ফেসবুক কর্ণার

রেণুভাবীর মায়ার সংসার

ক্যান্সারের কাছে হেরে গেলেন প্রফেসর মাহবুবের স্ত্রী ফাহমিদা

মনজুর সাদেক, ফেসবুক থেকে নেয়া
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

১ । রেণুভাবীর সংসারে পৌছাতে পৌছাতে গত বৃহষ্পতিবার রাত এগারোটা বেজে যায়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অরণ্যের সাথে মিশে যাওয়া আবাসিক এলাকায় প্রফেসরদের সারি সারি ডুপ্লেক্স। এর প্রথম ডুপ্লেক্সটিই রেণুভাবীদের। সামনে কয়েকটা রাইড নিয়ে শিশু পার্ক। আলো অন্ধকারে রাস্তার ওপারে রেণুভাবীর স্কুল দেখা যায়, নীপবন শিশু শিক্ষা নিকেতন। অরণ্যঘেরা ক্যাম্পাসের নিস্তব্ধতা বাড়িয়ে দিতে হঠাৎ টিপ টিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে। গাড়ির হেডলাইটের আলোয় দেখা গেলো- প্রফেসর মাহবুব একজন সিকিউরিটি গার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে – রেণুভাবীর রেখে যাওয়া স্বামী।

২। মাহবুবকে দেখে বুকটা ধ্বক করে ওঠে। ওজন কমে গেছে। মনে হচ্ছে, সারারাত তুফানের পর দাঁড়িয়ে থাকা একটা বড় শাল গাছ। আমি মনে মনে ক্যাম্পাসের বড় বড় গাছগুলোর সাথে মাহবুবকে মেলাতে মেলাতে গাড়ি থেকে লাগেজ নামাই। তারপর, রেণুভাবীর সংসারে প্রবেশ করি।

৩। শুক্রবার চট্টগ্রামে আমার সারাদিন অফিসিয়াল প্রোগ্রাম। সাথে বৃহষ্পতিবার বিকেলে পটিয়ায় নতুন কর্মসূচি যোগ হয়েছে। ঢাকায় বিমানে ওঠে ছক তৈরি করে ফেলি, আজ রেণুভাবীর সংসারটা দেখতে যাব। বিমান থেকে নেমে বোটে কর্ণফুলি নদী পার হই। নদীর ওপারে গাড়িতে ওঠে পটিয়া যেতে যেতে বাল্যবন্ধু এডভোকেট সেলিমকে ফোন দেই। সেলিম বিনা বাক্য ব্যয়ে আমার প্রোগ্রামে ঢুকে পড়ে। পটিয়ায় কাজ শেষ করে শান্তিরহাটের বিখ্যাত জ্যামে পড়ে যাই। চট্টগ্রাম শহরে সেলিমকে পিক করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত এগারোটা।

৪ । ডুপ্লেক্সে ঢুকে বামে লিভিং, ডানে ডাইনিং। ডুপ্লেক্সের নীচতলা প্রায় বারো ফিট উঁচু। তার সাথে মানানসই পেন্টিং, বাংলার লোকশিল্প। বুক সেল্ফে ইতিহাস গবেষণা বই। ওয়াশ রুমে ঢুকে ফ্রেশ হই। নীচতলার গেষ্টরুমে এশার নামাজ পড়ি। মাহবুবের রান্নার খোঁজখবর নিতে কিচেন, স্টোর দেখতে যাই। গোছানো, থরে থরে সাজানো সংসার দেকেখতে দেখতে পঁচিশ বছরের সংসারের গভীরতা মাপার চেষ্টা করি। এর মধ্যে ভাবীর বড় ছেলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ফাহিম দোতলা থেকে ধুপধাপ কয়েকবার নেমে আসে। ছোট ছেলে ফারাবি পোর্ট কলোনীতে খালার বাসায়। এ বাসায় আসার সাহস তাঁর এখনও হয়নি। তাঁর মা, এ বাড়ির রেণুভাবী কক্সবাজার মধ্যম নুনিয়াছড়া কবরস্থানে স্থায়ী নিবাসে আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় দু’ সপ্তাহ হলো।

৫। মাহবুব আর সেলিম ভাবীর চিকিৎসা, মৃত্যু, দেশ বিদেশের হাসপাতালে ডাক্তারদের খতিয়ান নিয়ে কথা বলতে থাকে। আমি সোফায় আধশোয়া হয়ে তাঁদের পঁচিশ বছরের সংসারের খতিয়ান নিয়ে ভাবতে থাকি। ফাহমিদা রেণু ভাবী মাহবুবের সেকেন্ড কাজিন। ভাবী বছর দুয়েকের ছোট। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মাহবু্ব ইতিহাস, ভাবী বোটানী পড়তেন। পড়ালেখা শেষ হয়েছে, তাঁদের আর বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া হয়নি। প্রথম শ্রেণীতে প্রথম মাহবুব ইতিহাসের শিক্ষক হয়েছে। প্রথম শ্রেণীতে তৃতীয় ভাবী শিক্ষক চবিতে শিক্ষক হতে পারেননি। হলের জীবন ছাড়ার বছর খানেকের মধ্যে অরণ্যে ঘেরা এ ক্যাম্পাসের আবাসিক এলাকায় জায়গা করে নিয়েছে তাঁরা। এ ক্যাম্পাস, এ অরণ্যে তাঁরা শুধু বসবাস করেনি, প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগও করেছে। ক্যাম্পাস ছাড়তে হবে বলে রেণুভাবি বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও আর ভাইভা দেননি। বোটানিতে এমফিল করলেন। এমফিল করে চবিতেই শিক্ষক হওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু, শিক্ষক রাজনীতির বিভিন্ন ঘোরপ্যাঁচে ভাবীর আর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হওয়া হলোনা। মাহবুব ক্রমশ: বড় হয়েছে, প্রফেসর হয়েছে। ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান হয়েছে, সিনেট সদস্য হয়েছে। শিক্ষক রাজনীতিতে মাহবুব শক্তিশালী হওয়ার সময়ে ভাবীর শিক্ষক হওয়ার প্রস্তাব এসেছে। কিন্তু, ভাবীর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছাটাও ততদিনে মরে গেছে। আর, ‘নীপবন’ শিশু শিক্ষা নিকেতনও তাঁকে মায়ায় জড়িয়ে রেখেছে।

৬। দেশে যখন করোনা শুরু হয়েছে, ভাবীর স্টম্যাক ক্যান্সার ধরা পড়ল। করোনায় ঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করা গেলোনা। চিকিৎসা শুরু করার অবস্থা যখন এলো, ভাবীর করোনা ধরা পড়লো। চিকিৎসার ব্যাটবল সহজে মিলানোর জন্য চেন্নাই যাওয়া হলো। ক্যামো থেরাপি শুরু হলো। সবমিলিয়ে বছর দেড়েক টিকে থাকলেন ভাবী। এর মধ্যে আমরা কয়েকবার আসার চেষ্টা করছি, মাহবুব করোনার দোহাই দিয়ে এড়িয়ে গেছে। আজ বুঝছি, করোনা বড় কারণ ছিলনা। কেমো দিয়ে রেণুভাবীর ওজন কমে অর্ধেক হয়ে গেছে। চুল পড়ে গেছে, পেকেও গেছে। এ চেহারা সবাই দেখুক, এটা তিনি চাইতেন না।

৭। মাহবুব বলছে, ক্যান্সারটা করোনার সময়ে না হলে যুদ্ধ করা যেতো। আমি তাঁকে ‘ টাইমকিপার’ এর গল্প বলি। সাইমন গারফিল্ড পুত্রসহ লিভারপুলের খেলা দেখছিলেন। লিভারপুল গোল খেয়েছে, তাঁর আর ভালো লাগলোনা। কি মনে করে, খেলা শেষ হোয়ার আগেই স্টেডিয়াম থেকে বেরোলেন। স্টেডিয়ামের কাছাকাছি সাইকেল লেনে সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরছেন। স্কটল্যান্ড থেকে আসা কয়েকজন তরুণীও স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়ে হাঁটছেন। এদের একজন লেনের এপারে, অন্যরা ওপারে। অন্যরা কি একটা কথা বলে হাসছে। হঠাৎ এ পাশের তরুণী রাস্তা পার হওয়ার জন্য দৌড় লাগালেন। তাঁকে বাঁচাতে গিয়ে সাইমন রাস্তায় পড়ে গেলেন। রিব বোন ভেঙ্গে ছয় মাসের হাসপাতাল বাস। হাসপাতালে বসে বসে সাইমন ভাবছেন, লিভারপুল আগেভাগে গোল না খেলে তিনি স্টেডিয়াম থেকে আগে বের হতেন না। ও পাশের মেয়েগুলো ঠিক তখন উচ্চ স্বরে হাসাহাসি না করলে, এ মেয়েটা রাস্তা পার হওয়ার জন্য অস্থির হতো না। দূর্ঘটনা নিয়ে ছ’মাস হাসপাতাল বাসও হতোনা। কিন্তু সবকিছু কাটায় কাটায় ঘটে গেছে এবং যার ফলে সাইমনের ছয় মাস হাসপাতাল বাস কপালে জুটে গেছে। হাসপাতালে শুয়ে সাইমন অবাক হয়ে ভাবছেন, ‘হু কিপস অল দিস টাইম? হু ইজ দ্য টাইমকিপার? আমি মাহবুবকে বলি, ভাবীর সময়টা টাইমকিপার হিসেব করে দিয়েছে। কারও কিছু করার নেই। টাইমকিপার কেন করেছে, হয়তো গভীরভাবে ভাবতে থাকলে একদিন বুঝতে পারবি।

৮ । মৃত্যুর মাসখানেক আগে থেকেই ভাবী মোটামুটি জানতেন, তিনি চলে যাবেন। হয়তো দিন তারিখ জানতেন না। কি ভাবতেন, কি করতেন? মাহবুবকে জিজ্ঞেস করি। বাসার সাথেই বারান্দা। বারান্দার একশ’ গজ দূরেই বড় বড় গাছের অরণ্য শুরু হয়েছে। উদাস হয়ে বারান্দায় বসতো, ব্যথা ভোলার চেষ্টা করতো। মাঝে মাঝে অস্থিরতা বেড়ে যেতো- মাঝে মাঝে অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে বসে থাকতো। সেভেনে পড়ুয়া ছোট ছেলে ফারাবীকে নিয়ে ভাবতো- ওর কি হবে? নতুন মা এলে ওর সাথে কি রকম আচরণ করবে? ফারাবীকে কি বোঝার চেষ্টা করবে? তুই কি বললি- সেলিম জানতে চাইলো। বললাম, ওরা আমারও সন্তান। আমি ওদের আগলে রাখব। একই সাথে তাঁদের বাবা এবং মা হয়ে থাকব। রেণুভাবী হাসলেন, ঠিক আছে। আমি ওপর থেকে দেখব। তারপর, অদ্ভুত প্রশান্তিতে তাঁর চেহারা ঝলমল করে ওঠল।

৯। ভোর সাড়ে চারটায় আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। অরণ্যের সাথে লাগায়ো বারান্দায় গিয়ে ভোরের আলো ফোঁটা দেখতে থাকি। মাহবুবের মায়াভরা সংসার ফেলে ভাবী চলে গেলেন। আমি ‘মায়া’ নিয়ে ভাবতে থাকি। মায়া কোথায় থাকে? এই যে হৃদয়ের মাংসপেশী-রক্ত সংবহন তন্ত্র, কিংবা মস্তিষ্কের নিউরণ- কোথায় খুঁজলে মায়া পাওয়া যায় আমরা জানিনা। একইভাবে, মানুষের ‘রুহ’ কোথা থেকে আসে, কোথায় থাকে, কোথায় যায়- তাও আমরা জানিনা। আমি ভালোবাসা-মায়া-রুহ একই সুত্র থেকে আসা সফটওয়্যার প্রোগ্রামগুলো নিয়ে ভাবতে থাকি। এই প্রোগ্রামের ঠিক কোথায় লক্ষ লক্ষ বছর ধরে হারিয়ে যাওয়া আত্মাগুলো বসবাস করে- আমি ভেবে আর কুল পাইনা। মহাবিশ্বে লক্ষ কোটি গ্রহ-তারা-ব্ল্যাকহোল। মানুষের মস্তিষ্কে লক্ষ কোটি নিউরণ। মানুষের মস্তিষ্কও যেন মহাবিশ্বের প্রটোটাইপ। মস্তিষ্কে যদি মায়ার বাঁধন থাকে, তবে কি মহাবিশ্বও এক বিশাল মায়ার বাঁধনে বাঁধা?

১০ । ভোরের আলো ফোটতে থাকে । আমি মহাবিশ্বের স্রষ্টার কাছে রেণুভাবীর মাগফেরাতের জন্য দোয়া করতে থাকি।

(মোহাম্মদ মাহবুবুল হক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রফেসর। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে অতিসম্প্রতি তাঁর স্ত্রী  মাহমুদা রেণু মারা গেছেন। আর লেখক মনজুর সাদেক প্রফেসর মাহবুবের বন্ধু।  প্রফেসর  মাহবুবুল হক  ও মনজুর সাদেক দু’জনই কক্সবাজার শহরের বাসিন্দা। তিনি ৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে পোষ্ট করা।)

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!