কক্সবাজারে নতুন উপজেলা ‘ঈদগাঁও’, আনন্দে ভাসছেন এলাকাবাসি

কক্সবাজারে নতুন উপজেলা ‘ঈদগাঁও’, আনন্দে ভাসছেন এলাকাবাসি

আনছার হোসেন
সম্পাদক
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

বহুদিনের প্রতীক্ষার পর অবশেষে কক্সবাজার জেলায় ‘ঈদগাঁও’ নামের নতুন আরেকটি উপজেলা অনুমোদন পেয়েছেন। ‘ঈদগাঁও’ হলো জেলার ৯ম উপজেলা।

সোমবার (২৬ জুলাই) অনুষ্ঠিত প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই উপজেলাসহ নতুন ৩টি উপজেলা অনুমোদন দিয়েছেন।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঈদগাঁও উপজেলা বাস্তবায়ন পরিষদের সদস্য সচিব ও কক্সবাজার উন্নয়ন কতৃপক্ষের চেয়ারম্যান লেঃ কর্ণেল (অবঃ) ফোরকান আহমেদ।

তিনি নিজের ফেসবুক পেইজে এই তথ্যটি নিশ্চিত করেন।

কক্সবাজার জেলা গঠনের সময় এখানে উপজেলাটি ৭টি। পরে বিএনপি সরকার আমলে জেলার বৃহত্তর উপজেলা চকরিয়াকে বিভক্ত করে ৫টি ইউনিয়ন নিয়ে ‘পেকুয়া উপজেলা’ গঠন করা হয়। দীর্ঘদিন ৮টি উপজেলা থাকার পর অবশেষে বর্তমান সরকার আমলে জেলার ৯ম উপজেলা হিসেবে ‘নিকার’ সভায় অনুমোদন পেয়েছে ‘ঈদগাঁও উপজেলা’।

সোমবার (২৬ জুলাই) অনুমোদন পাওয়া ঈদগাঁও উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন হলো ঈদগাঁও, ইসলামপুর, ইসলামাবাদ, জালালাবাদ ও পোকখালী। প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার অধিবাসী নিয়ে ঈদগাঁও কক্সবাজার জেলার নবম প্রশাসনিক উপজেলা হিসাবে অনুমোদন পেয়েছে।

কক্সবাজার সদর উপজেলাকে বিভক্ত করে ‘ঈদগাঁও উপজেলা’ গঠন করা হয়েছে।

এদিকে ‘ঈদগাঁও উপজেলা’ অনুমোদন পাওয়ার পর থেকে জেলাজুড়ে এ নিয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি শুরু হয়েছে। সোমবার দিনভর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকার দলের কক্সবাজার জেলার একাধিক শীর্ষ নেতা ও একজন শীর্ষস্থানীয় আমলা এই উপজেলা অনুমোদনের কৃতিত্ব নিতে নিজের বক্তব্য জাহির করে চলেছেন। প্রত্যেকেরই দাবি, ‘ঈদগাঁও উপজেলা’ গঠনের পেছনে ‘তাঁর’ই ভূমিকা প্রধান!

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ‘ঈদগাঁও উপজেলা’ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয় বহু বছর আগে। সাধারণ মানুষের দাবির মুখে এ নিয়ে ফাইলিং প্রক্রিয়া শুরু হয় সর্বশেষ বিএনপি সরকার আমলে। তবে ওই সরকার আমলে এই প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখেনি। যদিও তৎকালিন যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপির বর্তমান স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, কক্সবাজার সদর-রামু আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ সহিদুজ্জামান ও সাবেক সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল ওই সময় ভূমিকা রেখেছিলেন।

সুত্র মতে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ‘ঈদগাঁও উপজেলা’ প্রকল্প নিয়ে সবচেয়ে বেশি দৌঁড়ঝাপ করেছেন কক্সবাজার সদর-রামু আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল। পরে সেই প্রকল্প বাস্তবায়নে যুক্ত হন কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান লে. কর্ণেল (অব.) ফোরকান আহমদ ও সরকারের বর্তমান সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদ এবং জাতিসত্ত্বার কবি ও বাংলা একাডেমীর বর্তমান মহাপরিচালক মুহম্মদ নূরুল হুদা। এরা ছাড়াও আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা এই প্রকল্প বাস্তবায়নে দৌঁড়াদৌঁড়ি করেছেন।

তবে এখন কয়েকজন মাত্র নিজেদের ভূমিকার কথা তুলে ধরছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

আনন্দে ভাসছে ঈদগাঁওবাসি
এদিকে কক্সবাজার জেলার নবম উপজেলা হিসেবে ‘ঈদগাঁও’কে অনুমোদন দেয়ায় ঈদগাঁওবাসিদের মধ্যে আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে। এই আনন্দে তারা নিজেদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করেছেন।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে ঈদগাঁওকে উপজেলায় রূপান্তরের দাবি করে আসছিলেন ওই অঞ্চলের অধিবাসীরা। দীর্ঘ ৫০ বছর পর সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঈদগাঁওবাসির স্বপ্নপূরণ করেছেন।

চলতি বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি ঈদগাঁও থানা হিসেবে যাত্রার পাঁচমাসের মাথায় উপজেলার ঘোষণা আসায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন ঈদগাঁওর সর্বস্তরের মানুষ।

ঈদগাঁওকে উপজেলা ঘোষণা করায় একে অপরকে মিষ্টি মুখ করিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করছেন ঈদগাঁওবাসি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে প্রধানমন্ত্রীকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন অনেকে।

ঈদগাঁও উপজেলা বাস্তবায়ন পরিষদের সচিব ও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) চেয়ারম্যান লে. কর্নেল (অব.) ফোরকান আহমেদ বলেন, ‘প্রাচীনকাল থেকে বৃহত্তর ঈদগাঁও বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে প্রসিদ্ধ। যুগে যুগে তার প্রসার ঘটেছে। কিন্তু সদর উপজেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় আরেকটি উপজেলার ওপর দিয়ে এ অঞ্চলের লাখো জনতাকে প্রশাসনিক সেবা পেতে কক্সবাজার যেতে হতো। এতে দুর্ভোগ বাড়তো।’

তিনি বলেন, ‘তখন থেকেই বৃহত্তর ঈদগাঁওর ৫ ইউনিয়ন নিয়ে উপজেলা বাস্তবায়নের দাবি ওঠে। কিন্তু তা আলোর মুখ দেখেনি। আমি ২০০৯ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর এলাকায় এসে ঈদগাঁওকে স্বতন্ত্র উপজেলা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। তখনই কবি মুহম্মদ নুরুল হুদাকে (বর্তমানে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক) সভাপতি ও আমি সদস্য সচিব হয়ে ১০১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠনের পর মুক্তিযোদ্ধা মাস্টার নুরুল আজিমকে কো-অর্ডিনেটর করে প্রশাসনিক দফতরে যোগাযোগ শুরু করি।’

লে. কর্নেল (অব.) ফোরকান আহমেদ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশনের একটি অনুষ্ঠানে আসলে একান্তভাবে ঈদগাঁও উপজেলা করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরি। ওনার পরামর্শে ২০২০ সালে এ ব্যাপারে বহুদূর এগিয়ে যাই। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি মতে স্থানীয় সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমলও উপজেলা বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি জাতীয় সংসদে তুলে ধরেন।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের জন্য বিষয়টি সহজ হয়ে আসে ঈদগাঁওর কৃতি সন্তান হেলালউদ্দীন আহমদ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হয়ে দায়িত্ব পাওয়ার পর। আমাদের তাগাদায় তিনি প্রশাসনিক কাজগুলো এগিয়ে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে উপস্থাপনের পর অবশেষে স্বাধীনতার ৫০ বছরের মাথায় ঈদগাঁও উপজেলা হিসেবে ঘোষণা পেয়েছে।’

কক্সবাজার সদর-রামু আসনের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল বলেন, ‘প্রশাসনিক উপজেলার অভাবে ঈদগাঁওয়ের প্রায় আড়াই লাখ মানুষ সরকারি সুযোগ সুবিধা থেকে একপ্রকার বঞ্চিত ছিলেন। একটি সরকারি হাসপাতাল করা যায়নি। একটি ফায়ারসার্ভিস স্টেশন করা যায়নি। করা যায়নি একটি সরকারি কলেজ ও একটি স্কুল। দীর্ঘ ৪০ কিলোমিটার দূরে কক্সবাজারে গিয়ে সেবা নিতে নানাভাবে হয়রানি শিকার হতে হয়েছে। উপজেলা ঘোষণায় ভোগান্তি থেকে মুক্তি পাবে ঈদগাঁওয়ের বাসিন্দারা।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, আগে সদর উপজেলায় থাকা ঈদগাঁও, ইসলামপুর, ইসলামাবাদ, জালালাবাদ ও পোকখালী ইউনিয়ন নিয়ে অনুমোদন পেয়েছে ঈদগাঁও উপজেলা। এ পাঁচ ইউনিয়নে ভোটার সংখ্যা প্রায় এক লাখ ৮১ হাজার। আর মোট জনসংখ্যা ২ লাখ ৫০ হাজারের মতো।

কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও কক্সবাজার পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজারকে নিয়ে আলাদা ভাবেন। পর্যটন রাজধানী হিসেবে কক্সবাজারকে জাতীয় অর্থনীতির সূতিকাগার হিসেবে গড়তে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, গভীর সমুদ্র বন্দর, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম, মেরিন ড্রাইভ, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও রেললাইনসহ নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন।’

তিনি বলেন, ‘সরকারি সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে ঈদগাঁওকে উপজেলা ঘোষণা করায় জেলাবাসীর পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!