পরীমণিকে ফাঁদে ফেলেন অমি, সেই রাতের ঘটনা ছিল অনেক ভয়ংকর

পরীমণিকে ফাঁদে ফেলেন অমি, সেই রাতের ঘটনা ছিল অনেক ভয়ংকর

ডেস্ক রিপোর্ট
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

বাংলাদেশি চিত্রনায়িকা পরীমণিকে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত হলেন ঢাকার ক্লাবপাড়ার পরিচিত মুখ আবাসন ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদ ও তুহিন সিদ্দিকী অমি। সোমবার পরীমণির দায়ের করা মামলার পরপরই এ দু’জনসহ পাঁচজনকে মাদকসহ গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেপ্তার হওয়া অন্যরা হলেন লিপি আক্তার (১৮), সুমি আক্তার (১৯) ও নাজমা আমিন স্নিগ্ধা (২৪)। পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে এখনও পরীমণিকে নির্যাতনের কথা স্বীকার করেননি নাসির উদ্দিন মাহমুদ ও তুহিন সিদ্দিকী অমি।

পুলিশ বলছে, এ ঘটনার নেপথ্যে মূল ভূমিকা পালন করেন অল্প সময়ে অঢেল বিত্তের মালিক হওয়া অমি। পরীমণির ঘটনা সামনে আসার পরপরই তিন নারীসহ অমির উত্তরার বাসায় গা-ঢাকা দেন নাসির। এ থেকে স্পষ্ট, অমির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

৮ জুন মধ্যরাতে কৌশলে পরীমণিকে আশুলিয়ার বেড়িবাঁধে ঢাকা বোট ক্লাবে নিয়ে যান অমি। অভিনেত্রীকে ফাঁদে ফেলতে পূর্বপরিকল্পিতভাবে এটা করেন তিনি। এরপর সেই রাতে পরীমণি ভয়ংকর নিপীড়নের শিকার হন। এ সময় অভিনেত্রীকে বাঁচাতে কোনো সহযোগিতা না করে উল্টো নিপীড়কদের সহায়ক হন তিনি। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার কোনো পথ না পেয়ে চারদিন পর রোববার অভিনেত্রী নিজেই ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলে বিষয়টি সবার সামনে আসে। এরপর নড়েচড়ে বসেন সংশ্নিষ্টরা।

পুলিশ মহাপরিদর্শক ও ঢাকা বোট ক্লাবের সভাপতি ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, এ ঘটনা দুঃখজনক, অনভিপ্রেত। পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। মামলার পরপরই আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করেছি আমরা। ক্লাব কর্তৃপক্ষও তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। যার যে পরিচয় হোক বা যত ক্ষমতাধর হোক, অপরাধ করলে ছাড় নয়।

পুলিশ মহাপরিদর্শক বলেন, পরীমণি আমাকেও বিষয়টি জানাতে পারতেন। ফোন বা খুদেবার্তা পাঠালেও বিষয়টি জানতে পারতাম। আমাদের ডিএমপি কমিশনার, গুলশানের ডিসি ছিলেন; তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করেননি পরীমণি। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি সামনে আসে। এরপরই পুলিশ তার সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত মামলা নেয়।

এ ব্যাপারে ডিবির যুগ্ম কমিশনার হারুন অর রশীদ বলেন, অভিযুক্ত মূল দুই আসামিসহ পাঁচজনকে দ্রুত গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত যে তথ্য এসেছে তাতে এটা স্পষ্ট, এ ঘটনার মূল হোতা অমি। সব অভিযুক্তকে আরও বিশদ জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, পরীমণি সংবাদ সম্মেলন ডাকার পর তিন নারীকে নিয়ে অমির বাসায় পালান নাসির। মাদক রাখার অভিযোগে ওই তিন নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নাসিরের বিরুদ্ধে আগেও মাদক ও নারী নির্যাতনের মামলা রয়েছে। নানা অভিযোগে তাকে উত্তরা ক্লাব থেকে বহিস্কার করা হয়েছে বলে জেনেছি।

কী ঘটেছিল সেই রাতে
ধর্ষণ, হত্যাচেষ্টা ও হুমকির অভিযোগে সাভার মডেল থানায় সোমবার অভিযোগ দায়ের করেন পরীমণি। মামলায় উত্তরা ক্লাবের সাবেক সভাপতি নাসির উদ্দিন মাহমুদ, অমিসহ ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে। পরীমণি এজাহারে লিখেছেন, ৮ জুন রাত সাড়ে ১১টার দিকে তার বনানীর বাসা থেকে কস্টিউম ডিজাইনার জিমি, অমি, বনিসহ দুটি গাড়িযোগে উত্তরার উদ্দেশে রওনা হন। পথে অমি বলে, বেড়িবাঁধের ঢাকা বোট ক্লাবে তার দুই মিনিটের কাজ আছে। অমির কথামতো তারা ঢাকা বোট ক্লাবের সামনে গাড়ি থামান। তবে বোট ক্লাব বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অমি এক ব্যক্তির সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বললে সিকিউরিটি গার্ডরা গেট খুলে দেয়।

পরীমণি বলেছেন, তখন অমি অনুরোধ করেন, সেখানকার পরিবেশ সুন্দর; চাইলে নামা যাবে। এরপর পরীমণি ও তার সঙ্গীরা ঢাকা বোট ক্লাবে ঢুকে টয়লেট ব্যবহার করেন। টয়লেট থেকে বের হওয়ার পরপরই নাসির উদ্দিন মাহমুদ তাদের ডেকে বারের ভেতরে বসার অনুরোধ করেন এবং কফি খাওয়ার প্রস্তাব দেন। বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাইলে নাসির ও অমি তাদের মদপান করার জন্য জোর করেন। মদপান করতে না চাইলে ১ নম্বর আসামি জোর করে পরীমণির মুখের মধ্যে মদের বোতল ঢুকিয়ে মদ খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। এতে পরীমণি সামনের দাঁত ও ঠোঁটে আঘাত পান। এ সময় নাসির তাকে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করতে থাকেন। শরীরের বিভিন্ন স্থানে স্পর্শ করেন এবং ধর্ষণের চেষ্টা চালান।
একপর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে টেবিলে রাখা গ্লাস ও মদের বোতল ভাঙচুর করে অভিনেত্রীর গায়ে ছুড়ে মারা হয়। তখন কস্টিউম ডিজাইনার জিমি আসামিকে বাধা দিতে চাইলে তাকেও মারধর করা হয়।

ওই সময় ৯৯৯-এ কল করতে গেলে পরীমণির মোবাইল ফোনটি টান মেরে ফেলে দেয়া হয়। অমিসহ অজ্ঞাতনামা চারজন এতে নাসিরকে সহায়তা করেন। পরীমণি তার সঙ্গীদের সহায়তায় ধর্ষকের হাত থেকে রক্ষা পান। রাত ৩টার দিকে তিনি গাড়িযোগে প্রায় অচেতন অবস্থায় সঙ্গীদের সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে ফিরে আসেন। আসামিরা বিভিন্ন মাধ্যমে তাকে ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করছেন।

এজাহারে পরীমণি আরও লিখেছেন, অমি পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাকে বনানীর বাসা থেকে ঢাকা বোট ক্লাবে নিয়ে যান।

কে এই নাসির উদ্দিন মাহমুদ
দায়িত্বশীল সূত্র মতে, নাসির উদ্দিন মাহমুদ ঢাকা বোট ক্লাবের সদস্য। তিনি প্রায় চার দশক ধরে ডেভেলপার ব্যবসায় যুক্ত রয়েছেন। কুঞ্জ ডেভেলপার্স লিমিটেডের চেয়ারম্যানের পদেও আছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সয়েল, ওয়াটার অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট বিভাগে পড়াশোনা করেন। তার প্রতিষ্ঠান সরকারের গণপূর্ত অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (ইইডি), রাজউক, রেলওয়েসহ সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারি কাজ করে। তিনি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কনস্ট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রির (বিএসিআই) সাবেক সদস্য। তিনি ২০১৫, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে উত্তরা ক্লাবের সভাপতি এবং লায়ন ক্লাবের ঢাকা জোনের চেয়ারম্যান ছিলেন। এছাড়াও নাসির জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রেসিডিয়াম সদস্য। গত ডিসেম্বরে জাপার নবম কাউন্সিলে তিনি দলটির এই পদ পান।

সোমবার উত্তরার ১ নম্বর সেক্টর থেকে গ্রেপ্তারের পর গাড়িতে তোলার সময় নাসির সাংবাদিকদের কাছে নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেন।

তিনি বলেন, ‘ঘটনার রাতে তিনি যখন ক্লাব থেকে বের হন, তখন পরীমণি ও তার বন্ধুরা ক্লাবে ঢোকে। তারা তখন মদ্যপ অবস্থায় ছিল। তাদের মধ্যে একটি ছেলে উচ্ছৃঙ্খল ছিল। ক্লাবে ঢোকার পর বারের কাউন্টার থেকে বড় বড় ও দামি মদের বোতল জোর করে নেয়ার চেষ্টা করে তারা। তখন আমি তাদের কাছে গিয়ে বলি, আপনারা ড্রিংকসগুলো নিতে পারেন না। আমি তাদের বাধা দিই। তারপর আমি আমার সিকিউরিটিদের ডাক দিই। নিরাপত্তারক্ষীরা এসে তাদের নিয়ে যায়।’

অমির উত্থান
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অন্য একাধিক সূত্র জানায়, ক্লাবপাড়ায় অমিও একজন পরিচিত মুখ। তার বাবা তোফাজ্জল হোসেন একসময় বিদেশে ছোটখাটো চাকরি করতেন। এরপর দেশে ফিরে ব্যবসা শুরু করেন। তবে সংসারে ভাগ্য ফিরে যখন ছেলে অমি আশকোনায় তাদের সিঙ্গাপুর ট্রেনিং সেন্টার নামে একটি প্রতিষ্ঠানের হাল ধরেন। এই প্রতিষ্ঠানের আড়ালে নারী পাচার করেই প্রচুর অর্থ কামান তারা। বিত্তশালী ও তাদের বখে যাওয়া সন্তানদের বিপথে নিতে অমির জুড়ি নেই। ঢাকার উত্তরা ও আশকোনায় তাদের একাধিক বাড়ি ও প্লট রয়েছে। ওই এলাকায় এক নামে তাকে সবাই চেনেন। শত শত কর্মী বিদেশে পাঠিয়ে ও প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকার মালিক হন অমি। বিদেশে কর্মী পাঠানোর সূত্র ধরে সাবেক এমপি কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলের সঙ্গে অমির পরিবারের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। অমিদের একাধিক আলিশান বাড়িতে রয়েছে সুইমিংপুলও। তাদের গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জ। সেখানে অনেক সম্পদ গড়েছেন। মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোমও গড়েছেন অমি। দক্ষিণখানে একটি রিসোর্টের আড়ালে প্রায় প্রতিদিন মদ-জুয়ার আসর বসাতেন তিনি। ওই রিসোর্ট তার ‘রঙশালা’ নামে পরিচিত।

বোট ক্লাবের দৃশ্যপট
সোমবার আশুলিয়ায় গিয়ে দেখা যায়, তুরাগ নদের পাড়েই ঢাকা বোট ক্লাব। তার উল্টো পাশে মেট্রোরেলের স্টেশন। ক্লাবের সামনে ছিল পুলিশ-র‌্যাবের সতর্ক অবস্থান।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মামলা হওয়ার পরপরই সাভার থানা পুলিশের একটি দল ক্লাব পরিদর্শন করে। ক্লাবের নির্বাহী কমিটির সদস্য (অ্যাডমিন) বখতিয়ার আহমেদ খান বলেন, অভিযুক্ত নাসির ক্লাবের একজন সদস্য। তাদের ক্লাবে প্রায় দুই হাজার সদস্য রয়েছেন। পরীমণি এ ক্লাবের সদস্য নন। তিনি কোনো সদস্যের সঙ্গে অতিথি হিসেবে এসেছিলেন। ওইদিন পরীমণি এসেছিলেন, এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে ঠিক কী ঘটেছে, তা বলতে পারছি না। এখানে একটা লাইসেন্সড বার রয়েছে। সদস্যদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার জন্য বারের ভেতরে কোনো সিসি ক্যামেরা রাখা হয়নি।

সোমবার এক বিবৃতিতে ঢাকা বোট ক্লাব জানায়, ‘বারে ছোটখাটো ঘটনা ঘটে। অনেক সম্মানিত সদস্য হয়তো স্বাভাবিকের চেয়ে এক পেগ বেশি ড্রিংক করে স্বাভাবিক অবস্থায় থাকেন না। তখন তাদের আমাদের লোকজন সম্মানের সঙ্গে গাড়িতে তুলে দেন। ওইদিনের ঘটনাকে বারের লোকজন হয়তো এ রকম একটা ঘটনা মনে করেছিলেন।’ তবে বিভিন্ন মিডিয়ায় সংবাদ দেখে আমরা বুঝতে পারলাম, এটা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা ছিল না। তবে তা ক্লাবের নির্দিষ্ট সময়ের পর বা রাত ১১টার পর ঘটেছে। ক্লাবের পক্ষ থেকে তদন্ত করা হচ্ছে।

বিবৃতিতে দুঃখ প্রকাশ করে বলা হয়, ‘এ ঘটনা ক্লাবের ভাবমূর্তির সঙ্গে যায় না।’

এদিকে সোমবার বোট ক্লাব থেকে নাসির, অমি ও শাহ আলমকে বহিস্কার করা হয়েছে।

এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, বোট ক্লাব কর্তৃপক্ষ অনেকের জমি দখল করে রেখেছে। বিরুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান সুজন সাংবাদিকদের বলেন, ‘জমিজমা অনেকটাই জোর করে নিয়েছে ঢাকা বোট ক্লাব। সেখানে আমার নিজেরও ৭৭ শতাংশ সম্পত্তি রয়েছে।’

রোববার রাত থেকে পরীমণির বনানীর বাসার সামনে পুলিশি নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে। সোমবার বিকেলে তার বাসার সামনে গিয়ে পুলিশ একটি দলকে ডিউটি পালন করতে দেখা যায়।

পুলিশের গুলশান বিভাগের ডিসি সুদীপ কুমার চক্রবর্ত্তী বলেন, পরীমণি নিরাপত্তাহীনতার কথা বলেছেন। তাই পুলিশ মোতায়েন করা হয়। তার সঙ্গে যোগাযোগও রাখছেন পুলিশ সদস্যরা।

যে কারণে সামনে এলো
একাধিক সূত্র জানায়, নাসির ও অমির সিন্ডিকেট আগেও অনেক নারীর ওপর একই ধরণের নিপীড়ন চালিয়েছে। তবে নানা ভয়-ভীতি ও প্রলোভন দিয়ে তাদের মুখ বন্ধ রাখা হয়। এবারও তাদের বিশ্বাস ছিল, পরীমণির ঘটনা তারা ধামাচাপা দিতে পারবেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় অভিনেত্রী এটা ফাঁস করবেন- এমনটা কল্পনায়ও ছিল না তাদের। প্রভাবশালী মহলকে ব্যবহার করে পরীমণির মুখ বন্ধ করার ষড়যন্ত্র করেও সফল হয়নি এই সিন্ডিকেট। এতেই দীর্ঘদিনের কুকর্ম সামনে এলো।
সুত্র : সমকাল

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!