এক ‘অদম্য’ ডাক্তার ও প্রশাসক ডা. মহিউদ্দিন

এক ‘অদম্য’ ডাক্তার ও প্রশাসক ডা. মহিউদ্দিন

মহিউদ্দিন মাহী, প্রধান প্রতিবেদক
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

দীর্ঘ আড়াই মাস ধরে প্রিয়তমা স্ত্রী, কলিজার টুকরা সন্তানদের চোখে দেখেননি। যখন ফোন দেয় তখনই বলা হতো, ‘আর কয়েকটা দিন অপেক্ষা করো, তারপর নাহয় দেখা হবে।’ কিন্তু পরিবারে প্রতিবারই যে তিনি মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছেন তা কি জানতো ওই পরিবারের সদস্যরা!

করোনাভাইরাস যখন বিশ্ব কাঁপিয়ে দেশেই অবস্থান করছে। ওই দেশেরই একটি জেলা সদর হাসপাতালের স্বাস্থ্য সেবার সর্বোচ্চ কর্মকর্তা হয়ে লড়তে হবে মানুষের চিকিৎসা সেবায়। ভাবতে হবে কিভাবে এই অঞ্চলের সংকটাপন্ন রোগীকে উন্নত চিকিৎসা সেবা দেয়া যায়।

এভাবেই দিন সপ্তাহ পার করছেন তিনি। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের সর্বোচ্চ পদে দায়িত্বে থেকে পরিবার পরিজনদের চোখের দেখাও দেখতে পাচ্ছেন না তিনি। সরকারি দায়িত্বের কাছে যেন হেরে গেছে পরিবারের মায়া, মুখের কথাও।

এতক্ষণ বলছিলাম অদম্য এক চিকিৎসকের কথা। যিনি কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও উপ-পরিচালক ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন।

এই মহৎ মানুষটার কথা না বললেই যেন বড্ড বেমানান লাগছে। তাঁর মহতি প্রচেষ্টাতেই আজ কক্সবাজার জেলাবাসী করোনাভাইরাসের এই কঠিন সময়ে করোনাক্রান্ত হয়ে সংকাটাপন্ন রোগীকে জীবন বাঁচানোর যন্ত্র ‘আইসিইউ’ ও ‘এইচডিইউ’ পেয়েছেন।

সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মহিউদ্দিনের মনে প্রচন্ড জেদ, ইচ্ছে শক্তি ও প্রতিটি ‘টার্গেট’ নিয়েই তিনি এতদূর এগিয়েছেন। সদর হাসপাতালের কর্মরত অনেক ডাক্তার, কর্মকর্তা যখন পাশাপাশি থেকেও মরণব্যাধি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। ঠিক তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি পরীক্ষা করাবেন না। যদি পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। তাহলে তো তাঁকে বাধা পড়তে হবে!

এক ‘অদম্য’ ডাক্তার ও প্রশাসক ডা. মহিউদ্দিন

সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধয়াক মনে করলেন, যদি তিনি করোনাক্রান্ত হয়ে পড়েন তাহলে আইসিইউ, এইচডিইউ’র কাজ পিছিয়ে থাকবে। সঠিক সময়ে উদ্বোধন করতে পারবেন না। সেই চিন্তাতেই তিনি কোভিড-১৯ পরীক্ষা করাননি। যদিও হাসপাতালের সকল ডাক্তারের অনুরোধে তিনি গত ১৭ জুন পরীক্ষা করান। ওই দিনই আল্লাহর রহমতে তিনি ‘নেগেটিভ’ জানতে পারেন।

ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন অন্যান্য উপজেলা হাসপাতাল ও মন্ত্রণালয়ে ‘টার্গেট’ পূরণ করে সাড়া জাগিয়ে যখন জেলা সদর হাসপাতালে যোগ দেন তখনই প্রথম তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে একটি শোকজ নোটিশ খেয়ে পেলেন। দেশের অন্যান্য জেলা সদর হাসপাতালের চেয়ে অনেকটা পিছিয়ে ‘হাজিরা’ ছিল মাত্র ৪০%! এই চল্লিশ পার্সেন্ট থেকে তিনি জেলা সদর হাসপাতালের সকল ডাক্তার, কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে দেশের সর্বোচ্চ হাজিরায় তুলে আনেন সদর হাসপাতালকে। ওই বিষয়ে তিনি ভূয়সী প্রসংসিতও হয়েছিলেন।

সময়ের মতো যখন সময় যাচ্ছে, চাকরির মাঝখানে হঠাৎ নেমে আসলো অন্ধকার। চারদিকে আতংক, হতাশা বিরাজ করছিল। ঠিক ওই সময়েই কক্সবাজারের ২৩ লাখ মানুষের চিকিৎসা সেবার প্রাণকেদ্র কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে বসে তিনি চিন্তা করলেন কক্সবাজারেই যদি করোনাভাইরাসে কেউ আক্রান্ত হয়ে জটিল অবস্থায় পড়েন, তখন তাদের কিভাবে চিকিৎসা দেয়া হবে? আবার এই জেলার উপর ভর করে বসে আছেন আরও ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা।

সংক্রমণ ছড়ানো এই রোগ যদি পর্যটন রাজধানী কক্সবাজারেই ছড়িয়ে পড়ে তাহলে তা সামাল দিতে বেগ পেতে হবে অনেক কঠিন মুহুর্তেও। যদি এই রোগে আক্রান্ত হয়ে অবনতি হয় কোন রোগীর অবস্থা, তখন উন্নত চিকিৎসা জন্য ১১/১২ ঘন্টা পেরিয়ে গাড়িতে ঢাকায় নিয়ে যেতে হবে রোগীকে! সেই চিন্তা থেকেই তিনি উদগ্রীব হয়ে পড়েন, কক্সবাজারে কিভাবে করোনা রোগী চিকিৎসা সেবায় আইসিইউ ও এইচডিইউ যুক্ত করা যায়!

পৃথিবীজুড়ে দাপিয়ে বেড়ানো ‘কোভিড ১৯’ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর শরীরের পরিস্থিতির অবনতি হলে ‘আইসিইউ’ ইউনিটের প্রয়োজন হয়। কিন্তু গোটা কক্সবাজারের চিকিৎসা সেবায় একটিও অতি গুরুত্বপূর্ণ এই পূণাঙ্গ ‘আইসিইউ’র ব্যবস্থা নেই। এই চিন্তা থেকেই জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন ইউএনএইচসিআরের সাথে যোগাযোগ করেন কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও উপ-পরিচালক ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন।

এক ‘অদম্য’ ডাক্তার ও প্রশাসক ডা. মহিউদ্দিন

স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জরুরি অবস্থা মোকাবেলায় পর্যটন রাজধানী কক্সবাজার এখনও অবকাঠামোগত জায়গায় অনেক পিছিয়ে। তাই কক্সবাজারকে এগিয়ে নিতে প্রাণপণ চেষ্টা করে আসছিলেন তিনি। তারই ধারাবাহিকতায় শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) সহযোগিতায় ইউএনএইচসিআর বরাবর গত ২২ মার্চ একটি ‘রিকোয়েষ্ট’ লেটার পাঠান ডা. মহিউদ্দিন। সেই চিঠিতেই সাড়া পেয়ে যান তিনি।

করোনার এই কঠিন সময়ে মেডিকেলে ইকুয়েপমেন্ট দিতে উদ্যোগী হয় ইউএনএইচসিআর। সেই মতে প্রথমেই স্বয়ংসম্পূর্ণ ১০ বেডের আইসিইউ (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) পূর্ণাঙ্গ নিবিড় পর্যবেক্ষণ ইউনিট এবং ৮ বেডের হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিট (এইচডিইউ) স্থাপনের কথা থাকলেও সাথে ১০টি ‘ভেন্টিলেটর’ দাবি নিয়ে আদায় করে নেন তিনি। যেখানে বিশেষ ধরণের শয্যা, কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য ভেন্টিলেটর, টিউব, পাম্প, হার্ট রেইট, ব্লাড প্রেসারসহ অন্যান্য শারিরিক পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক চিত্র পাবার মনিটরসহ নানা আধুনিক মেডিকেল সরঞ্জাম থাকবে।

ওই সময়ে যখন আরআরআরসির সহযোগিতায় ইউএনএইচসিআরের সাথে চুক্তি হয়, তখন স্বাক্ষর করতে হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের। চলমান করোনা পরিস্থিতির কঠিন সময় হওয়াতে জরুরি ভিত্তিতে অনেকটা রিস্ক নিয়েই সদর হাসপাতালের সর্বোচ্চ এই কর্মকর্তাই স্বাক্ষর করে চুক্তি সম্পাদনা করেন।

সেই মতে কক্সবাজারেরবাসীর স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছেন তিনি। তবে সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে শনিবার (২০ জুন) সকাল ১১টায় অনলাইন জোম কনফারেন্সের মাধ্যমে বিশেষায়িত ভেন্টিলেটরসমৃদ্ধ আইসিইউ ও এইচডিইউ’র ১৮টি বেড উদ্বোধন হয়েছে। ১০টি আইসিইউ আর ৮টি এইচডিইউ বেড।

এ যেন যুগ যুগের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ পেয়েছে, হাত দিয়ে আকাশের তারা যেন ধরতে পেরেছে কক্সবাজারবাসি। মরণব্যাধি করোনাভাইরাসের এই সময়ে সবচেয়ে মূল্যবান ‘সোনার হরিণ’ জীবন বাঁচানোর যন্ত্র ‘আইসিইউ’ ও ‘এইচডিইউ’ উদ্বোধন হয়েছে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে।

এখন থেকে করোনাক্রান্ত সংকাটাপন্ন কোন রোগীকে নিয়ে যেতে হবে না জেলার বাইরে। কক্সবাজারের কতো মানুষ একটি আইসিইউ বেডের জন্য হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন তা একমাত্র কক্সবাজারের মানুষই স্বাক্ষী।

এক ‘অদম্য’ ডাক্তার ও প্রশাসক ডা. মহিউদ্দিন

কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের সর্বোচ্চ এই কর্মকর্তা শুধু আইসিইউ’র চিন্তা নিয়ে বসে থাকেননি। করোনার এই সময়ে আরেকটি গুরুত্বপুর্ণ বিষয় সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্ট। এই অক্সিজেন প্ল্যান্টের মাধ্যমেই করোনাক্রান্ত রোগীর জরুরী মুহুর্তে খারাপ হওয়াদের অক্সিজেনের মাধ্যমে জীবন বাঁচে।

এবার এই সেন্ট্রাল অক্সিজেনের জন্য যোগাযোগ করলেন আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফের কাছে। সেখাানে উর্ধ্বতন কর্মকর্তা পূর্বপরিচিত বন্ধু ডা. আব্দুল্লাহর সাথে। যদিও তিনি থাকেন আমেরিকায়। এছাড়াও সিভিল সার্জনের অফিসের ডা. জামসেদ ও ডা. মাঈনুল ইসলামের সমন্বয়ে যোগাযোগ করেন সেখানে। বিষ্ময়কর ব্যাপার হলো, যোগাযোগের কয়েকদিনের মাথায় ৫৫ লাখ টাকার বরাদ্দ পেয়ে যান তত্তাবধায়ক ডা. মহিউদ্দিন।
ওই সময় সেন্ট্রাল অক্সিজেন নিয়ে কাজ করে এমন এক বাংলাদেশের বিখ্যাত কোম্পানীকে কাজ দেয়া হয়েছে।

তত্ত্বাবধয়াক ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন কক্সবাজার ভিশন ডটকমকে জানান, অক্সিজেনের কাজ একেবারে শেষ পর্যায়ে। ফায়ার ও সিভিল ডিফেন্স কার্যালয় থেকে একটি বিষ্ফোরক লাইসেন্স পেয়ে গেলেই আগামি সপ্তাহেই তা আনুষ্ঠানিক ভাবে উদ্বোধন হবে।

ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন কক্সবাজারে আসার আগে উপ-পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন মহাখালী স্বাস্থ্য দপ্তরসহ বিভিন্ন হাসপাতালে। এর আগে তিনি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলাতে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি যেখানে যান একটি ‘টার্গেট’ নিয়ে কাজ করেন। তার উদাহরণ হলো, যখন ফটিকছড়ি উপজেলায় যোগদান করার ওই সময়ে একেবারেই স্বাস্থ্য সেবায় পিছিয়ে উপজেলাটি।

ফটিকছড়ি বৃহত্তর উপজেলা সত্ত্বেও স্বাস্থ্য সেবায় মডেল হিসেবে ছিল না। অথচ তার পার্শ্ববর্তী চৌগাছা উপজেলা মডেল উপজেলা হিসেবে অবস্থান করছিল। ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের প্রচেষ্ঠায় স্বাস্থ্য সেবায় চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেকে ডিঙ্গিয়ে নরমাল ডেলিভারিতে ফটিকছড়ি মডেল উপজেলা হিসেবে রূপান্তর করেন। এই উজেলাটি সারা বাংলাদেশের এক নাম্বারে নিয়ে আসেন তিনি। এজন্য মন্ত্রণালয়ে পুরস্কৃতও হয়েছিলেন ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালে কর্মরত তত্ত্বাবধায়ক ডা. মহিউদ্দিন কক্সবাজার ভিশন ডটকমকে বলেন, আমি জীবনে কখনো পদোন্নতির জন্য তদবির করিনি। আল্লাহতায়ালার কারণে আমার সেবায় আমি সবসময় পদোন্নতি লাভ করেছি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে কখনো আমি নিজে চাইনি কোন দেশে গিয়ে ট্রেনিংয়ে অংশ নিতে, অথচ তারাই আমাকে অনেকবার পাঠিয়েছেন। আমি যেখানে দায়িত্ব পালন করতে যাই একটি ‘টার্গেট’ নিয়ে কাজ করি।

ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, আমার সরকারি চাকরি জীবনে কারও সাথে কখনো খারাপ আচরণ করিনি। সরকারি এই দায়িত্ব যথাযথ পালন করতে সর্বোচ্চ ত্যাগও স্বীকার করি প্রতিনিয়ত।

তিনি মনে করেন, জীবন যতদিন থাকবে ততদিন তিনি মানব সেবা করে যেতে চান।

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!