ঝমাঝম শব্দে রেলগাড়ি আসছে কক্সবাজার

ঝমাঝম শব্দে রেলগাড়ি আসছে কক্সবাজার

ডেস্ক রিপোর্ট
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

২০২৩ সালের জুনের মধ্যেই ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালু সম্ভব হবে। প্রথম পর্যায়ের এই কাজ শেষ হলে শুরু হবে কক্সবাজার থেকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ঘুমধুম পর্যন্ত রেললাইন বসানোর দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ, যার দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ২৯ কিলোমিটার। কোথাও চলছে সেতুর কাজ, কোথাও লেভেল ক্রসিং, আবার কোথাও মহাসড়ক ক্রসিংয়ের কাজ। কোনো কোনো জায়গায় এরই মধ্যে শেষ হয়েছে ছোট-বড় সেতুসহ রেললাইন বসানোর কাজ। ঝিনুক আকৃতির আইকনিক স্টেশনসহ ছয়টি স্টেশনের কাজ চলছে দ্রুতগতিতে। দম ফেলার ফুরসত নেই।

এই দৃশ্যের দেখা মিলবে চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত প্রায় ১০১ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে।

দিন-রাত এক করে কাজ করছেন প্রকল্পের শ্রমিকরা। করোনা মহামারির কারণে কাজ কিছুটা ধীরে এগোলেও এখন চলছে পূর্ণগতিতে। চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত শেষ হয়েছে ৬৫ শতাংশ কাজ।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের আশা, ২০২৩ সালের জুনের মধ্যেই ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালু সম্ভব হবে। যদিও কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২২ সালের মধ্যে। পরে মেয়াদ ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাড়লেও বাড়েনি খরচ। প্রথম পর্যায়ের এই কাজ শেষ হলে শুরু হবে কক্সবাজার থেকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ঘুমধুম পর্যন্ত রেললাইন বসানোর দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ, যার দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ২৯ কিলোমিটার।

আশা করা হচ্ছে, প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হলেই কক্সবাজারের সঙ্গে সারাদেশের যোগাযোগব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি ঘটবে। এতে পর্যটক ও স্থানীয় জনগণের যাতায়াত হবে আরও আরামদায়ক, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী। সহজে ও কম খরচে মাছ, লবণ, রাবারসহ যেকোনো ধরণের কাঁচামাল এবং বনজ ও কৃষিপণ্য পরিবহন সম্ভব হওয়ায় সেখানকার অর্থনীতিতে উন্মোচন হবে এক নতুন দিগন্তের। পাশাপাশি ব্যাপক প্রসার ঘটবে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতকেন্দ্রিক পর্যটন শিল্পেও। বাড়বে সরকারের রাজস্ব আয়ও।

রেলপথটি মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে নির্মাণাধীন গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগের পথও সুগম করবে। প্রকল্পের পুরো কাজ শেষ হলে বাংলাদেশের রেলপথ যুক্ত হবে মিয়ানমারের সঙ্গে। তখন এ পথই বাংলাদেশকে যুক্ত করবে ২৭টি দেশের ট্রান্স-এশিয়ান রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সাঙ্গু, মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদীর বুকে নির্মাণ হচ্ছে বড় তিনটি সেতু। যদিও এ পথে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট সেতু হবে ২৫টি। আর সাতকানিয়ার কেঁওচিয়ায় হচ্ছে একটি উড়াল সেতু। চলতি বছরে রামুর পানিরছড়া বাজার হয়ে কক্সবাজারমুখী রেলপথ স্থাপনের কাজ শুরু হয়। এরই মধ্যে কক্সবাজারের ঈদগাঁও উপজেলায় তিন কিলোমিটারসহ মোট সাত কিলোমিটার রেল ট্র্যাক স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। রামু উপজেলার রশিদনগর ইউনিয়নের কিছু এলাকাসহ এ প্রকল্পে ১২ কিলোমিটারে বসেছে রেলের স্লিপার ও পাত। এ পথের দুই ধারেই রোপণ করা হয়েছে সারি সারি গাছ। দোহাজারীতে তিন কিলোমিটার রেলপথে বসানো হয়েছে সিগন্যাল কেব্ল।

প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মাইলের পর মাইল সবুজ মাঠের ভেতর দিয়ে পিঁপড়ার সারির মতো জেগেছে রেলপথ। কোথাও আবার পাহাড় ভেদ করে বসছে রেলের পাত। লোকালয়ের কিছু এলাকায় এখনও রেলের পাত না বসলেও শেষ হয়েছে মাটি ফেলার কাজ।

নিজ এলাকায় রেলপথ হওয়ায় ভীষণ খুশি রামুর রশিদনগরের বাসিন্দা রমজান আলী। তিনি বলেন, ‘আমাদের এলাকায় রেললাইন ছিল না। এই এলাকায় যখন রেললাইন দৃশ্যমান, দূরদুরান্ত থেকে মানুষ আসে তা দেখার জন্য। রেললাইন যেন এখন বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে উৎসবের দিনে লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়।’

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক মো. মফিজুর রহমান বলেন, ‘২০২৩ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্প কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। যদিও প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ের কাজের মেয়াদ আছে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। ২০২৩ সালের জুনে প্রকল্পের মূল কাজ শেষে আমাদের হাতে আরও এক বছর সময় থাকছে। সে সময়টাতে প্রকল্পটির কাজে কোনো ত্রুটি দেখা দিলে তা বিনা খরচে মেরামত করবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।’

তিনি বলেন, এই প্রকল্পের আওতায় মোট ৯টি স্টেশন হবে। এগুলো হলো চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া, কক্সবাজারের চকরিয়া, ডুলাহাজারা, ঈদগড়, রামু, কক্সবাজার সদর, উখিয়া ও ঘুমধুম। এর মধ্যে ৬টির কাজ পুরোদমে চলছে। বাকি তিনটির কাজ শুরু হবে আগামী বছর।

প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘কক্সবাজারে ছয় তলাবিশিষ্ট যে আইকনিক রেলস্টেশনটি তৈরি হচ্ছে, সেটির দ্বিতীয় তলার কাজ শেষ। বর্তমানে তৃতীয় তলার কাজ চলছে।’

সরেজমিনে দেখা যায়, আইকনিক স্টেশনটি হবে এ রেলপথের সর্বশেষ স্টেশন, যেটি তৈরি হচ্ছে কক্সবাজার জেলা বাসস্ট্যান্ডের পেছনে চান্দেরপাড়া এলাকায়। প্রতিদিন এখানে কাজ করছেন ৩০০ শ্রমিক। স্টেশনটির উত্তর পাশে বালু ও মাটি ভরাটের কাজ চলছে। যেখানে তৈরি হবে প্ল্যাটফর্ম। এখান থেকে কক্সবাজার শহরের কলাতলীর দূরত্ব দুই কিলোমিটার।

স্টেশনটির পাশেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বানানো হচ্ছে আবাসিক ভবন। এরই মধ্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে কয়েকটি ভবন, যার কোনোটা পাঁচ তলা, কোনোটা ছয় তলা। চীনা প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে এসব ভবন তৈরিতে কাজ করছে ৫০০ শ্রমিক।

আইকনিক স্টেশনে রড বাঁধার কাজ করছেন চকরিয়ার সাদ্দাম হোসেন। তিনি বলেন, ‘শুনেছি এ স্টেশনের মধ্যে হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ওয়েটিং রুমসহ নানা সুবিধা থাকবে। এ রকম একটা জায়গায় কাজ করতে এসে আমারও ভালো লাগে। একসময় বলতে পারব এটি আমরাই বানিয়েছিলাম।’

মামুন হোসেন নামের আরেক নির্মাণশ্রমিক বলেন, ‘স্টেশনটির কাজ পুরোপুরি শেষ হলে বোঝা যাবে এর আসল সৌন্দর্য। সে সময় অনেকেই এটি দেখতে আসবেন।’

প্রকল্প শুরুর কথা
২০১০ সালের ৬ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেকে) অনুমোদন পায় প্রকল্পটি। ২০২২ সালের ৩০ জুন এটি শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হলেও করোনাভাইরাসের কারণে সময় দুই বছর বাড়ানো হয়েছে।

খরচ হবে যত
প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে আসছে ৪ হাজার ৯১৯ কোটি ৭ লাখ টাকা। বাকি ১৩ হাজার ১১৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে দেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। প্রকল্পটির প্রথম ধাপে যৌথভাবে কাজ করছে চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (সিআরইসি) ও বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশন। আর দ্বিতীয় ভাগে কাজ করবে চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি) ও দেশীয় প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড।

কক্সবাজার চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, ‘একটা অঞ্চলের অর্থনীতি নির্ভর করে সারাদেশের সঙ্গে ওই এলাকার যোগাযোগের ওপর। কক্সবাজারে যখন এই রেলপথ সচল হবে, তখন এখানকার অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ হবে।’

তিনি বলেন, ‘এখন এখানকার শাকসবজি, মাছসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য সড়কপথে ঢাকাসহ অন্যান্য জায়গায় যায়। এতে সময় যেমন বেশি লাগে, তেমনি খরচও পড়ে বেশি। ট্রেন চালু হলে নিরাপদে কম সময়ে এখানকার পণ্য দেশের বিভিন্ন জায়গায় যেতে পরবে। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন।
সুত্র: নিউজ বাংলা

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!