সালাহউদ্দিন আহমদকে কারও মনে নেই!

সালাহউদ্দিন আহমদকে কারও মনে নেই!

ডেস্ক রিপোর্ট
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

‘উনার (সালাহউদ্দিন) কথা কি কারও মনে আছে? আমাদের সংসারটা কেমন করে যাচ্ছে আল্লাহ ছাড়া চিন্তা করার মতো আর তো কেউ নেই। কারণ, এমন একটা মানুষ এ রকমভাবে এমন একটা জায়গায় গিয়ে পড়েছে- যেখানে তিনি নিঃসঙ্গ জীবন-যাপন করছেন। আজ ছয়-সাতটা বছর ধরে উনি কীভাবে বেঁচে আছেন, সুস্থ না অসুস্থ আমরা জানি না। এসব কথা মানুষের কাছে বলতে গেলে সবাই লাথি মারে! আল্লাহ ছাড়া আমাদের আর কেউ নেই।’

এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে এভাবেই একটানা আক্ষেপ ও দুঃখভরা কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসন থেকে বারবার নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের স্ত্রী এডভোকেট হাসিনা আহমেদ।

অনুপ্রবেশের অভিযোগের মামলায় খালাস পাওয়ার পরও ভারতের রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিলের কারণে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় ছয়বছর ধরে সেদেশে অবস্থান করছেন সালাহউদ্দিন আহমদ। ফলে একদিকে স্বামীকে নিয়ে দুশ্চিন্তা, অন্যদিকে সন্তানদের নিয়ে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হচ্ছে হাসিনা আহমদকে।

চার সন্তানের মধ্যে দুইজন দেশের বাইরে থাকেন। আর বাকি দু’জনকে নিয়ে রাজধানীতেই থাকেন হাসিনা আহমেদ।

এদিকে আগে থেকে অসুস্থ সালাহউদ্দিন আহমদের নিঃসঙ্গ থাকা, সময়মতো চিকিৎসা করাতে না পারায় একাধিক রোগ শরীরে বাসা বেঁধেছে। এ নিয়েও দুশ্চিন্তা ভর করছে তার স্ত্রীর মনে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ২০১৩ সালের শেষের দিকে দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখন উত্তাল তখন বিএনপির অনেক শীর্ষ নেতা আত্মগোপনে চলে যান। তখন দলের মুখপাত্রের দায়িত্ব দেয়া হয় তখনকার যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমদকে। পরের বছর ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারিকে সামনে রেখে আবার সরকারবিরোধী আন্দোলনে নামে বিএনপি ও ২০ দল।

টানা অবরোধ কর্মসূচির সময় গ্রেপ্তার এড়াতে সালাহউদ্দিন আহমদ অজ্ঞাত স্থান থেকে গণমাধ্যমে পাঠাতেন দলের বিবৃতি ও ভিডিও বার্তা। বেশ কিছুদিন এভাবে চলার পর ওই বছরের ১০ মার্চ রাতে ঢাকার উত্তরা এলাকার একটি ভবন থেকে ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনী’ পরিচয়ে একদল অস্ত্রধারি তাঁকে ‘অপহরণ’ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। যা সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি করে।

নিখোঁজের দুইমাস পর মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ের একটি রাস্তা থেকে মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে সেখানকার স্থানীয় পুলিশ।

পরে অনুপ্রবেশের দায়ে ভারতের শিলংয়ের আদালতে আইনি লড়াই শেষে ২০১৮ সালের ২৬ অক্টোবর বেকসুর খালাস পান সালাহউদ্দিন আহমদ। তবে পাসপোর্ট ও ভিসা না থাকায় তাঁকে ভারতেই অবস্থান করতে হয়। অন্যদিকে খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে দেশটির রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের কারণে তাঁর দেশে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

এদিকে মহামারি করোনায় আদালতের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আইনিপ্রক্রিয়া নিয়ে আরো জটিলতা দেখা দিয়েছে।

পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভারতের শিলংয়ে অনুপ্রবেশের মামলায় বেকসুর খালাস পেয়েছিলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। কিন্তু সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে দেশটির রাষ্ট্রপক্ষ। আদালতে আপিলের পর সেটার আর অগ্রগতি নেই। করোনার কারণে দেশটির আদালতের কার্যক্রম বন্ধ।

জাতীয় একটি অনলাইন গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে সালাহউদ্দিন আহমদের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ জানান, তাঁর (সালাহউদ্দিন) শারিরিক অবস্থা আগের তুলনায় আরো খারাপ হয়েছে। কিডনি, হার্টে সমস্যা ও ডায়াবেটিকসহ বিভিন্ন রোগে ভুগছেন তিনি। শিলংয়ে অবস্থানকালে তিনি কিডনি ও মূত্রথলিতে অপারেশন করিয়েছেন।

সালাহউদ্দিন আহমদের স্ত্রী সাবেক সংসদ সদস্য হাসিনা আহমেদ বলেন, ‘উনার (সালাহউদ্দিন) শারিরিক অবস্থা আগের মতোই খারাপ। কোথাও গিয়ে ডাক্তার দেখাবেন সেই অবস্থাটুকুও এখন নেই। আর একা একা কোনো মানুষ যদি কোথাও পড়ে থাকে সে-কি সুস্থ থাকতে পারে? শিলংয়ে তার একাকি নিঃসঙ্গ দিন কাটছে।’

সাক্ষাতের জন্য আগে ভারত যাবার সুযোগ ছিল; কিন্তু বর্তমানে তা বন্ধ রয়েছে বলে জানান হাসিনা আহমেদ।

তিনি বলেন, ‘এখন অনেকদিন ধরে যেতে পারছি না। করোনার কারণে সেখানে (ভারতে) লকডাউন চলছে। তাই যাওয়া-আসা আরো কঠিন হয়ে গেছে। মেডিকেল ভিসা বা বিজনেস ভিসা ছাড়া যাওয়া খুব কঠিন। আর করোনার মধ্যে ছেলে-মেয়েদের রেখে সেখানে যেতে পারছি না। ওরা তো ছোট।’

ফিরতে বাধা কোথায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওখানকার সরকারের কাছে আপিল করা হয়েছিল। আপিলের পর সেটার আর মুভমেন্ট নেই। ওভাবেই কাগজ পড়ে আছে। এখন দেশটির সরকারের ব্যাপার। এখানে আমাদের কিছু করার নেই।’

এদিকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ফেরানোর মতো আসামিও নন বিএনপির এই নেতা। তাই দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আলোচনা ও সম্মতির মাধ্যমে তাঁকে দেশে ফিরতে হবে বলে জানান পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

সালাহউদ্দিন আহমদকে ফেরাতে সব ধরণের চেষ্টা করেছেন জানিয়ে হাসিনা আহমেদ বলেন, ‘কোনো কিছুই বাদ রাখিনি। এখন আপিল যতদিন মুভমেন্ট না হবে, আইনিপ্রক্রিয়া যতদিন শেষ না হবে ততদিন আমাদের আর কিছু করার নেই। কী হবে এটার ভবিষ্যত সেটা আল্লাহ জানেন।’

এসময় তিনি সবার কাছে স্বামীর জন্য দোয়া চেয়ে বলেন, ‘সবকিছু এখন আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়েছি। তিনি যদি সহায় হন তাহলে সালাহউদ্দিন নিজ দেশে ফিরতে পারবেন। না হলে ….।’

যেভাবে রাজনীতিতে সালাহউদ্দিন আহমদ
১৯৯১-৯৬ মেয়াদে তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার এপিএস ছিলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। পরে তিনি চাকরি ছেড়ে কক্সবাজার জেলার কক্সবাজার-১ (চকরিয়া) আসনের সংসদ সদস্য হন এবং ২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। তাঁর স্ত্রী হাসিনা আহমেদও সংসদ সদস্য ছিলেন।

নিখোঁজ হওয়ার সময় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমদ পরে ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পান।

সালাহউদ্দিনের নামে ২৭ মামলা
বিএনপির এই নেতার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় ২৭টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ২০১৫ সালে অবরোধের সময় বেশ কয়েকটি মামলা হয়। বিস্ফোরক দ্রব্য, বিশেষ ক্ষমতা আইন ও হত্যার অভিযোগে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানায় তিনটি, বিস্ফোরক আইন ও হত্যার ঘটনায় রামপুরা থানায় দু’টি, বিস্ফোরক আইন ও পুলিশের কাজে বাধা দেয়ার ঘটনায় ভাটারা থানায় দু’টি এবং হত্যা ও বিস্ফোরক আইন ও হত্যার ঘটনায় কুমিল্লায় আরও দু’টি মামলা রয়েছে।

সালাহউদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে দেশে হওয়া মামলার বিষয়ে তার স্ত্রী হাসিনা আহমেদ বলেন, ‘দেশে যেসব মামলা ছিল সেগুলো এখন আইনজীবীরাই দেখছেন। পার্টির পক্ষ থেকে আগে ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়াকে দেখতে বলেছিলেন। তিনি মারা যাবার পরে অন্য একজন মামলাগুলো দেখছেন।’
সুত্র : ঢাকা টাইমস।

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!