দুর্ধর্ষ ‘মোসাদ’ বাবা!

দুর্ধর্ষ ‘মোসাদ’ বাবা!

আব্রাহাম দার। ইসরায়েলের এ বাসিন্দা সম্প্রতি ৯৪ বছর বয়সে মারা গেছেন। তিনি যে আর দশজন সাধারণ ইসরায়েলির মতো ছিলেন না, সেটা প্রকাশ হয়েছে তার মৃত্যুর পর। আব্রাহাম দার ছিলেন এই মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এজেন্ট। আবার পুরনো সিনেমাগুলোতে ছায়ায় লুকিয়ে থাকা গোয়েন্দাদের মতোও ছিলেন না তিনি। আব্রাহাম ছিলেন একাধারে রসিক, গল্পবাজ এবং তার স্বার্থ-বলয়ের লোকদের কাছে বন্ধুবৎসল। হিব্রু-আরবি-ইংরেজিসহ পাঁচটি ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারতেন তিনি। এমন চৌকস ছিলেন বলেই অনেক বিপদ থেকে রেহাই পেয়ে গেছেন তিনি। এমনকি নির্ঘাৎ মৃত্যুর ফাঁদ থেকেও বেঁচে বেরিয়ে আসেন আব্রাহাম।

এই গোয়েন্দার মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ইসরায়েলের প্রাচীন দৈনিক জেরুজালেম পোস্ট। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গোটা বিশ্বে ইসরায়েলের ভীতিকর গোয়েন্দা বলয় গড়ে তোলার পেছনের পথিকৃৎদের একজন ছিলেন এই আব্রাহাম। তিনি গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে যেসব গোপন অপারেশনে অংশ নিয়েছিলেন, সেসব ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতা মৃত্যুর আগ পর্যন্তই অস্পষ্ট বা অপ্রকাশিত থেকে গেছে।

আব্রাহামের জন্ম ১৯২৫ সালে। তখন ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ছিল না। বিশেষত ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে থাকত ইহুদিরা। তার বাবা ছিলেন ইয়েমেনি ইহুদি পরিবার থেকে বেড়ে ওঠা ব্রিটিশ সামরিক কর্মকর্তা। মা ছিলেন জেরুসালেমের এক ইহুদি ঘরের মেয়ে। শৈশব থেকেই সব ধরনের সংস্কৃতির প্রতি আব্রাহামের অনুরাগ ছিল। সেই আগ্রহেই তিনি হিব্রু, আরবি, ইংরেজি, ফরাসি ও স্প্যানিশ ভাষা রপ্ত করে ফেলেন মাতৃভাষার মতোই।

তার ছেলে গিদি দার বলছিলেন, ‘কেউ কখনো ধারণাও করতে পারেনি যে তিনি একজন গোয়েন্দা ছিলেন। তিনি ছিলেন অসম্ভব প্রতিভাবান মানুষ। যার সঙ্গে তিনি মিশতেন, তার মতো করেই মিশে যেতে পারতেন বাবা। তিনি যদি কোনো আরবের সঙ্গে মিশতেন, তবে তার আচার-আচরণও হয়ে যেত আরবের মতোই। তিনি যদি কোনো ইংরেজের সঙ্গে কথা বলতেন, তবে যুক্তরাজ্যের বাসিন্দারা যে বাচনভঙ্গিতে কথা বলে বা চলে, তাদের মতোই বলতে পারতেন, চলতে পারতেন। ইউরোপিয়ান সংস্কৃতিতে বড় হয়েও তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন আরব-ইহুদিদের সংস্কৃতির মানুষ হিসেবে।’

‘শৈশবে আমার বাবার বন্ধুরা ছিলেন কুর্দি, ইংরেজ ও আরব। সবাই তার বুদ্ধিমত্তার তারিফ করতো। বন্ধুদের মধ্যে সবার আগে তিনি বিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করেন। এ সময় যাদের সঙ্গে মিশতেন, তাদের সঙ্গে নানা রকমের কৌশলী খেলা খেলতেন তিনি। সবসময় তার মধ্যে কৌতূহল কাজ করতো’- বলেন গিদি।

আব্রাহাম-পুত্র বলছিলেন, ‘কর্মজীবন নিয়ে আমার বাবা অনেক গল্প করতেন। যেমন একটা গল্প ছিল এমন; তখন ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল ইসরায়েলের এ ভূখণ্ড। আমার দাদাকে ব্রিটিশদের একটি অস্ত্রাগারের পাহারাদার হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়। তখন ওই অস্ত্রাগারের আশপাশে ঘোরাঘুরি করতেন আমার বাবা। তাকে ব্রিটিশ সেনারা দেখলে তিনি বলতেন, নষ্ট ওয়াকি-টকি খুঁজতে এসেছি। পরে তিনি (চুরি করে) ইরগুনদের (ইহুদীবাদী গেরিলা) সেসব ওয়াকি-টকি দিয়ে দিতেন। একবার এভাবে (চুরি করে) ওয়াকি-টকি ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে যাওয়ার সময় ইরগুনদের গাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। যখন এই মহাবিপদ, তখন উল্টো আমার বাবা ব্রিটিশ সেনাদের ইংরেজেদের ভাষায় বুঝিয়ে তাদেরই দিয়ে সেই গাড়ি মেরামত করিয়ে নেন।’

‘পরে যখন ব্রিটিশ সেনারা তাদের ওয়াকি-টকিসহ সরঞ্জাম চুরির তদন্ত শুরু করলো, আমার দাদা সেই তদন্তকারীদেরই সামনে বাবাকে চড় মারলেন। বাবা যখন দাদার কাছে এর হেতু জানতে চাইলেন, দাদা বললেন যে, এ কারণেই ব্রিটিশরা ধরে নিয়েছে যে তিনি (দাদা) ওয়াকি-টকি চুরির ব্যাপারে কিছু জানতেন না। ক’দিন পরে আরবদের গ্রামে গিয়ে তারা (বাবা-দাদা) কিছু ডিভাইস রেখে আসেন এবং ব্রিটিশদের সেখানেই খুঁজতে বলেন। পরে ব্রিটিশরা ওইসব ডিভাইস দেখে এসে দাদার কাছে (তাকে সন্দেহ করার জন্য) ক্ষমা চান।’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একপর্যায়ে ইসরায়েলকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয় পশ্চিমারা। তখন ইহুদিদের কর্মকাণ্ডের কারণে আরব অঞ্চলে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই অবস্থায় মিশর সাগরপথে ইসরায়েল আক্রমণ করতে পারে বলে খবর ছড়ালে আব্রাহাম গোপন তথ্য যাচাইয়ে বের হন। কিন্তু তিনি সাইপ্রাসে গিয়ে ধরা পড়ে যান। বন্দিদশায়ও তিনি তার ‘মিশন’ বলতে অস্বীকার করলে রাইফেলের বাট দিয়ে তার দাঁত ভেঙে দেয়া হয়। আব্রাহাম কোনো মতে সেখান থেকে পালিয়ে ব্রিটিশ বেশ ধরে ইসরায়েলে ফিরে আসেন। সেসময় তিনি ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষকে জানান যে, এই মুহূর্তে মিশরের ইসরায়েল আক্রমণের কোনো ঝুঁকি নেই।

আরেকটি গল্প এমন; আব্রাহাম তখন ইহুদিবাদী গেরিলা গোষ্ঠী হাগানার অভিজাত বাহিনী পালমাচের দায়িত্বে। তৎকালীন ইহুদিদের ভূ-খণ্ডের কিবাৎস ইয়াগুর এলাকায় এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন তিনি। কট্টর ইহুদিবাদীদের চোরাগোপ্তা হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ওই অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হলে অভিযানে যায় ব্রিটিশ বাহিনী। আব্রাহাম তখন বন্ধুর বাড়িতে ঘুমাচ্ছিলেন। এক স্কটিশ সৈন্য সেখানে ঢুকে তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে। আব্রাহাম তখন ব্রিটিশ সৈন্যের ভাব ধরে সেখান থেকে পালিয়ে বাঁচেন। সেজন্য তাকে পরিচিত মহলে প্রায়ই শুনতে হতো, তিনি ইসরায়েলের এজেন্ট না হলে নির্ঘাৎ ক্রিমিনাল হতেন।

১৭ বছর বয়সে পালমাচে ঢোকার পর ২৫ বছর বয়সে আব্রাহাম ইসরায়েলি গোয়েন্দা বাহিনীতে যোগ দেন। ইসরায়েলের চোরাগোপ্তা কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তখন প্রতিরোধশক্তি হিসেবে কাজ করছিল মিশরের ফেদায়িন। এই গোষ্ঠী আবার ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধাচরণও করতো বলে জানা যায়। সেই ফেদায়িন ইসরায়েলের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠলে ওই সংগঠনটির অনেক সদস্যকে গোপনে হত্যার অভিযানে নামে ইসরায়েলি গোয়েন্দারা। এসব খুনের অনেক অপারেশনে জড়িত ছিলেন আব্রাহাম।

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর বিশেষায়িত গোয়েন্দা ইউনিট ‘সায়েরেত মাতাকাল’ (১৯৫৭) প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অগ্রণী ভূমিকায়। এই ভূমিকায় থাকাকালে প্রচুর গোপন অপারেশনে অংশ নেন আব্রাহাম। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সেসময়কার সবচেয়ে বলিষ্ঠ শক্তি মিশরে গুপ্তচর নেটওয়ার্ক গড়ে চালান একের পর এক অপারেশন। এর মধ্যে ব্যর্থ ‘ল্যাভন অ্যাফেয়ার’ অপারেশনও ছিল। ১৯৫৪ সালে ‘সুসানাহ’ কোড নামের ওই অপারেশন চালানো হয়েছিল মিশরীয়-আমেরিকান ও ব্রিটিশ নাগরিকদের হত্যা করে ইসরায়েলবিরোধী মুসলিম ব্রাদারহুডের ওপর দোষ চাপাতে। সেই অপারেশনের তথ্য ফাঁস হয়ে গেলে অনেক এজেন্ট অভিযানকালেই প্রাণ হারায়। অনেককে ধরে পরে মৃত্যুদণ্ড দেয় মিশর। এই অভিযানের দায় নিয়ে তখন পদত্যাগ করতে হয় ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিনহাস ল্যাভনকে।

ওই ব্যর্থ অভিযানের জন্য জড়িত সবাইকে পরিণতি ভোগ করতে হলেও পালিয়ে বেঁচে যান কেবল আব্রাহামই। সেসময় বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য তার দায়িত্ব ছিল গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। সেক্ষেত্রে তিনি সফল বলে মনে করেন তার নিকটজনেরা।

জানা যায়, ‘সুসানাহ’ অপারেশনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে আব্রাহাম ব্রিটেনে গিয়ে একটি ভুয়া পরিচয় গড়ে তোলেন। সাজেন জিব্রাল্টারে জন্ম নেয়া জন ডার্লিং। এই পরিচয়ে তিনি মিশরে গিয়ে গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন। সেখানে তিনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অন্যতম বড় প্রতিরোধ শক্তি ব্রাদারহুডেরই কয়েকজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন। যখন একজন তাকে সন্দেহ করে ফেললো, তখন ধরা পড়েও আব্রাহাম নিজেকে ব্রিটিশ গোয়েন্দা হিসেবে পরিচয় দেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই নেটওয়ার্কের তথ্য চাপা থাকেনি। পালিয়ে বাঁচেন আব্রাহাম।

ইসরায়েলে ফেরার পর তিনি আরও দু’টি গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। তখন তাকে মোসাদের সবচেয়ে প্রভাবশালী ‘ইউনিট ১৩১’র দায়িত্বভার নেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়। যদিও তিনি সেসময় তা ফিরিয়ে দেন।

গিদি দারের মতে, ‘তিনি কখনো মার-কাট পদ্ধতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না। সবসময় গল্প ফেঁদে অপারেশন চালানো পছন্দ করতেন। সেজন্য অনেক কঠিন পরিস্থিতিও উতরে যেতে পারতেন তিনি। ফেদায়িনদের নেতা মুস্তাফা হাফিজের বিরুদ্ধে বহুবার গোপন অভিযান চললেও সফল হন আব্রাহামই। হাফিজের বাহিনী যখন সীমান্তে ইহুদিদের প্রতিরোধ করে যাচ্ছিল, তখন তাদের শায়েস্তা করতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অ্যারিয়েল শ্যারনের নেতৃত্বাধীন ১০১ ইউনিট হাফিজকে হত্যা প্রধানতম লক্ষ্য হিসেবে নেয়। কিন্তু বারবারই তারা ব্যর্থ হয়।’

এই ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ নিজে পেতে সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বের কাছে আবেদন করেন আব্রাহাম। অনুমতি পাওয়ার পর আব্রাহাম এক বেদুইন (যাযাবর আরব) ডাবল এজেন্টের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়েন। তার সঙ্গে আলাপে একটি গল্প ফাঁদেন। বলেন যে, মিশর-নিয়ন্ত্রিত গাজার (তৎকালীন) পুলিশ প্রধান ইসরায়েলের হয়ে কাজ করছেন। আব্রাহাম ওই বেদুইনকে খবরটি দিয়ে একটি বইয়ের ভেতরে কথিত ‘কোড’ রেখে সেটি গোপন রাখতে বলেন। এই গল্পকে সত্যি ধরে নিয়ে বেদুইন এজেন্ট ছুটে যায় হাফিজের কাছে। হাফিজ সেই কোড বোঝার জন্য বইটি খুলতেই তা বিস্ফোরিত হয়। প্রাণ হারান ইসরায়েলের ‘পথের কাঁটা’ হাফিজ ও তার সঙ্গে থাকা আরও ক’জন ফেদায়িন সদস্য। একই ধরনের বোমা বিস্ফোরণে জর্দানে থাকা ফেদায়িনদের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতাও প্রাণ হারান।

ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ডে ইসরায়েলের গেঁড়ে বসার সময়ে এমন ভূমিকা আব্রাহামকে বসিয়েছে ইহুদি রাষ্ট্রটির ‘জাতীয় বীরে’র আসনে। আড়ালে আব্রাহাম এমন বিপজ্জনক সব অপারেশন চালালেও প্রকাশ্যে থাকতেন গ্রামে। সেজন্য অনেকে তাকে কৃষক মনে করতো। কে জানতো, কৃষক বেশে থাকা সেই আব্রাহামের হাত ধরেই বিশ্বজুড়ে শেকড় ছড়াবে আজকের দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ!

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!