চট্টগ্রামে ছিলেন ‘শিবির ক্যাডার’, কক্সবাজারে এখন ‘নৌকার মাঝি’!

চট্টগ্রামে ছিলেন ‘শিবির ক্যাডার’, কক্সবাজারে এখন ‘নৌকার মাঝি’!

ডেস্ক রিপোর্ট
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে কক্সবাজারের রামু উপজেলার রশিদনগর ইউনিয়নের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন মোয়াজ্জেম মোর্শেদ। তিনি একসময় চট্টগ্রাম মহানগরে ‘দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার’ ছিলেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান নেতাকর্মীরা এ অভিযোগ এনেছেন। অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মোয়াজ্জেম মোর্শেদ। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তুমুল সমালোচনা শুরু হয়েছে।

চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি এ বিষয়ে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তার স্ট্যাটাসটি শতাধিক ব্যক্তি শেয়ারও করেছেন।

রনি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘চট্টগ্রাম কলেজে পড়াশোনা করার সময় ছিল শিবিরের দায়িত্বশীল নেতা। কলেজে ছাত্রশিবিরের রাজত্ব চলাকালে মাহমুদুল করিমকে (বর্তমান কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি) ধরে নিয়ে গিয়ে টর্চার সেলে চালায় নির্যাতন। কলেজ শিবিরমুক্ত হওয়ার পর চট্টগ্রাম থেকে পালিয়ে নিজ জেলা কক্সবাজারে ফিরে যায়। এরপরই দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার থেকে ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে পুনঃজন্ম হয়। সে পরিচয় গ্রহণের কয়েক বছরের মধ্যেই রামু উপজেলার একটি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচনের জন্য নৌকার মনোনয়ন পেয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, স্থানীয় নেতারা দু-চার বছরের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দেখে কাউকে পছন্দ হলে, তাকে বোন বিয়ে না দিয়ে নৌকার জন্য সুপারিশ করবে কেন?’

এ বিষয়ে নুরুল আজিম রনি বলেন, ‘মোয়াজ্জেম মোর্শেদ চট্টগ্রামের ভয়ংকর এক আতঙ্কের নাম। তিনি চট্টগ্রাম কলেজ ও মহানগরে শিবিরের দুর্ধর্ষ ক্যাডার হিসেবে পরিচিত। ওই ক্যাডারের হাতে একসময় নিয়মিত মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির লোকজন মার খেতো। তার অত্যাচারে সাধারণ শিক্ষার্থীরা কলেজেও যেতে পারতো না। তার নেতৃত্বে চট্টগ্রাম ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি মাহামুদুল করিমকে অপহরণ করে টর্চার সেলে নিয়ে অমানবিক নির্যাতন চালায় শিবির ক্যাডাররা। সেদিন ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ মোয়াজ্জেম মোর্শেদসহ তিনজন শিবির ক্যাডারকে আটক করেছিল। পুলিশের হাত থেকে ছাড়া পেয়েই চট্টগ্রাম থেকে পালিয়ে কক্সবাজার যায় ওই ক্যাডার।’

চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি মাহামুদুল করিম বলেন, আমি সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ২০১০ সালে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হই। সেসময় মোয়াজ্জেম মোর্শেদ চট্টগ্রাম কলেজ শিবিরের অন্যতম নীতিনির্ধারক ও ক্যাডার ছিলেন। আমি কলেজে ছাত্রলীগের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করার কারণে মোর্শেদ আমাকে কয়েক দফা সরাসরি হুমকি দেন। কিন্তু তার হুমকি না মানায় প্রথমে ২০১১ সালের জুলাইয়ে আমার ওপর হামলা করে তুলে নিয়ে আমার পা ভেঙে দেন। সেখানে আমাকে প্রচণ্ড মারধর করে বাবা-মায়ের ঠিকানা নেন। পরে আমার বাবা-মাকেও হুমকি দেন মোয়াজ্জেম মোর্শেদ। তাদের কারণে আমি নিয়মিত কলেজে যেতে পারতাম না।

তিনি বলেন, ২০১৩ সালের ২৯ অক্টোবর আমি পরীক্ষা দিতে গেলে বিকেল ৫টার দিকে আমাকে হল থেকে তুলে নিয়ে যায় মোয়াজ্জেম মোর্শেদ ও তার দলবল। প্রথমে আমাকে তারা তৎসময়ে নির্মাণাধীন স্টাফ ভবনে নিয়ে মারধর করেন। এরপর সেখানে লোক জমায়েত হতে শুরু করলে আমাকে সোহরাওয়ার্দী হলের তখনকার পরিত্যক্ত হিন্দু হোস্টলে নিয়ে আমার আঙুলের নখ তুলে নিয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় ফেলে রাখেন। পরে কয়েকটি থানার পুলিশ পুরো হল ঘেরাও করে আমাকে উদ্ধার করে। পাশাপাশি ঘটনাস্থল থেকে মোয়াজ্জেম মোর্শেদসহ তিনজনকে আটক করে পুলিশ।

মাহামুদুল করিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রশিদনগরে নৌকা প্রতীক পাওয়া মোয়াজ্জেম মোর্শেদই আমার ওপর হামলাকারী শিবির ক্যাডার। বিষয়টি কতটা দুঃখজনক বলে বুঝাতে পারবো না।

এদিকে একসময়ের শিবির ক্যাডার নৌকার মনোনয়ন পাওয়ায় ফেসবুকে তুমুল সমালোচনা শুরু হয়েছে। একসময় চট্টগ্রাম ছাত্রলীগের রাজনীতি করা ও বর্তমান কক্সবাজার শহর কৃষক লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহাদাত হোসাইন তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, ‘রামুর রশিদনগর ইউনিয়নের নৌকার মাঝি মোয়াজ্জেম মোর্শেদ সেদিন চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি মাহমুদুল হককে শিবিরের কর্মীদের নিয়ে হত্যাচেষ্টার উৎসবে মেতেছিল। আজ নৌকার মাঝি কেমনে হলো? ধিক্কার জানাই যারা তাকে নৌকার মনোনয়ন দিয়েছে তাদের ,,,।’

শিবির সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে রশিদনগরে নৌকার মনোনয়ন পাওয়া মোয়াজ্জেম মোর্শেদ বলেন, আমি ২০১০ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে বের হয়েছি। তাই এরপরে সেখানে কী হয়েছে আমার জানা নেই। আমি মাহামুদুল করিম নামের কাউকে চিনি না। ওই কলেজে কেউ মোর্শেদ নামে আমাকে চেনে না। সেখানকার সবাই আমাকে ‘জিনান’ নামে ডাকতো।

তিনি বলেন, কক্সবাজার কলেজে অনার্স পড়ার সময় আমি ছাত্রলীগ করেছি। কক্সবাজার ইন্টারন্যাশন্যাল ইউনিভার্সিটির ছাত্রলীগের প্রথম কমিটি আমার। ২০১৮ সাল থেকে বঙ্গবন্ধু আইন ও ছাত্র পরিষদের অ্যাডভোকেট নোমান ও নাজিম কমিটির কক্সবাজার জেলা সভাপতি আমি। কাজেই একটি মহল আমার জয় ঠেকাতে পরিকল্পিত অপপ্রচার চালাচ্ছে।

২০১১ সালে কক্সবাজার সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক ও পরবর্তী সময়ে কলেজ সভাপতি হিসেবে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা ওয়াহিদুর রহমান রুবেল বলেন, আমার দীর্ঘ দায়িত্বকালীন সময়ে ছাত্রশিবিরের সঙ্গে ছাত্রলীগের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এ সময় মোয়াজ্জেম মোর্শেদ জিনান নামে কেউ আমাদের কর্মী কিংবা নেতা ছিল না।

রামু উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল আলম মণ্ডল বলেন, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতারাই মোয়াজ্জেম মোর্শেদের নাম প্রস্তাব করে পাঠায়। সেটাই আমরা জেলা আওয়ামী লীগকে ফরোয়ার্ড করেছি। মোয়াজ্জেম নিজে এবং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতারা তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছেন বলে দাবি করেছেন। আমাদের যাছাই করার সুযোগ হয়নি। এখন বিতর্ক উঠে থাকলে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রামুর রশিদনগরের মনজুর মোর্শেদের ছেলে মোয়াজ্জেম মোর্শেদ ২০১৭ সালে কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আইন অনুষদে ষষ্ঠ ব্যাচের ছাত্র হিসেবে ভর্তি হন। তবে সেখানে তিনি কখনো ছাত্রলীগের রাজনীতি করেননি। কিন্তু জেলা ছাত্রলীগের নতুন কমিটি আসার পর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি এসএম সাদ্দাম হোসাইনকে খালাতো ভাই দাবি করে নিজেকে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সংযুক্ত করার চেষ্টা করেন।

মোয়াজ্জেমের ছাত্রলীগের রাজনীতি সম্পর্কে কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি এসএম সাদ্দাম হোসাইন বলেন, মোয়াজ্জেম মোর্শেদ আমার খালাতো ভাই নয়। আমার পাশের ইউনিয়নের ছেলে। আমি সভাপতি হওয়ার পর তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত হওয়ার চেষ্টা চালান। আমার নামে বিভিন্ন জায়গায় ব্যানার-ফেস্টুনও দেন। কিন্তু খবর নিয়ে জানতে পারি তিনি অতীতে কখনো ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন না। বরং শিবিরের ক্যাডার হিসেবে বিভিন্ন সময়ে কাজ করেছে বলে প্রমাণ পাই। পরে আমি তার সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেই। দলীয় প্রোগ্রামেও আসাও তার জন্য নিষিদ্ধ করি।
সুত্র : জাগোনিউজ

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!