খরুলিয়া যেন ‘দ্বিতীয় টেকনাফ’, অল্পদিনে ৩ খুন

খরুলিয়ায় মাদক বিক্রির টাকা নিয়ে বিরোধে যুবককে পিটিয়ে হত্যা

খরুলিয়ায় মাদক বিক্রির প্রতিবাদ করায় যুবককে পিটিয়ে হত্যা

নিজস্ব প্রতিবেদক
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

কক্সবাজার সদরের ঝিলংজা ইউনিয়নের খরুলিয়ায় একটি চিহ্নিত পরিবারের মাদক বেচাকেনার টাকার লেনদেনকে কেন্দ্র করে এক যুবককে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। হামলায় আহত হয়ে ৫ দিন মৃত্যু যন্ত্রণায় ভোগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার (১২ জুলাই) বেলা ১২টার দিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ওই যুবকের মৃত্যু হয়।

এর আগে গত ৭ জুলাই রাত ১১টার দিকে খরুলিয়া বাজারপাড়া গ্রামে সড়কের পাশ থেকে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করেন স্থানীয়রা। মারা যাবার আগে কারা তাকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে আহত করে সব জানিয়ে গেছেন নিহত জামাল উদ্দিন (৩৫)।

নিহত জামাল উদ্দিন খরুলিয়া বাজারপাড়া গ্রামের মৃত ফজল কবিরের ছেলে।

স্থানীয়দের দাবি, ঝিলংজা ইউনিয়নের খরুলিয়া এলাকাটি এখন ‘দ্বিতীয় টেকনাফ’ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই এলাকায় মাদককে কেন্দ্র করে ৩টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। জামাল উদ্দিন ছাড়াও মোরশেদ আলম ও বাংলাবাজার এলাকার নবী আলম এই হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন।

মৃত জামালের ভাই কামাল হোসেন ও বোন খুরশিদা জানান, চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় জামালের যখন জ্ঞান ফিরে আসে তখন কিভাবে সে আক্রান্ত হয়েছে তা বলেছে।

জামাল জানিয়েছেন, মাস দেড়েক আগে খরুলিয়া বাজারপাড়া এলাকার মাদক সম্রাট হিসেবে পরিচিত ইউসুফ আলীর ছেলে শওকত আলী পুতু তাকে টাকা পাচ্ছে বলে গালিগালাজ করে। এ নিয়ে বাকবিতণ্ডা এবং একপর্যায়ে হাতাহাতিও হয়। সেদিন জামালকে ধরে বেঁধে তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটিসহ আটক করে রাখার চেষ্টা চালায় পুতু। জামাল তাকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে চলে আসে। তারই জের ধরে ৭ জুলাই রাতে শওকত আলী পুতু, তার ভাই দেলোয়ার হোসেন, লিয়াকত, সাদ্দাম, ওসমান গণি ও দেলোয়ারের ছেলে মেহেদী মিলে জামালকে বাজার থেকে ধরে তাদের বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে সবাই মিলে লোহার রড ও হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে মাথা ও শরীর থেঁতলে দেয়।

তারা জানান, মারের ছুটে একসময় জামাল অচেতন হয়ে গেলে তাকে মৃত ভেবে জনচলাচলের রাস্তার পাশে ফেলে চলে যায়। এক টমটম চালক বাড়ি ফেরার পথে একজনকে রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে দেখে কাছে যান এবং জামালকে চিনতে পেরে ঘরে খবর দেন।

সুত্র মতে, পরিবারের লোকজন তাকে উদ্ধার করে প্রথমে রামু চা বাগান হাসপাতালে নেয়। সেখান থেকে তাকে চমেক হাসপাতালে রেফার করা হয়। তাড়াতাড়ি সুস্থ হবার আশায় তাকে পাঁচলাইশস্থ পার্কভিউ হাসপাতালে নেয়া হয়। কিন্তু সেখানে খরচ বেশি পড়ায় আর্থিক অনটনের কারণে জামালকে আবার কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে আসা হয় ১১ জুলাই। সেখানেই সোমবার বেলা ১২টার দিকে মারা যান জামাল উদ্দিন।

কামাল বলেন, মাদক ব্যবসায়ী ইউছুপের পরিবার উল্টো আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে থানায় একটি অভিযোগ দিয়েছে। সোমবার সদর থানার এক এসআই তা তদন্তে এসে আমার ভাইয়ের মৃত্যুর সংবাদ জেনে চলে গেছে।

তবে স্থানীয় বিশ্বস্ত কয়েকটি সুত্র জানিয়েছেন, নিহত জামাল উদ্দিন ওই এলাকার আরেকটি চিহ্নিত মাদক সিন্ডিকেটের হয়ে কাজ করতেন। ওই কাজ করতে গিয়ে হামলাকারি গ্রুপটির সাথে তার ইয়াবার লেনদেন হয়। সেই লেনদেনের টাকা নিয়েই জামাল উদ্দিনের সাথে হামলাকারি গ্রুপটির বিরোধ সৃষ্টি হয়।

ওই সুত্র গুলো মতে, জামাল উদ্দিনের মাধ্যমে শওকত আলী পুতু গংদের সাথে আরেকটি গ্রুপের ইয়াবার লেনদেন হয়। সেই লেনদেনের টাকা পাওনা ছিল শওকত আলী পুতু গং। কিন্তু জামাল উদ্দিন সেই টাকা না দিয়ে ‘প্রভাব’ দেখানোর চেষ্টা করলে এই ঘটনা ঘটে।

এলাকার ওই সুত্রগুলো মতে, নিহত জামাল উদ্দিন, তার পরিবার ও নিকটাত্মীয়দের কয়েকবছর আগেও কোন স্বচ্ছলতা ছিল না। কয়েক বছরেই তারা অর্থশালি  হয়ে উঠে।

এলাকাবাসির অভিযোগ, রহস্যজনক কারণে পুলিশ ও আইন শৃংখলা বাহিনী খরুলিয়ার মাদক সাম্রাজ্য নিয়ে তেমন কিছু করছে না। অথচ, অল্পদিনের ব্যবধানে এই এলাকায় ৩ জন খুন হয়েছেন।

ঝিলংজা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান টিপু সুলতান বিষয়টি জেনেছেন। তিনি বলেন, স্থানীয় ইউছুফ আলী মাদক সম্রাট হিসেবে পরিচিত। তার ছেলে দেলোয়ার, পুতু, লিয়াকত, সাদ্দাম ও ওসমানরা খুবই বেপরোয়া। তারা মাদকের কাঁচা টাকায় ধরাকে সরা জ্ঞান মনে করেই চলে। তাদের বিরুদ্ধে কেউ টুঁশব্দটিও করতে পারে না।

তিনি বলেন, তাদের বিরুদ্ধে মাদকসহ নানা অপরাধে একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। গত বছর জুলাই মাসে মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে হামলাকারিদের এক ভাই পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। জামাল উদ্দিন দূর্বৃত্তদের মাদক ব্যবসা নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিল। এতে ক্ষুদ্ধ হয়ে তারা এ হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে।

কক্সবাজার সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) বিপুল চন্দ্র দে বলেন, কিছুদিন আগে খরুলিয়া বাজার পাড়ায় কথিত টাকা পাওনাকে কেন্দ্র করে কতিপয় দূর্বৃত্ত হামলা চালিয়ে এক যুবককে আহত করে বলে খবর পেয়েছিলাম। সেই আহত যুবক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে বলে শুনেছি।

তিনি জানান, তার মৃতদেহ স্বজনরা বাড়ী নিয়ে গেছে। নিহতের বাড়ীতে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। সুরতহাল রিপোর্ট তৈরির পর নিহতের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে নিয়ে আসা হয়।

পরিদর্শক (তদন্ত) জানান, জামালের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দেয়া ছিল থানায়। সেটার তদন্ত করতে গিয়ে মূল ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারে পুলিশ। এখন নিহতের পরিবার থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবসা নেয়া হবে।

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!