বাসায় ঢুকে দুর্বৃত্তদের হামলা, সংকটাপন্ন ইউএনও ওয়াহিদা

দুর্বৃত্তদের নৃশংস হামলায় সংকটাপন্ন দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানম। আশঙ্কাজনক অবস্থায় এয়ার এম্বুলেন্সে করে তাকে ঢাকায় আনা হয়েছে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে তার চিকিৎসা চলছে। দুর্বৃত্তের আঘাতে ওয়াহিদা খানমের মাথার খুলি ভেঙে মস্তিষ্কে ঢুকে গেছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। আঘাতে তার শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে গেছে।

বেলা তিনটায় রাজধানীর নিউরো সায়েন্সেস হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। অস্ত্রোপচার কক্ষে নিয়ে গেলেও অস্ত্রোপচার করার মতো পরিস্থিতিতে তিনি নেই বলে চিকিৎসকরা জানান। হাসপাতালের পরিচালক দীন মোহাম্মদ সাংবাদিকদের বলেন, ইউএনও’র মাথার আঘাত অনেক জটিল ও গুরুতর।

প্রাথমিকভাবে তাকে দেখা হয়েছে। সবকিছু বিবেচনা করে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে। ইউএনও’র চিকিৎসায় একটি মেডিকেল টিম গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

গত বুধবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে সরকারি বাসভবনে ঢুকে ঘোড়াঘাট ইউএনও ওয়াহিদা খানম ও তার বাবার ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে রংপুর কমিউনিটি হাসপাতালের আইসিইউতে নেয়া হয়। সেখানে তার অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আনা হয়। ইউএনও’র বাবা ওমর শেখ চিকিৎসাধীন রয়েছেন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

এ ব্যাপারে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেছেন, ইউএনওর ওপর হামলাকারী দুর্বৃত্তরা অবিলম্বে গ্রেপ্তার হবে এবং তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, সিসিটিভি ফুটেজে ২ জন হালকা গড়নের কম বয়সী লোককে প্রবেশ করতে দেখা গেছে। ইউএনও ওয়াহিদা তার এক সন্তানকে নিয়ে সরকারি বাসায় থাকতেন। তার বাবা ওই বাসায় মাঝেমধ্যে যান। ওয়াহিদার স্বামী মেজবাহুল হোসেন রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা।

ঢাকার নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে ওয়াহিদা খানমকে আনার পর সেখানে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনসহ কর্মকর্তারা ছুটে যান। তারা ওয়াহিদা খানমের চিকিৎসার তত্ত্বাবধান করছেন।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস হাসপাতালের নিউরো সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. জাহেদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ইউএনওর মাথায় ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। মাথার খুলির হাড় ভেঙে ভেতরে ঢুকে গেছে। এটি মস্তিষ্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে প্রচণ্ডভাবে। ভেতরে রক্তরক্ষণ হয়েছে। তার অবস্থা স্থিতিশীল না। ব্লাড প্রেসার কমে গেছে। জ্ঞানের মাত্রা সাধারণ মানুষের মতো নেই; যদিও তিনি কথাবার্তা বলার চেষ্টা করছেন। তিনি প্রেসার ধরে রাখতে পারছেন না। প্রেসার কমে গেছে। তার পালস বেড়ে গেছে। তিনি রেস্টলেস অবস্থায় আছেন। আগে তাকে স্টেবল (স্থিতিশীল অবস্থা) করতে হবে। অপারেশন (অস্ত্রোপচার) করার মতো অবস্থায় নেই। এখন অপারেশন করলে বিপজ্জনক হবে। আগে তার অবস্থার উন্নতি করাতে হবে। ব্লাড, স্যালাইন দেয়া হয়েছে। অনেকগুলো ওষুধ দেয়া হয়েছে।

ইউএনও কেমন শঙ্কায় আছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক জাহেদ হোসেন বলেন, শঙ্কাটা কতটুকু, বলা কঠিন। তবে উনি সংকটাপন্ন অবস্থাতেই আছেন। ওনার ব্লাড প্রেসার, পালস রেট ও জ্ঞানের মাত্রার অবস্থার উন্নতি না হলে উনি যথেষ্ট বিপজ্জনক অবস্থায় আছেন। যেকোনো সময় একটা দুর্ঘটনা ঘটেও যেতে পারে। ইউএনও’র চিকিৎসায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি মেডিকেল টিম গঠন করেছে। এই দলে আছেন হাসপাতালের পরিচালক দীন মোহাম্মদ, নিউরো সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক জাহেদ হোসেন, হাসপাতালের যুগ্ম পরিচালক বদরুল আলম, চিকিৎসক এম এম জহিরুল হক, আমিন মোহাম্মদ খান, মাহফুজুর রহমান ও উজ্জ্বল কুমার মল্লিক।

এদিকে দিনাজপুর থেকে সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, বুধবার রাতে ইউএনও’র বাসভবনে ঢুকে ওয়াহিদা খানম ও তার বাবার ওপর হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে রংপুর কমিউনিটি হাসপাতালের আইসিইউতে নেয়া হয়। সেখানে তার অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বেলা সাড়ে ১২টার দিকে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকায় পাঠানো হয়।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরো সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান তোফায়েল হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ইউএনও’র মাথার বাম দিকে বেশি আঘাত লেগেছে। তার প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। ধাতব কোনো বস্তু দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়েছে। তার শরীরের ডান দিক অবশ হয়ে গেছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক।

আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা এবং প্রশাসনের ধারণা, ইউএনও ওয়াহিদা খানমকে হত্যার উদ্দেশ্যেই দুর্বৃত্তরা এই হামলা চালিয়েছে। তবে, কি কারণে তা এখনো অনুমান করা যায়নি।

ঘোড়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আমিরুল ইসলাম জানান, দুর্বৃত্তদের ধরার প্রক্রিয়া চলছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য শিবলী সাদিক, দিনাজপুর জেলা প্রশাসক মো. মাহমুদুল আলম, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এ ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও তোলপাড় শুরু হয়েছে প্রশাসনে।

ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা হয়েছে বলে মনে করছেন দিনাজপুরের ডিসি মাহমুদুল আলম।

তিনি বলেন, পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে এটা ছিল হত্যাচেষ্টা। সিসি ক্যামেরা দেখা হচ্ছে এবং সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ঘটনা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার বিকালে রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল ওহাব ও রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য্য ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
ঘটনার পর থেকে র‌্যাব ও পুলিশ সরকারি বাড়িটি ঘিরে রেখেছে। সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ছাড়া কাউকে যেতে দেয়া হচ্ছে না।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী যা বললেন

এদিকে সচিবালয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানমকে আঘাতকারী দুর্বৃত্তদের গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে। পাশাপাশি উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে হেলিকপ্টারে ঢাকায় আনা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, ইউএনও ওয়াহিদা খানম এবং তার বাবাকে দুর্বৃত্তরা হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করেছে।

ফরহাদ হোসেন বলেন, এসপি সাহেব জানিয়েছেন, খুব দ্রুতই তারা দুর্বৃত্তদের নাম-ঠিকানা বের করতে পারবেন। তাদের প্রচেষ্টা চলছে। ইউএনও’র বাসায় সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল। সেগুলো দেখে দুর্বৃত্তদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। তবে তাদের মুখে মুখোশ ছিল। তাদের শনাক্তে পুলিশের চৌকস টিম কাজ করছে।

তিনি বলেন, এটি অবশ্যই একটি দুঃখজনক ঘটনা। অবিলম্বে দুর্বৃত্তরা গ্রেপ্তার এবং তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে।

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!