দেশে অনলাইন জুয়া : পাওয়া গেল বিস্ময়কর তথ্য

দেশে অনলাইন জুয়া : পাওয়া গেল বিস্ময়কর তথ্য

ডেস্ক রিপোর্ট
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

ভয়ঙ্কর অনলাইন জুয়া। দেশের বিভিন্ন জেলায় ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে এই জুয়া। যার মধ্যে একটি জেলাতেই দিনে তিন থেকে পাঁচ কোটি টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অবৈধভাবে লেনদেন হয়ে থাকে। জুয়ার এই সাইটটি সুদূর রাশিয়া থেকে নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালিত হওয়ায় এসব অর্থ চলে যায় দেশের বাইরে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) দেশের বিভিন্ন জেলায় ইতোমধ্যে পৃথক অভিযান পরিচালনা করে গত শনিবার মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা ও কক্সবাজার থেকে ৯ জুয়াড়িকে গ্রেপ্তার করেছে।

রোববার দুপুরে মালিবাগে সিআইডির সদরদপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি কামরুল আহসান।

তিনি বলেন, চলমান টি-টোয়েন্টি আইপিএল, বিশ্বকাপ, বিগব্যাশ, ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগের ম্যাচগুলোকে কেন্দ্র করে চলে অনলাইনে জুয়ার আসর। অনলাইন জুয়ার নামে এভাবে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়। চক্রের মূল হোতা মো. মাহফুজুর রহমান নবাব নিজেই একটি এজেন্ট সিম চালায়। তার রেফারেন্সে পরবর্তীতে অসংখ্য জুয়ার এজেন্ট যুক্ত হয়েছে। এছাড়া অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফরম ওয়ান এক্সবেট পরিচালনাকারী চক্রের অন্য সদস্যরা হলেন স্বপন মাহমুদ, নাজমুল হক, আসলাম উদ্দিন, মুরশিদ আলম লিপু, শিশির মোল্লা, নবাবের স্ত্রী মনিরা আক্তার মিলি, মো. সাদিক এবং মাসুম রানা। তাদের প্রত্যেকের বয়স ২৫ থেকে ৩৮ বছরের মধ্যে।

এ সময় তাদের কাছ থেকে ১৬টি মোবাইল ফোন, তিনটি মোবাইল সিম, একটি ল্যাপটপ, একটি প্রাইভেটকার ও নগদ চার লাখ ১০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়।

অতিরিক্ত ডিআইজি কামরুল আহসান বলেন, চুয়াডাঙ্গা জেলায় ইতিমধ্যে ৫০ জন মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। এই নম্বরগুলো থেকে প্রতিদিন অনলাইন জুয়ার টাকা লেনদেন হচ্ছে। এরমধ্যে অন্তত ১৫টি নম্বরে দিনে ১০ লাখ টাকার ওপরে লেনদেন করছে জুয়াড়ি চক্র।

তিনি জানান, গ্রেপ্তারকৃত স্বপনের সিম থেকে প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা, লিপুর সিম থেকে প্রতিদিন গড়ে ১০ লাখ টাকা ও নবাবের সিম থেকে প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা লেনদেন হতো। পরে এই টাকা হুন্ডি বা অবৈধ ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়। চলতি বছরের মাঝামাঝি সময় সিআইডির নিয়মিত মনিটরিংয়ে অনলাইন জুয়ার এই বেটিং সাইটটি নজরে আসে। এই সাইটটি মূলত রাশিয়া থেকে পরিচালিত হয়। দেশের একটি জেলায় এখন পর্যন্ত ৫০ জন এজেন্টের তথ্য পাওয়া গেছে। সারাদেশের চিত্র জানতে কাজ করছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ। দিনে একটি বেটিং সাইটে এক থেকে দেড় লাখ ব্যক্তি এই জুয়ায় অংশ নেয়।

এই সিআইডি কর্মকর্তা বলেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এজেন্ট সিমসহ স্বপন মাহমুদ ও মুরশিদ আলম লিপুকে মেহেরপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে স্বপন জানান, তিনি এজেন্ট সিমটি আসলাম উদ্দিনের কাছ থেকে সংগ্রহ করে জুয়ার এজেন্ট হিসেবে কাজ করছিলেন। এ জন্য জুয়াড়ি আসলামকে তিনি প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে টাকা দিতেন। মুরশিদ আলম লিপু তার বোন জামাইয়ের দোকানের একটি ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এজেন্ট সিমটি সংগ্রহ করে জুয়ার এজেন্ট হিসেবে কাজ করছিলেন। মেহেরপুরে ওই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের কয়েকজন এসআর ও সেখানকার ডিপো ম্যানেজার তাদের এই কাজের সঙ্গে সরাসরি জড়িত বলে জানান তিনি।

অতিরিক্ত ডিআইজি কামরুল বলেন, জুয়া খেলতে ইচ্ছুক একজন জুয়াড়ি মোবাইল নম্বর এবং ই-মেইলের মাধ্যমে এই বেটিং সাইটে (অ্যাপ) অ্যাকাউন্ট খোলেন। ওই অ্যাকাউন্টের বিপরীতে একটি ই-ওয়ালেট তৈরি করে ব্যালেন্স যোগ করা হয়। ই-ওয়ালেট অ্যাকাউন্ট ওপেনকারী ব্যক্তিকে টাকা রিচার্জ করতে হয়। বেটিং সাইটে দেয়া মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নম্বরে টাকা পাঠানোর পর এই ই-ওয়ালেটে টাকা যুক্ত হয়। ন্যূনতম ১ হাজার টাকা ই-ওয়ালেটে প্রবেশ করাতে হয়। এরপর অ্যাকাউন্ট হোল্ডারকে পাসওয়ার্ড দেয়া হয়। সেই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে আগ্রহী ব্যক্তি জুয়া খেলেন। চক্রের মূল হোতা মাহফুজুর রহমান নবাব জুয়ার জন্য একটি এজেন্ট সিম ব্যবহার করেন। ওই এলাকায় এ কাজ তিনি শুরু করলেও পরবর্তীতে তার মাধ্যমে আরও বহু জুয়ার এজেন্ট যুক্ত হয়। সাদিক তার সহায়তাকারী। তার এজেন্ট নম্বরে যে টাকা আসতো তা জুয়ার ওয়েবসাইটে ডিপোজিট এবং টাকা তোলার কাজটি মূলত সাদিকই করতেন। এছাড়া মাসুম রানা তার মোবাইল নম্বর দিয়ে টেলিগ্রাম আইডি খুলে জুয়ার লোকজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। বিনিময়ে তিনি এজেন্টের কাছ থেকে কমিশন পেতেন। জুয়ার কাজে জড়িত থাকায় চক্রের অন্যতম হোতা নবাব বাসা থেকে বের হতে পারতেন না। এমনকি তিনি কোথাও যেতেন না। এ জন্য স্বামীর হয়ে নবাবের স্ত্রী মিলি টাকা সংগ্রহ, ব্যাংকে টাকা জমাসহ বাইরের সব কাজ একাই করতেন। জুয়ার লেনদেনের কাজে ব্যবহৃত সব এজেন্ট সিমই সেখানকার মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এসআরের মাধ্যমে সম্পন্ন হতো। অনেক সময় জুয়ার এজেন্ট ও এসআরদের মধ্যে বিটুবির মাধ্যমে লেনদেন হলেও তাদের মধ্যে সরাসরি কোনো লেনদেন হতো না।

সারাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন জেলায় অনলাইন এই জুয়া চক্রের সদস্যদের ধরতে সিআইডির অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে মামলা শেষে বিস্তারিত তথ্য পেতে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানান এই সিআইডি কর্মকর্তা।

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!