লাদেন পুত্রের হাত ধরে প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় আল কায়েদা

লাদেনের ছেলে হামজা

লাদেনের ছেলে হামজা

২৮ বছর বয়সী লাদেন পুত্রের কণ্ঠস্বর বেশ নরম হলেও তার বার্তা যেন ওসামা বিন লাদেনেরই প্রতিধ্বনি করছে। সম্প্রতি হামজা বিন লাদেন তার বার্তায় হত্যা করার জন্য অনুসারীদেরকে আদেশ প্রদান করেন।

দুই সপ্তাহ আগে জিহাদিস্ট ওয়েবসাইটগুলোতে যখন তার ওই অডিও রেকর্ডিং প্রচার করা হয়। এর মধ্য দিয়ে নিহত সন্ত্রাসী লাদেন তার প্রিয় পুত্রের মাধ্যমে যেন তার নিজেকে চালিত করছে।

অডিও বার্তায় হামজা বিন লাদেন বলেন, ‘কাফেরদের উপর হানা দিতে নিরলসভাবে নিজেদেরকে প্রস্তুত কর। আপনাদের আগে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করুন।’

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসী হামলার মাস্টারমাইন্ড বিন লাদেনের পুত্রের এই হুঁঙ্কার যেন তার তার বাবার কণ্ঠেরই প্রতিধ্বনি।

বিশ্বব্যাপী আল কায়েদা নেটওয়ার্কের ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে পরিচিত হামজা বিন লাদেনের এই রেকর্ডিং গত ১৩ মে প্রথম সম্প্রচার করা হয়। ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে সোমবারের আত্মঘাতী বোমা হামলার মাত্র দুই সপ্তাহ আগে এই রেকর্ডিং পোস্ট করা হয়েছে।

বিমান হামলায় সিরিয়ার শিশুদের হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে বার্তাটিতে ইউরোপীয় এবং উত্তর আমেরিকার নির্দিষ্ট কয়েকটি শহরে হামলার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় এবং মধ্য প্রাচ্যের গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই রেকর্ডিং প্রায় দুই দশক আগে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কর্তৃক পশ্চিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার আরো একটি টাটকা প্রমাণ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এবং বছরের পর বছর ধরে তার সন্ত্রাসী প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামিক স্টেট, আল-কায়েদার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ছাপিয়ে নতুন বিন লাদেনের নেতৃত্বে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটি তার সহিংসতার ইতিহাসের নতুন অধ্যায় শুরু করার সংকেত দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। তিনি ইতোমধ্যে তার বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেয়ারও অঙ্গীকার করেছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরাক ও সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের (আইএস) দ্বারা অনুপ্রাণিত আল-কায়েদা আইএসের প্রতি অসন্তুষ্ট অনুসারীদেরকে কাছে টানার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী সহানুভূতিশীল স্বেচ্ছাসেবকদের দলে ভেড়ানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

পরিবারের আইকনিক নাম দিয়ে তরুণ যোদ্ধাদের পদোন্নতি আল কায়েদার নতুন করে ব্র্যান্ডিং প্রচেষ্টার একটি মূল উপাদান বলে মনে করা হচ্ছে। এর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত রয়েছে ইসলামিক স্টেটের স্টাইলে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাজুড়ে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হামলা চালানো।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মধ্যপ্রাচ্যের একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, ‘আল-কায়েদা সময়ের সঠিক ব্যবহারের চেষ্টা করছে। কেননা আইএস অব্যাহত হামলার মুখে রয়েছে। এ কারণে তারা জিহাদীদেরকে একটি নতুন বিকল্পের অফার দিচ্ছে এবং এই প্রচেষ্টা বিন লাদেনের চেয়ে অধিক কার্যকর হতে পারে।’

জঙ্গি জগতে হামজা বিন লাদেনের পরিচিতি যদিও খুবই সামান্যই। ২০১৫ সালের দিকে সন্ত্রাসী যোদ্ধা হিসেবে হামজা বিন লাদের অভিষেক ঘটে। ওই সময় দীর্ঘদিন ধরে আল কায়েদার নের্তৃত্ব দেয়া আইমান আল-জাওয়াহিরি এক ভিডিও বার্তায় হামজাকে লাদেনের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের ‘গুহার সিংহ’ হিসাবে অভিহিত করেন।

কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তিনি আল-কায়েদার ওয়েবসাইটগুলোতে ‘উদীয়মান তারকা’ হিসেবে উন্নীত হয়েছেন। অডিও রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে তিনি অনুসারীদেরকে আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি কিংবা বর্তমান ঘটনাসমূহের উপর মন্তব্য করার জন্য আহ্বান জানান।

দীর্ঘ সময় ধরে সন্ত্রাসবিষয়ক বিশ্লেষকরা বলছেন যে তরুণ জঙ্গিদের মধ্য যারা এখনো ওসামা বিন লাদেনের ভক্ত তাদের কাছে হামজা বিন লাদেনের পদোন্নতির যথেষ্ট আবেদন রয়েছে। তারা এটিকে স্বাগত জানাবে এতে কোন সন্দেহ নেই।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএতে ৩০ বছর চাকরি করা ব্রুস রিডেল যিনি বর্তমানে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গোয়েন্দা প্রজেক্টের পরিচালক হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি বলেন, ‘বংশ ও ইতিহাসের কারণে জিহাদিদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে হামজা সবচেয়ে বেশি সহজাত দক্ষতা সম্পন্ন ও ক্ষমতাশালী ব্যক্তি। যেই সময় জাওয়াহিরি ও আল-বাগদাদী অনেকটা বিলীন হওয়ার পথে তখন হামজাকে আপাত তাদের উত্তরাধিকারী বলে মনে করা হচ্ছে।’

কিন্তু হামজা বিন লাদেন তার পিতার জিহাদী স্ট্যাইলকে সমর্থন করেন না বলেই মনে হচ্ছে। ওসামা বিন লাদেন তার উচ্চাভিলাষী ধ্যান-ধারণা এবং পরিকল্পিত সন্ত্রাসী অপারেশনের জন্য কুখ্যাত ছিলেন। এর বিপরীতে তার পুত্র ইহুদীদের স্বার্থ, আমেরিকান, ইউরোপীয় ও পশ্চিমাপন্থী মুসলমানদের উপর হামলা করার যে কোনো সুযোগকে জোরদার করার জন্য অনুসারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

১৩ মে’র রেকর্ডিংয়ে তিনি বলেন, ‘হামলা চালানোর জন্য সামরিক সরঞ্জাম হওয়া আবশ্যক নয়। আপনি যদি একটি আগ্নেয়াস্ত্র বেছে নিতে সক্ষম হন, তবে তা ভাল। যদি তা না হয়, বিকল্প অনেক রয়েছে।’

দ্যা ওয়াশিংটন পোস্ট অবলম্বনে