নিবন্ধ

পহেলা বৈশাখের ইতিহাস উৎপত্তি ও গ্রাম বাংলার উৎসব

পহেলা বৈশাখের ইতিহাস উৎপত্তি ও গ্রাম বাংলার উৎসব

পহেলা বৈশাখের ইতিহাস উৎপত্তি ও গ্রাম বাংলার উৎসব

বাংলা সনের প্রথম দিন, তথা পহেলা বৈশাখ আমরা বাংলা নববর্ষ উৎসব পালন করে থাকি । দিনটিবাংলাদেশএবংভারতেরপশ্চিমবঙ্গেনববর্ষ হিসেবে বিশেষ উৎসবের সাথে পালিত হয়।ত্রিপুরায়বসবাসরতবাঙালিরাওএই উৎসবে অংশ নিয়ে থাকে। সে হিসেবে এটি বাঙালিদের একটি সর্বজনীন লোকউৎসব হিসাবে বিবেচিত।গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জিঅনুসারে১৪ই এপ্রিলবাংলাদেশে এবং১৫ই এপ্রিলভারতেপহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ পালিত হয়।

উৎসবকে কেন্দ্র করে আমাদের নীতি ও নৈতিকতার প্রতিফলন
আমাদের বংলাদেশে এখন মানুষের নীতি-নৈতিকতা,সামাজিক মুল্যবোধ,অপরকে সম্মান প্রধান করা,নারীকে সম্মান প্রধান করা,ইতিহাস ও ঐতিহ্যএরকোনমূল্যনাই।উৎসব পালনে সবার জন্য সুন্দর ও অনুকুল পরিবেশ চাই ।প্রত্যেককে বাংলাচৈত্রমাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে বাধ্য থাকত।এর পর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকেমিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করাহত। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয় যার রূপ পরিবর্তন হয়েবর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে। তখনকার সময় এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল একটিহালখাতাতৈরি করা। হালখাতা বলতে একটি নতুন হিসাব বই বোঝানো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষেহালখাতা হল বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবেহালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। গ্রাম, শহর বা বাণিজ্যিক এলাকা, সকল স্থানেইপুরনো বছরের হিসাব বই বন্ধ করে নতুন হিসাব বই খোলা হয়। হালখাতার দিনে দোকানদাররা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করে থাকে। এই প্রথাটি এখনও অনেকাংশে প্রচলিত আছে, বিশেষত স্বর্ণের দোকানে।কিন্তু এখন হালখাতার প্রচলন কমে গেছে।

নতুন বছরের উৎসবের সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড়যোগাযোগ। গ্রামে মানুষ ভোরে ঘুম থেকে ওঠে, নতুন জামাকাপড় পরে এবংআত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে বেড়াতে যায়। এছাড়াও বিভিন্ন বৈশাখী মেলা, বলি খেলা, পান্তা ইলিশ, নৌকা বাইচ, লাঠি খেলা ইত্যাদি উপভোগ করতে গিয়ে সমাজের কিছু প্রগতিশীল মুক্তমনা মানুষের হাতে আমাদের মা-বোনেরা লাঞ্ছনার শিখার হচ্ছে ।প্রতি উৎসবকে কেন্দ্রকরে মা-বোনদের লাঞ্ছনা করা, বিভিন্ন পার্কে ঘুরতে যাবার নাম করে ছেয়ে-মেয়েদের অনৈতিক আচরণ, যৌন হয়রানিসহ বিভিন্ন অপকর্ম সংঘটিত হচ্ছে এর দায় কে নেবে। আমরা যদি আমারা শিখরকে ভুলে যাই তাহলে আমাদের ধ্বংস খুব নিকটে ।আমরা উৎসব পালন করব নিয়ন-শৃঙ্খলা ও ইতিহাসকে সামনে রেখে । উগ্রও হৈচৈপূর্ণ ভাবে আমরা উৎসব পালন করবনা বরং সুশৃঙ্খল ভাবে সার্বিক আনন্দের মাধ্যমে উৎসব পালন করব।

মঙ্গল শোভাযাত্রা এর সময় নারীদের যৌন হয়রানি না করা, বৈশাখী মেলা, বলি খেলা ইত্যাদি অনুষ্ঠানে অশ্লীলতা বর্জন করা, জুয়া এর আসর না বসানো, নাগর দোলা ও পুতুল নাচ এর নামে নগ্ন নাচ না করা, পান্তা-ইলিশ খেয়ে একদিনের বঙ্গালী না হওয়া বরং নিজের মধ্যে বাঙ্গালী মনোভাব জাগ্রত করা। উগ্রতা পরিহার করা।

পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ সম্পর্কে কিছু তথ্য

ইতিহাস ও উৎপত্তি
আমি নিশ্চিত না হয়েও বলতে পারি,অনেকেই জানে না বৈশাখেরইতিহাস, বৈশাখের ঐতিহ্য, বৈশাখের আবেদন একজন বাঙালীর জীবনে কতটুকু।
হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বার মাস অনেককাল আগে থেকেই পালিত হতো।এই সৌর পঞ্জিকার শুরু হতো গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়হতে। হিন্দু সৌর বছরের প্রথম দিনআসাম, বঙ্গ, কেরল, মনিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিল নাড়ুএবংত্রিপুরারসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই পালিত হত।

ভারতবর্ষে মুঘল সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায়করত। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথেমিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদেরকে খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করতে হত। খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন।সম্রাটের আদেশ মতে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহ উল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতিকার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে।

প্রথমে এই সনের নাম ছিলফসলি সন, পরে “বঙ্গাব্দ” বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।আধুনিক নববর্ষউদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। এরপর আবার পহেলা বৈশাখউদযাপনের খবর পাওয়া যায় ১৯৩৮ সালে। তবে ১৯৬৭ সনের আগে ঘটা করে পহেলাবৈশাখ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেনি। বাংলা বর্ষপঞ্জি বাবঙ্গাব্দ বাঙালির নিজস্ব সাল হলেও, সারা বিশ্বের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগরাখতে বাংলাদেশের সব জায়গাতেই খ্রিষ্টীয় সন ব্যবহার করা হয়। ১৯৮৮ সালের১৯ জুন থেকে আমরা বাংলা একাডেমীর সুপারিশ করা পঞ্জিকা গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জিঅনুসারে ১৪ই এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালন করা হয়।
আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেককে বাংলাচৈত্রমাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে বাধ্য থাকত।এর পর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকেমিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করাহত। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয় যার রূপ পরিবর্তন হয়েবর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে। তখনকার সময় এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল একটিহালখাতাতৈরি করা। হালখাতা বলতে একটি নতুন হিসাব বই বোঝানো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষেহালখাতা হল বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবেহালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। গ্রাম, শহর বা বাণিজ্যিক এলাকা, সকল স্থানেইপুরনো বছরের হিসাব বই বন্ধ করে নতুন হিসাব বই খোলা হয়। হালখাতার দিনেদোকানদাররা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করে থাকে। এই প্রথাটিএখনও অনেকাংশে প্রচলিত আছে, বিশেষত স্বর্ণের দোকানে।

উৎসব, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি
নতুন বছরের উৎসবের সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় যোগাযোগ। গ্রাম বাংলার পহেলা বৈশাখ আয়োজনে কিছু উৎসবঃ
বৈশাখী মেলা।
• পান্তা ইলিশ
• নৌকা বাইচ
• লাঠি খেলা
• হাতে বানানো পিঠা ও পুলির আয়োজন
• বলি খেলা বা কুস্তি
• নাগর দোলা ও পুতুল নাচ।

এছাড়াও আমাদের বংলাদেশে আরও কিছু উল্লেখ যোগ্য অনুষ্ঠান রয়েছেঃ

মঙ্গল শোভাযাত্রা
ঢাকার বৈশাখী উৎসবের একটি আবশ্যিক অঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরচারুকলা ইনস্টিটিউটেরউদ্যোগে পহেলা বৈশাখের সকালে এই শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়কপ্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলা ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয়। এই শোভাযাত্রায়গ্রামীণ জীবন এবং আবহমান বাংলাকে ফুটিয়ে তোলা হয়। শোভাযাত্রায় সকলশ্রেণী-পেশার বিভিন্ন বয়সের মানুষ অংশগ্রহণ করে। শোভাযাত্রার জন্য বানানোহয় বিভিন্ন রঙেরমুখোশও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি। ১৯৮৯ সাল থেকে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখ উৎসবের একটি অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

ঢাকা রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু সাংস্কৃতিক সংগঠনছায়ানটেরসঙ্গীতানুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন বছরের সূর্যকে আহ্বান। পহেলা বৈশাখসূর্যোদয়ের পর পর ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলিত কণ্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকেআহ্বান জানান। স্থানটির পরিচিতি বটমূল হলেও প্রকৃতপক্ষে যে গাছের ছায়ায়মঞ্চ তৈরি হয় সেটি বট গাছ নয়, অশ্বত্থ গাছ। ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানিশাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সাল থেকেছায়ানটের এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা।

বউমেলা
ঈশা খাঁরসোনারগাঁওয়েব্যতিক্রমী এক মেলা বসে যার নামবউমেলা, এটি স্থানীয়ভাবে “বটতলার মেলা” নামেও পরিচিত। জয়রামপুর গ্রামের মানুষেরধারণা, প্রায় ১০০ বছর ধরে পহেলা বৈশাখে শুরু হওয়া এই মেলা পাঁচ দিনব্যাপীচলে। প্রাচীন একটি বটবৃক্ষের নিচে এই মেলা বসে, যদিওসনাতনধর্মাবলম্বীরা সিদ্ধেশ্বরী দেবীর পুজোর জন্য এখানে সমবেত হয়।বিশেষ করে কুমারী, নববধূ, এমনকি জননীরা পর্যন্ত তাঁদের মনস্কামনা পূরণেরআশায় এই মেলায় এসে পূজা-অর্চনা করেন। সন্দেশ-মিষ্টি-ধান দূর্বার সঙ্গেমৌসুমি ফলমূল নিবেদন করে ভক্তরা। পাঁঠাবলির রেওয়াজও পুরনো। বদলে যাচ্ছেপুরনো অর্চনার পালা। এখন কপোত-কপোতি উড়িয়ে শান্তির বার্তা পেতে চায়ভক্তরা দেবীর কাছ থেকে।
এছাড়াও বন্দরনগরী চট্টগ্রামে পহেলা বৈশাখের উৎসবের মূল কেন্দ্রডিসি হিল পার্ক।

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার প্রধান তিনটি ক্ষুদ্র জাতিসত্তা রয়েছে যাদের প্রত্যেকেরই বছরের নতুন দিনে উৎসব আছে।ত্রিপুরাদেরবৈশুখ, মারমাদেরসাংগ্রাই ওচাকমাদেরবিজু উৎসব। বর্তমানে তিনটি জাতিসত্তা একত্রে এই উৎসবটি পালন করে। যৌথ এই উৎসবের নামবৈসাবি উৎসব। এই উৎসবের নানা দিক রয়েছে, এর মধ্যে একটি হলো মারমাদের পানি উৎসব।

বর্তমানে সরকারি পর্যায়ে বৈশাখী ভাতা ও সকল স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্রকরে উৎসবের আয়োজন করে থাকে ।
এইতো আমাদের বাঙালী ঐতিহ্য, এইতো আমাদের বৈশাখের ঐতিহ্য, যেকোনো বাধাবিপত্তি পেরিয়ে, সহস্র প্রতিকূলতা ছাড়িয়ে, রাস্ট্রীয় অস্থিতিশীলতার মাঝেওআমাদেরকে মাতিয়ে তোলে বর্ষবরণ উদযাপনে।
তথ্য সংগ্রহ (ইন্টারনেট)

বিশ্লেষণ ও উপলব্ধিঃ মোঃ সুলতান মাহমুদ, প্রভাষক ইংরেজি (খন্ডকালিন), কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজ, কক্সবাজার।
(এই নিবন্ধের বানান রীতি লেখকের)

কক্সবাজার ভিশন.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




এই পাতার আরও সংবাদ
error: Content is protected !!