আদালতের সঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেলের বাক-বিতণ্ডা

‘যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে আমৃত্যু কারাবাস’

‘যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে আমৃত্যু কারাবাস’

জাতীয় সংসদের হাতে উচ্চ আদালতের বিচারক অপসারণের ক্ষমতা নিয়ে করা সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের শুনানি দ্বিতীয় দিনের মতো চলছে।

এর আগে সোমবার রাষ্ট্রপক্ষের সময় আবেদন নাকচ করে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির আপিল বেঞ্চে এ শুনানি শুরু হয়।

মঙ্গলবার শুনানির শুরুতেই আদালতের সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়।

২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা পুনরায় সংসদের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী পাশ করা হয়। এ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ওই বছরের ৫ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের নয়জন আইনজীবী হাইকোর্টে রিট করেন।

এ আবেদনের চূড়ান্ত শুনানি শেষে তিন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকের মতামতের ভিত্তিতে গতবছর ৫ মে ১৬তম সংশোধনী অবৈধ বলে রায় দেন।

তিন বিচারকের মধ্যে দু’জন ১৬তম সংশোধনী অবৈধ অবৈধ ঘোষণা করেন এবং একজন রিট আবেদনটি খারিজ করেন। পরে এ রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ গত বছরের ২৮ নভেম্বর আপিল বিভাগে আপিল দায়ের করেন।

সোমবার আপিল শুনানির শুরুতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছিলেন, পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে এই মামলার শুনানির কথা রয়েছে। কিন্তু দু’জন বিচারপতি অনুপস্থিত। এছাড়া বিদেশ ভ্রমণের কারণে আমি নিজেও অসুস্থ বোধ করছি। গুরুত্বপূর্ণ এ ধরনের একটি মামলায় শুনানি প্রস্তুতির জন্য সময় দরকার।

এ পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ যে, মুলতবি ছাড়াই এ মামলার শুনানি চালিয়ে যাব। যার কারণে মামলার সকল পক্ষকে লিখিত যুক্তিতর্ক দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো। অ্যামিকাস কিউরি ও রিটকারীপক্ষ লিখিত যুক্তিতর্ক দাখিল করেছেন। আপনাদেরকেও দ্রুত লিখিত যুক্তিতর্ক দাখিল করতে হবে।

প্রধান বিচারপতি বলেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা। এই মামলায় আপিল বিভাগের সকল বিচারপতিই শুনানিতে অংশ নেবেন। ইতোমধ্যে আমরা হাইকোর্টের রায়ও পড়ে ফেলেছি। রায়ে কোনো বিতর্কিত বক্তব্য আছে কিনা সেটাও আমরা দেখবো।

অ্যাটর্নি জেনারেল আবারও সময় চেয়ে বলেন, আপনারা কি শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টি দেখবেন না? তখন আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারক মোঃ আব্দুল ওয়াহহাব মিঞা বলেন, আপনাকে কে বলেছিল বিদেশ যেতে? কেন বিদেশ গেলেন? অবকাশের আগেই তো শুনানির প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় দেয়া হয়েছে। আর এখন অসুস্থতার কথা বলছেন।

তিনি বলেন, এবারই কি প্রথম এই মামলাটি শুনানির জন্য কার্যতালিকায় এসেছে? নিশ্চয়ই নয়। তাহলে কেন সময় চাচ্ছেন?

পরে প্রধান বিচারপতির নির্দেশে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা মামলার পেপারবুক থেকে হাইকোর্টের রায় পড়া শুরু করেন। প্রায় ৫০ পৃষ্ঠা পড়ার পর মুরাদ রেজা বলেন, আপিল বিভাগের দু’জন বিচারক আজ এই মামলার শুনানিতে নেই। যখন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন পর্যায়ে আসবে তখন যেন তাদেরকে বেঞ্চে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, ন্যায় বিচারের স্বার্থে এই মামলায় আপিল বিভাগের সকল বিচারক অংশ নেবেন। এরপর পুনরায় শুরু করে ১৬৭ পৃষ্ঠা পর্যন্ত হাইকোর্টের রায় পাঠ করেন মুরাদ রেজা। এরপর শেষ হয় আদালতের কার্যদিবস। তখন অ্যাটর্নি জেনারেল প্রধান বিচারপতিকে বলেন, কাল (মঙ্গলবার) তো আপিল শুনানির দিন রয়েছে। তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, এটার শুনানি চলবে।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আপিল বিভাগের সাতজন বিচারপতির মধ্যে দুজন বিচারপতি আজকে এ বেঞ্চে নেই। শুনানি শেষ করে ফেললে তারা কি শুনবেন? প্রধান বিচারপতি বলেন, তারাও বেঞ্চে অন্তর্ভুক্ত হবেন। এ নিয়ে আপনাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, যদি এই আলোচনার মাধ্যমে বিভক্ত রায় হতো তাহলে জুডিশিয়ারির জন্য হেলদি হতো। এ পর্যায়ে বিচারপতি ওয়াহহাব মিঞা বলেন, শুনানিই শেষ হলো না আর আপনি বিভক্ত রায়ের কথা বলছেন? অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ্য করে প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনারা ‘অফিসার অব দ্য কোর্ট’ আমরা প্রত্যেকেই দেশের মঙ্গল চাই।