দিনমজুরের ছেলে হালিম যেভাবে নাঈম আশরাফ

দিনমজুরের ছেলে হালিম যেভাবে নাঈম আশরাফ

দিনমজুরের ছেলে হালিম যেভাবে নাঈম আশরাফ

বনানীতে দুই তরুণী ধর্ষণ মামলার দুই আসামি সাফাত আহমেদ ও সাদমান সাকিফকে বৃহস্পতিবার (১১ মে) রাতে সিলেট থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তবে এই মামলার দুই নম্বর আসামি নাঈম আশরাফ এখনও ধরা পড়েনি। এদিকে, নাঈমের গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জে সরেজমিনে গিয়ে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার প্রত্যন্ত গান্ধাইল গ্রামের দিনমজুর ও ফেরিওয়ালা আমজাদ হোসেনের একমাত্র ছেলে আব্দুল হালিম। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা পড়ার কারণে এলাকায় সে ‘ইঞ্জিনিয়ার হালিম’ নামেও পরিচিত সে। তবে ‘টাউট হালিম’ নামেও ডাকেন অনেকে। স্কুলে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে জুতাপেটা খাওয়ার রেকর্ড আছে তার। প্রতারণার ফাঁদে ফেলে ধনী পরিবারের এক মেয়েকে বিয়ে করেছিল সে। প্রতারণা ধরা পরায় সে বিয়ে টেকেনি। এই ‘টাউট হালিম’ই এলাকা ছাড়ার পর ঢাকায় এসে নাম পাল্টে হয়েছে নাঈম আশরাফ। বনানীতে দুই তরুণী ধর্ষণের ঘটনায় দায়ের করা মামলার দ্বিতীয় আসামি এই আব্দুল হালিম ওরফে নাঈম আশরাফ।

বনানীর ওই ধর্ষণের ঘটনায় মামলা দায়েরের পর প্রথম তিন আসামির ছবিও ছড়িয়ে পড়ে গণমাধ্যমে। সেই ছবি দেখেই নাঈম আশরাফকে গান্ধাইল গ্রামের আব্দুল হালিম হিসেবে শনাক্ত করেন গ্রামবাসী ও স্বজনরা। তাদের অনেকেই বলছেন, হালিম যে কবে নাঈম আশরাফ হয়েছেন তা তাদের জানা নেই।

বৃহস্পতিবার সরেজমিনে কাজিপুরের গান্ধাইল গ্রামে গিয়ে জানা যায়, নাঈম ওরফে হালিমের নানা ‘কীর্তি’র কথা। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুল আলম একাই নাঈমের বিরুদ্ধে তার নানা অপকর্মের কথা তুলে ধরেন বাংলা ট্রিবিউনের কাছে। তিনি বলেন, ‘গান্ধাইল আহম্মদ আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়তো আব্দুল হালিম। দশম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে সালিশ প্রধান শিক্ষকের জুতাপেটা খেয়েছিল সে। পরে এসএসসি পাস করে প্রথমে বগুড়া ও পরে ঢাকা থেকে ডিপ্লোমা পাস করে বলে শুনেছি। এরপর থেকে নাঈম ঢাকাতেই থাকে।’

নাঈম ওরফে হালিমের গ্রামের বাড়ির সামনের অংশনাম ও পরিচয় নিয়ে নাঈমের প্রতারণা প্রসঙ্গে ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘এক সময় জানতে পারি, আমার ছেলে নাঈমের নামকে ছদ্মনাম হিসেবে নিয়ে হালিম নিজের নাম রাখে নাঈম আশরাফ। ঢাকার কালশীর সাংবাদিক কলোনিতে বাড়ি ভাড়া করে সে থাকত। বিভিন্ন সূত্র থেকে আজকেই (বৃহস্পতিবার) শুনলাম, বাড়ি ভাড়ার চুক্তিতে বাবার নামের জায়গায় নাকি আমার নাম লেখা হয়েছে।’

নাঈমের অপকীর্তির কথা তুলে ধরে আশরাফুল আলম বলেন, ‘বগুড়া পলিটেকনিকে পড়ার সময় সে এক ধনী পরিবারের মেয়ের ফুঁসলিয়ে সিরাজগঞ্জে নিয়ে আসে। সিরাজগঞ্জ পৌরসভার বর্তমান মেয়র সৈয়দ আব্দুর রউফ মুক্তার বাড়ি শহরের দিয়ারধানগড়ায়। সুন্দর ওই বাড়িটিকে নিজের বাবার বাড়ি বলে ওই মেয়েকে প্রলুব্ধ করে বিয়ে করে নাঈম। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে বিচ্ছেদ ঘটে তাদের।’ ধনী পরিবারের মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের এমন আরও ঘটনা নাঈমের আছে বলে জানান তিনি।

হালিমের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তার চাচি শিখা খাতুনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘২০০৪ সালে স্থানীয় স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে হালিম। পরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য প্রথমে বগুড়া ও পরে ঢাকায় যায় সে। হালিম এলাকায় খুব একটা আসে না। তার বাবা-মা দু’জনেই ঢাকায় হালিমের বাসায় থাকেন। বরিশালের এক মেয়ের সঙ্গে বছর পাঁচেক আগে বিয়ে হয়েছিল হালিমের। তবে তাদের কোনও ছেলে-মেয়ে নেই।’

নাঈমের আরেক চাচি কোহিনুর বেগম বলেন, ‘কয়েক মাস আগে স্বামীকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় গিয়েছিলাম। হালিমের বাড়িতেই উঠেছিলাম। তবে ওর সম্পর্কে এত কিছু জানা নাই।’

প্রতিবেশী শাহজাহান আলীও জানান, গত দু’বছর থেকে হালিমের বাবা-মা ঢাকায় তার কাছেই থাকে।

নাঈম আশরাফস্থানীয় কলেজ শিক্ষার্থী রাশেদুজ্জামান বলেন, ‘মাঝেমধ্যে বিভিন্ন দিবসে সে গ্রামে আসত। শুনেছি, সে কাজিপুর থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি। বর্তমানে সে ঢাকায় ভালো বেতনে চাকরিও করে বলে জেনেছি।’

ছাত্রলীগের স্থানীয় কয়েকজন নেতাকর্মীর সঙ্গে নাঈমকে এলাকায় দেখা যেত বলে জানিয়েছেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুল আলমও। তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস বা জেল হত্যা দিবস বা উপজেলায় সরকারি দলের কোনও অনুষ্ঠানে হঠাৎ হঠাৎ নাঈমকে কাজিপুরে দেখা যায়। স্থানীয় কিছু নেতাকর্মীদের সঙ্গেও ঘোরাফেরা করে থাকে সে।’

সম্প্রতি গান্ধাইল ইউনিয়ন ও পাশের সীমান্ত বাজারসহ উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নাঈমের ছবি দিয়ে ছাপানো পোস্টার, বিলবোর্ডও দেখা গেছে। এসব পোস্টারে নাঈমের নাম লেখা আছে হাসান মোহাম্মদ হালিম। দাবি করা হয়েছে, হালিমকে বাংলাদেশ স্বেচ্ছাসেবক লীগ কাজিপুর উপজেলা শাখার সহ-সভাপতি করা হয়েছে। গান্ধাইল ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জুয়েল রানার সৌজন্যে পোস্টারটি ছাপানো হয়েছে।

বুধবার (১০ মে) সকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম কাজিপুরে এসে এসব বিলবোর্ড-পোস্টারের খবর জানতে পেরে তাৎক্ষণিকভাবে সেগুলো অপসারণের নির্দেশন দেন দলের নেতাকর্মীদের।

ছাত্রলীগ বা আওয়ামী লীগের সঙ্গে হালিম ওরফে নাঈমের কোনও সংশ্লিষ্টতা নেই বলে জানান কাজিপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খলিলুর রহমান নিয়াজী। তিনি বলেন, ‘আমরা হালিম নামের ওই প্রতারককে চিনি না।’ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘গত ৫/৬ মাস আগে এ ধরনের একটি পোস্টার দেখেছি। আমার সংগঠন বা কমিটির কোনও সদস্য সে নয়। সে যেহেতু অপরাধী, তার উপযুক্ত শাস্তি হওয়া উচিত। দলের নাম ভাঙানোর কারণে তাকে আমরাও হন্যে হয়ে খুঁজছি।’

কাজিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোমিত কুমার কুণ্ডু বলেন, ‘ঢাকা থেকে হালিমের বিষয়ে খবর পেয়ে গতরাতেই (বুধবার রাত) তার বাড়িতে অভিযান চালিয়েছি। কিন্তু তাকে পাওয়া যায়নি। তাকে ধরার জন্য আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন