প্রফেসর মোশতাক আহমদের চিরবিদায়

নিজস্ব প্রতিবেদক
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

রামু কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, শিক্ষাবিদ ও লেখক প্রফেসর মোস্তাক আহমদ আর নেই। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

মঙ্গলবার (১ ডিসেম্বর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

সোমবার তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসারত ছিলেন প্রফেসর মোস্তাক আহমদ।

আজ বুধবার বাদে আছর রামু হাইস্কুল মাঠে মরহুমের নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হবে।

যেভাবে এলেন জীবনের শেষপ্রান্তে
প্রফেসর মোশতাক আহমদ কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলার ফতেখারকুল ইউনিয়নের মন্ডল পাড়া গ্রামে ১৯৪০ সালের ৮ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন রশিদ আহমদ মাস্টার। তিনি অবসরপ্রাপ্ত সমবায় কর্মকর্তা ছিলেন। পরবর্তীতে রামু খিজারী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারি শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন। মা মুনিরা বেগম ছিলেন গৃহিণী।

গ্রামের মক্তবে ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু হয় মোশতাক আহমদের। ১৯৫৫ সালে খিজারী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষা পাস করেন। ১৯৫৭ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আইএ, ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে অনার্সসহ বিএ পাস করেন। ১৯৬৩ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে এমএ পাস করেন।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন।

সাতকানিয়া কলেজে ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। ১৯৬৩ সালে কক্সবাজার কলেজ প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা নেন। ওই কলেজে ইংরেজির প্রভাষক হিসাবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে যোগ দেন। পরে ১৯৬৫ সালে ঢাকা কলেজে ইংরেজির প্রভাষক পদে যোগদান করেন। পরে তিনি চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ, সিলেট সরকারি কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজে ইংরেজির প্রভাষক হিসাবে কর্মরত ছিলেন।

১৯৬৯ সালে পদোন্নতি নিয়ে সিলেট সরকারি কলেজে ইংরেজির প্রফেসর হিসাবে যোগ দেন।

ইতোপূর্বে ১৯৬৭ সালে কমিশন্ড অফিসার হিসাবে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। পাকিস্তানীদের সাথে মতবিরোধের কারণে চাকুরীতে ইস্তফা দেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে রামু থানার ছাত্র-যুবকদের সংগঠিত করে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেন। পরে পাক হানাদার বাহিনীর হাতে কক্সবাজারের পতন ঘটলে অন্যদের সাথে তিনিও প্রতিবেশি রাষ্ট্র বার্মায় (মিয়ানমার) শরণার্থী হিসাবে আশ্রয় গ্রহণ করেন। ক্যাপ্টেন (অবসরপ্রাপ্ত) আবদুস সোবহানের সহযোগিতায় শরণার্থী শিবিরে অবস্থানরত ছাত্র-যুবক ইপিআর (বর্তমান বিজিবি) ও বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যদের সংগঠিত করে মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী গঠন করে কক্সবাজারের বিভিন্ন অঞ্চলে শত্রু সেনাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপারেশনে অংশ গ্রহণ করেন।

১৯৭৪ সালে চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া হুলাইন ছালেহ-নুর কলেজে অধ্যক্ষ পদে যোগদান তিনি।

১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে সোভিয়েট ইউনিয়নে যান মোশতাক আহমদ। তিনি ‘ইন্টারন্যাশনাল লেনিন স্কুল’ অধ্যয়ন করেন। ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন।

১৯৮৯ সালে রামু কলেজ প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় অংশগ্রহণ ও ওই কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে ২০০৫ সালের এপ্রিল মাসে অবসর গ্রহণ করেন প্রফেসর মোশতাক আহমদ।

কক্সবাজার জেলার উচ্চশিক্ষা বিস্তারে পথিকৃতের ভূমিকা পালন তিনি। শিক্ষায় অনগ্রসর কক্সবাজার জেলার সর্বপ্রথম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান কক্সবাজার কলেজ (বর্তমানে কক্সবাজার সরকারি কলেজ) স্থাপনে ১৯৬২ সালে উদ্যোগী ভূমিকা রাখেন তিনি।

নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহম্মদ ইউনুছ, বিচারপতি তোফাজ্জল ইসলাম, বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরী, বিচারপতি এম, এ আজিজ, সাবেক সচিব মোফাজ্জল করিম, সাবেক সচিব মঞ্জুর এ মওলা প্রমুখ তাঁর ঘনিষ্টবন্ধু ও সহপাঠি ছিলেন।

তিনি কক্সবাজারের ইতিহাস গ্রন্থের পূণর্লিখন ও ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। গ্রন্থের শিরোনাম “Glimpses of Cox’s Bazar” কক্সবাজার ফাউন্ডেশন ১৯৯৫ সালে বইটি প্রকাশ করে। প্রয়াত কবি আবুল ফারুখ খানের কবিতা গ্রন্থ ‘আত্মক্ষরণ’ এর ইংরেজি অনুবাদও করেন তিনি। গ্রন্থের শিরোনাম “”I Bleed”। বইটি ঢাকা বইমেলায় প্রকাশিত হয়। জীবনানন্দ দাশের নির্বাচিত কবিতার ইংরেজি অনুবাদ করেন তিনি। গ্রন্থের শিরোনাম “Gleanings From Jibananda Das। কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমী ২০০২ সালে এই কবিতাগ্রন্থটি প্রকাশ করে। কবি শাহেদ সাদ উল্লাহর কবিতা বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ। শিরোনাম Voyage to Destiny.

পুরস্কার
১৯৯৮ সালে কক্সবাজার জেলার শ্রেষ্ঠ কলেজ শিক্ষক হিসেবে সরকারী ভাবে পুরস্কার ও সনদ পান প্রফেসর মোশতাক আহমদ। ২০০৩ সালে চট্টগ্রাম বিভাগের শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধান (কলেজ) হিসেবে পুরস্কৃত ও সনদ পান। একই বছরে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে জেলার কৃতি কলেজ শিক্ষক হিসেবে পুরস্কার পান তিনি।

২০০৫ সালে কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমীর সাহিত্য পুরস্কার ও হেমন্তিকা পুরস্কার, ২০০৯ সালে ফজল-আম্বিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কক্সবাজার রাষ্ট্র বিজ্ঞান সমিতি কর্তৃক শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ সম্মাননা, শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য কালের কন্ঠ ও কক্সবাজার স্বপ্নের সিঁড়ি কর্তৃক পুরস্কার, শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য ২০০৯ সালে প্রথম আলো পুরস্কার পান।

তিনি বাংলাদেশ বেতার, কক্সবাজার কেন্দ্রের নিয়মিত কথক ও আলোচক ছিলেন।

সেবা কা্রযক্রম
মা ও শিশু হাসপাতালের উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্য তিনি। রামু খিজারী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ (১৯৯১-২০০৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত) পরিচালনা পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!