসায়ীর এই তালিকায় নেই ইয়াছিন আরাফাতের নাম। যদিও মাদকের দুটি মামলার আসামি তিনি। একটি টেকনাফ থানায়, অন্যটি ঢাকার তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায়।

ফুলের ডেইলে অনেকের মাঝে ইয়াবার ব্যবসা ছড়িয়ে দেন ইয়াসিন। ছবি: প্রথম আলোফুলের ডেইলে অনেকের মাঝে ইয়াবার ব্যবসা ছড়িয়ে দেন ইয়াসিন। ছবি: প্রথম আলো২০১৭ সালে টেকনাফ থানায় করা একটি মামলার পলাতক আসামি হলেও এলাকায় বসেই দিব্যি ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন ইয়াছিন। ফুলের ডেইল গ্রামে না এসে কক্সবাজার শহরে বসেই ইয়াবার চালান রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাতেন। তবে ঢাকায় এ বছর মে মাসে দুটি ইয়াবার চালান নিজেই নিয়ে যান ইয়াছিন। দ্বিতীয় চালান নিয়ে যাওয়ার পরই এ বছরের ১৬ মে ইয়াছিনের বিরুদ্ধে মামলা হয় রাজধানীর শিল্পাঞ্চল থানায়। এই মামলার আসামি হিসেবে ফুলের ডেইল গ্রাম থেকে ১৫ জুলাই ইয়াছিন আরাফাতকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গ্রেপ্তারের পর ঢাকায় আনা হয় তাঁকে। ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে গত ১৬ জুলাই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন ইয়াছিন।

ওই জবানবন্দি থেকে জানা যায়, ২০০৫ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু পাস করতে পারেননি। পরের বছর প্রতিবেশী ইদ্রিস ও আনোয়ারের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসেন ইয়াছিন। খিলগাঁওয়ে থাকতেন তাঁদের সঙ্গে। পাঁচ হাজার টাকা বেতনে ইদ্রিস ও আনোয়ারদের হুন্ডি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। চার বছর চাকরি করে ২০০৯ সালে ফিরে যান ফুলের ডেইল গ্রামে। সেখানে বাবা জালাল আহাম্মদের মুদি দোকানে বসতেন ইয়াছিন। একই সঙ্গে ট্যুরিস্ট গাইডের কাজও করতেন তিনি। একসময় তাঁর পরিচয় হয় পাশের লেদা গ্রামের বন্ধু মোহাম্মদ আলীর ছোট ভাই মো. শরীফের সঙ্গে। এক বছর আগে ২০১৭ সালে শরীফ সৌদি আরবে চলে যান। সেখান থেকে শরীফ ফোনে ইয়াছিনকে জানিয়ে দেন, ইয়াবার চালান ঢাকার কোথায়, কার কাছে সরবরাহ করতে হবে। এক লাখ ইয়াবার জন্য ইয়াছিন পেতেন এক লাখ টাকা। গত ১৬ মে দুই সহযোগী তেজগাঁও এলাকার নাবিস্কো মোড়ে বিএএফ শাহীন কলেজের ছাত্র মামুন ও ইকবাল হোসেনকে নিয়ে ইয়াবার চালান নিয়ে আসেন ইয়াছিন। এ সময় র‍্যাবের হাতে ধরা পড়েন মামুন। কিন্তু পালিয়ে যান ইয়াছিন ও ইকবাল। মামুনকে জিজ্ঞাসাবাদেই ইয়াছিন আরাফাতের নাম জানাতে পারে র‍্যাব। পরে মামুন, ইয়াছিন ও ইকবালের নামে তেজগাঁও থানায় মামলা হয়।মামলাটির তদন্ত করছে পিবিআই।

তবে ইয়াছিনকে গ্রেপ্তার করতেও বেগ পেতে হয়েছে পিবিআইয়ের দলটির। তাদের ১৫ জন সদস্য গত ১৫ জুলাই দুপুরে ফুলের ডেইল গ্রামে অভিযানে যান। ইয়াছিনের বাড়ি থেকে বেশ কয়েক মাইল দূরে একটি পিকআপ ভ্যান রাখেন তাঁরা। সঙ্গে থাকা আরেকটি মাইক্রোবাস নিয়ে ইয়াছিনের বাড়ির কাছে যান পিবিআই সদস্যরা। কিন্তু অপরিচিত গাড়ি দেখলেই পুলিশের গাড়ি মনে করে ফুলের ডেইলের গ্রামবাসী। মুঠোফোনে এই বার্তা মুহূর্তের মধ্যে পুরো গ্রামে ছড়িয়ে যায়। তবে সোর্সের তথ্যে বাড়ির সামনে একটি দোকান থেকে ইয়াছিনকে ধরে ফেলেন পিবিআইয়ের দল।

ইয়াসিনদের ফুলের ডেইল গ্রামে রয়েছেন পুরোদস্তুর ১৫ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী। ছবি: প্রথম আলোইয়াসিনদের ফুলের ডেইল গ্রামে রয়েছেন পুরোদস্তুর ১৫ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী। ছবি: প্রথম আলোপিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রোর পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘গ্রেপ্তার হওয়ার দিন ইয়াছিন আরাফাতের বাবা জালাল আহাম্মদ মারা যান। আমরা নিশ্চিত ছিলাম, বাবা মৃত্যুর কারণে তিনি গ্রামে আসবেন। তাই তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছি।’ তিনি বলেন, ‘ইয়াছিনের সঙ্গে অন্য যাঁরা ইয়াবা ব্যবসা করেন তাঁদের ধরার জন্যও আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি।’

টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আলী  বলেন, তালিকার বাইরেও ফুলের ডেইলের অনেকে ইয়াবা ব্যবসা করেন। ইয়াসিনও তালিকার বাইরের ব্যবসায়ী। এ সময় গোয়েন্দা পুলিশের তালিকায় তাঁর দুই ছেলে মো. রাশেদ ও মাহবুব মোরশেদের নাম থাকা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এটাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে মন্তব্য করেন তিনি। মোহাম্মদ আলী বলেন,‘ এটা সাংসদ আবদুর রহমান বদির ষড়যন্ত্র। আমি গণমাধ্যমে বদি ও তাঁর আত্মীয়দের ইয়াবা ব্যবসার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলাম। তাই তাঁরা আমাকে তাঁদের সমান করার জন্য প্রশাসনকে প্রভাবিত করে দুই ছেলের নাম তালিকায় যুক্ত করিয়েছেন। আমার ছেলেরা এই ব্যবসা করলে বাবা হিসেবে তো আমার জানার কথা।’

সূত্র-প্রথম আলো।