অপ-প্রচার বন্ধের শপথ

স্কুল জীবনে (যখন রাজনীতি সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলাম) ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীরা ক্লাসে এসে বলতো শেখ মুজিবের মা হিন্দুর মেয়ে। কলকাতার কোর্টে চাকুরি করা অবস্থায় হিন্দু মেয়েকে বিয়ে করছিলেন তার বাবা। তাই মুসলিম রাষ্ট্রকে বিভক্ত করার জন্য শেখ মুজিবকে ব্যবহার করা হয়েছে। না হলে নামের আগে বঙ্গবন্ধু কেন ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব কথাগুলো আজও কানে বাজে। আরো কত অপ-প্রচার চালানো হতো। এখন দেশে শিক্ষিতের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় ও আধুনিক বিশ্বের সাথে বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ায় নতুন প্রজন্ম অনেকটা সচেতন হয়েছে। তারা বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানতে শিখেছে। বঙ্গবন্ধুকে, পিতা/মাতা. জন্ম, মৃত্যু সবকিছুই নতুন প্রজন্ম জেনেছে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছে। তাই শিবির এসব আর বলেনা। তাদের অপ-প্রচারের মাত্রা এখন ভিন্ন। তবে এবার যোগ হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ইতিহাসের মিথ্যাচার। বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন জায়গায় একেকটি চক্র নিজেদের সুবিধা ও স্বার্থ মতো ইতিহাস রচনা করে যাচ্ছে। ফলে বঙ্গবন্ধুর চরম চরিত্র হনন করা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুকে হেয় করা হচ্ছে। তাই এবারের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৯তম জন্মদিন হউক তার নামে অপপ্রচার বন্ধের শপথ।
১৯২০ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু টুঙ্গি পাড়া গ্রামের মুসলিম সভ্রান্ত পরিবারের শেখ লুৎফুর রহমান ও বেগম সায়রা খাতুনের ঘরে জন্ম নিয়েছিলেন। হাজার বছরের মুক্তির সংগ্রামে লিপ্ত বাঙ্গালী জাতিকে মুক্তির মোহনায় নিয়ে যেতে হয়তো সৃষ্টিকর্তা তাকে পাঠিয়েছিলেন। তাই তো শত বছরের সংগ্রাম ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চুড়ান্ত বিজয় হয়েছিলো তার হাত ধরে। মাত্র ৯ মাস নিরস্ত্র বাঙ্গালী আধুনিক প্রশিক্ষিত সশস্ত্র পাক সেনা বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে। বিশ্ব মানচিত্রে আমরা একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ পেয়েছি। যদিও আমাদের হারাতে হয়েছে ৩০ লাখ তাজা প্রাণ আর তিন লাখ মা/বোনের ইজ্জত। যার অনুপ্রেরণা, সাহস আর সীমাহীন দৃঢ় নেতৃত্বের প্রতি ছিলো ৭ কোটি মানুষের অগাদ বিশ্বাস তিনি আর কেউ নন তিনিই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। কিন্তু ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে আবারো শৃঙ্খলিত করা হলো বাঙ্গালীকে। শুধু তাকে নয় তার পরিবারের সকল সদস্যকে সেদিন বুলেটের আঘাতে জর্জরিত করা হয়েছিলো। আজকের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর বড় মেয়ে শেখ হাসিনা ও তার ছোট মেয়ে শেখ রেহনা বিদেশে ছিলেন বলে প্রাণে বেঁচে ছিলেন।
শেখ লুৎফুর রহমানের আদরের খোকা কখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথানত করেননি। ফলে পিতা ছেলের রাজনীতি করাকে সমর্থন করেছিলেন। পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য আন্দোলন করেছেন। দেশ বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের মানুষের অধিকার আদায় করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ৪ হাজার ৬ শত ৮২টি দিন কারাগারে কাটিয়েছেন। শৃঙ্খলিত বাঙ্গালী জাতির মু্ক্িতর জন্য লড়াই করতে করতে বরাবরই স্রোতের বিপরীতে চলতে হয়েছে তাকে। যার কারণে বঞ্চিত হয়েছেন মা/বাবার আদর সোহাগ থেকে। স্নেহ আর ভালবাসা থেকে বঞ্চিত করেছেন নিজের সন্তানদেরও। বঙ্গবন্ধুর বড় মেয়ে শেখ হাসিনা তার রচিত “শেখ মুজিব আমার পিতা” গ্রন্থে লিখেছেন- “আব্বাকে ও (শেখ কামাল) কখনও দেখেনি, চেনেও না। আমি যখন বার বার আব্বার কাছে ছুটে যাচ্ছি আব্বা আব্বা বলে ডাকছি ও শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে। গোপালগঞ্জ থানায় একটা বড় পুকুর আছে, যার পাশে বড় খোলা মাঠ। ওই মাঠে আমরা দুই ভাইবোন খেলা করতাম ও ফড়িং ধরার জন্য ছুটে বেড়াতাম। আর মাঝে মাঝেই আব্বার কাছে ছুটে আসতাম। অনেক ফুল, পাতা কুড়িয়ে এনে থানার বারান্দায় কামালকে নিয়ে খেলতে বসেছি। ও হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞাসা করল, হাসু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি”। এ একটি কথায় বুঝা যায় কতটা নির্মম আর নির্মোহ জীবন কাটিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। সন্তান তার বাবাকে চিনে না, পিতার কাছে আসতে ভয় পায়। অনুমতি নিয়ে বাবা ডাকতে হয়। ভাবতেও অবাক লাগে। সমগ্র শরীর শিহরণ দিয়ে উঠে।
মনের অজান্তে শরীরের নেতিয়ে পড়া লোমগুলো খাড়া হয়ে যায়। বারবার বাধা এসেছে চলার পথে কখনো পেছনে ফিরে থাকান নি। স্ত্রী সন্তানদের মায়াজালে আটকে জড়িয়ে পড়ার ভয়ে আবেগগুলো লুকিয়ে রেখেছেন। ইতিহাস স্বাক্ষী সুযোগ থাকার পরও কখনো পালিয়ে রাজনীতি করেন নি বঙ্গবন্ধু। অথচ বিশ্ব রাজনৈতিক অনেক নেতাকে আমরা দেখেছি, যারা বিভিন্ন সময় রাজনীতির কৌশলে আত্মগোপনে বা গোপনে কর্মকান্ড চালিয়েছেন। সেক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু ছিলেন ভিন্ন চরিত্রের অধিকারী। আর সে কারণে খোকা থেকে মুজিব ভাই থেকে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছেন জাতির পিতা। আজ তাকে নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানের মতো কক্সবাজারেও বিভ্রান্তিকর ইতিহাস রচনা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর চরিত্রকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। এখনো তা অব্যাহত রেখেছে। আর জেলা প্রশাসনও প্রকৃত ইতিহাস যাচাই বাছাই না করে কাল্পনিক এ ইতিহাসকে স্থায়ীভাবে স্বীকৃতি দিচ্ছে। যে ইতিহাসটি প্রতিষ্ঠা হলে বিভ্রান্ত হবে নতুন প্রজন্ম। প্রশ্নবিদ্ধ হবে বঙ্গবন্ধুর আপোষহীন চরিত্র। তাহলে আমরা কি ধরে নিবো বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ?

বঙ্গবন্ধু তো কোন ব্যাক্তি বা প্রতিষ্টানের নয়। বঙ্গবন্ধু মানে একটি স্বাধীন বাংলাদেশ, একটি মানচিত্র। একটি সোনার বাংলা। বঙ্গবন্ধু মানে স্বাধীনতা, বিজয়ের জয়গান। বঙ্গবন্ধু মানে শৃঙ্খলিত জাতিকে মুক্তির মোহনায় নিয়ে আসার গল্প, একটি জাতি। তাই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যেনতেন ইতিহাস রচনা করা যাবে না। তাকে নিয়ে যাই করা হউক না কেন তা হতে হবে তথ্য নির্ভর সত্য, সঠিক। কাল্পনিক বা ভিত্তিহীন বা মনগড়া কারো কথার উপর নির্ভর হওয়া যাবে না।
বঙ্গবন্ধুর কারণে আমাদের রয়েছে স্বাধীনতা দিবস, রয়েছে বিজয় দিবস আর ভাষা দিবস। এমন গর্বিত জাতি পৃথিবীতে আরেকটা নেই। আর সে জাতির শ্রেষ্ট সন্তান বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে মিথ্যাচার করা হয়। ব্যক্তিগত অভিসন্ধি বাস্তবায়নে প্রশাসনের কাঁধে বন্দুক রেখে শিকার করা হচ্ছে বঙ্গবন্ধুকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কখনো পালিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন না, পালিয়ে রাজনীতি করেন নি। যা করেছেন দৃপ্ত সাহস নিয়ে সামনে এগিয়ে গেছেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন ‘আমি পালিয়ে থাকার রাজনীতিকে বিশ্বাস করি না। আমি গোপন রাজনীতি পছন্দ করি না। আর বিশ্বাসও করি না।’
এ বইয়ে স্কুলছাত্র থাকাকালেই একটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে “পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে এলে তাকে বাড়ি থেকে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হলে তখনও তিনি অত্যান্ত নির্ভীকভাবেই বলেছিলেন, ‘আমি পালাবো না। লোকে বলবে, আমি ভয় পেয়েছি।’
আরেকটি ঘটনা বলা হয়েছে, যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রীসভা ভেঙ্গে যখন কেন্দ্রে শাসন শুরু হলো, তখন বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করার জন্য বাড়িতে পুলিশ আসলো। তিনি তখন বাড়িতে ছিলেন না। ফেরার পর যখন তিনি এ ঘটনা জানলেন, তখন তিনি তৎকালীন ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট ইয়াহিয়া খান চৌধুরীকে নিজে ফোন করে বললেন, “আমাকে গ্রেফতার করতে আপনি এখন পুলিশ পাঠাতে পারেন”।
১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে স্বদেশে ফিরে আসেন। স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে বঙ্গবন্ধু তার ভাষনে বলেছিলেন, ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত্রে পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে বন্দি হওয়ার পূর্বে আমার সহকর্মীরা আমাকে চলে যেতে অনুরোধ করেন। আমি তখন বলেছিলাম, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষকে বিপদের মুখে রেখে আমি যাব না। মরতে হলে আমি এখানেই মরব। বাংলা আমার প্রাণের চেয়েও প্রিয়। তাজুদ্দিন এবং আমার অন্যান্য সহকর্মী তখন কাঁদতে শুরু করেন’।
এ যদি হয় বঙ্গবন্ধুর চরিত্র তাহলে ১৯৫৮ সালে কাল্পনিক ইতিহাস রচনা করার অর্থ কি ? কিভাবে বলতে পারেন ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারির পর বঙ্গবন্ধু পালিয়ে কক্সবাজারের ইনানীর চেংছড়িতে এসেছিলেন ? কার বা কাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে এটি করা হচ্ছে তা ভাবতে হবে। স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের স্বার্থ হাসিলের অপচেষ্টায় পিতা মুজিবের চরিত্র হনন করে আসছে তখন থেকে। এখনো তা অব্যাহত রয়েছে। ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আদালতের কাঠগড়ায় দাড়িয়ে বঙ্গবন্ধু তার জবানবন্দি দেন। ইতিহাসের পাতায় এ জবানবন্দি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। উক্ত জবানবন্দির চুম্বক অংশটি তুলে ধরা হলো। যে অংশে ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারির পর তাকে গ্রেফতারের কথা বলেছেন।
“সামরিক শাসন প্রবর্তনের পর হইতেই বর্তমান সরকার আমার উপর নির্যাতন চালাইতে থাকে। ১৯৫৮ সালের ১২ই অক্টোবর তাহারা পূর্ব পাকিস্তান জননিরাপত্তা অর্ডিন্যান্সে আমাকে গ্রেফতার করে এবং প্রায় দেড় বৎসরকালে বিনা বিচারে আটক রাখে। আমাকে এইভাবে আটক রাখাকালে তাহারা আমার বিরুদ্ধে ছয়টি ফৌজদারী মামলা দায়ের করে, কিন্তু আমি ঐ সকল অভিযোগ হইতে সসম্মানে অব্যাহতি লাভ করি। ১৯৫৯ এর ডিসেম্বর কিংবা ১৯৬০ জানুয়ারিতে আমাকে মুক্তি দেয়া হয়”। এটিই প্রকৃত ইতিহাস, এটিই সত্য। অথচ সে সময়ে তিনি পালিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন, কে রান্না করে খাইয়েছেন, রাতের অন্ধকারে কারা কক্সবাজার থেকে ইনানী নিয়ে গেছেন, কয়েকমাস সেখানে ছিলেন ইত্যাদি ইত্যাদি কাল্পনিক নাটকের দৃশ্য বানানো হয়েছে।
আমাদের বিশ্বাস কক্সবাজারের বর্তমান মান্যবর কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো: কামাল হোসেন অত্যন্ত মেধাবী ও বিচক্ষণ কর্মকর্তা। ইতিমধ্যে তিনি কক্সবাজারের সাধারণ মানুষের কাছে সুনাম অর্জন করতে পেরেছেন। অতীতে কি হয়েছে তা না ভেবে বঙ্গবন্ধুর নামে ভিত্তিহীন, কাল্পনিক ইতিহাস রচনা বন্ধ করে সঠিক তথ্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরবেন। আমরা আর আশাহত হতে চাই না। আমরা আশাবাদি হতে চাই। মনে রাখতে হবে আমরা বঙ্গবন্ধুকে সম্মান দিতে গিয়ে যেন অসম্মান্বিত না করি। তাই পিতা মুজিবের ৯৯ তম জন্মদিনের শপথ হউক বঙ্গবন্ধুর নামে অপ-প্রচারিত সকল ইতিহাস বন্ধের শপথ।
লেখক- ওয়াহিদুর রহমান রুবেল, সংবাদকর্মী।

কক্সবাজার ভিশন.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




এই পাতার আরও সংবাদ
error: Content is protected !!