উইঘুর মুসলিম নির্যাতন এবং পুলিশের চাকরি ছেড়ে পালানো একজনের কাহিনী!

উইঘুর মুসলিম নির্যাতন এবং পুলিশের চাকরি ছেড়ে পালানো একজনের কাহিনী!

স্ত্রী এবং সন্তানদের নিয়ে জীবন ধারণের জন্য অনেক রকমের জীবিকার সন্ধান করে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। সর্বশেষ তিনি একটি ব্যবসা চালু করেন আর তাতেও তিনি ব্যর্থ হন। আর যখন চীনের পশ্চিমাঞ্চলের প্রদেশ জিনজিয়াং এর কর্তৃপক্ষ বাইমুরাতকে স্থানীয় সহায়ক পুলিশের চাকরি করার জন্য আমন্ত্রণ জানায় তখন তিনি খুশিতে একে স্বাগত জানান।

মাসখানেক তিনি স্থানীয় রাজপথের চেক পয়েন্টে দাঁড়িয়ে চীন সরকারের কালো তালিকাভুক্ত বিশেষত সংখ্যালঘু মুসলিম কালো তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের খোঁজ করেছেন।

একজন কাজাখ মুসলিম হওয়া সত্বেও তিনি এই কাজ করতে কিছুটা দ্বিধান্বিত থাকেন, কিন্তু অর্থের প্রয়োজনে তাকে বাধ্য হয়েই এই কাজ করতে হয়।

এর পরে তাকে বলা হয়েছিলো আটককৃত ৬০০ জন বন্দিকে একটি নতুন আটক কেন্দ্রে নিয়ে আসার জন্য এবং সেখানে গিয়ে তিনি যা দেখেছেন তাতে তিনি স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিলেন।

কর্মকর্তারা একে চাকরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে অভিহিত করেছিল, কিন্তু এটি ছিল আসলে একটি কারাগার যেখানে বিছানা এবং টয়লেট পাশাপাশি অবস্থান করে।

৩৯ বছর বয়সী বাইমুরাত কোনোরকমে তার আবেগ লুকিয়ে রেখেছিলেন।

তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘সেখানকার সব স্থানে ক্যামেরা লাগানো ছিল এবং তারা যদি আপনাকে অখুশি দেখতে পায় তবে আপনার কপালে দুঃখ আছে।’

চীনা কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক সমালোচনা সত্বেও জিনজিয়াং প্রদেশজুড়ে কাজাখ এবং উইঘুর মুসলিমদের তথাকথিত রাজনৈতিক দীক্ষা দান কেন্দ্রে আটক রাখার জন্য একটি বৃহৎ নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে।

আর এই দমন পীড়নের জন্য কর্তৃপক্ষ সংখ্যালঘু মুসলিমদের পুলিশে নিয়োগ দিয়েছে যাতে করে তারা মুসলিম সমাজকে সহজেই বিভক্ত করতে পারে।

কাজাখস্তানে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক এক সাক্ষাকারে বাইমুরাত চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে কর্মরত থাকার সময়কার কিছু দুষ্কর অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা দিয়েছেন যেখান থেকে তিনি তার পরিবার সহ পালিয়ে এসেছিলেন।

বাইমুরাত বলেন, ‘আমি নিজ থেকেই একটি বাধ্যবাধকতা অনুভব করি কারণ আমি আটক কেন্দ্রে অনেক মানুষকে অত্যাচারিত হতে দেখেছি।’

বেশ কয়েকটি সাক্ষাতকারে বাইমুরাত জিনজিয়াং প্রদেশে থাকাকালীন পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন। চীনে সহায়ক পুলিশের নিয়োগ দেয়া হয় ব্যক্তিগত চুক্তির মাধ্যমে কিছু এজেন্সি দ্বারা।
বাইমুরাত এর পূর্বে একটি অচেনা টেলিফোন নম্বর থেকে ফোন পান এবং তাকে এই বলে হুমকি দেয়া হয় যে, চীনে বসবাসরত তার আত্মীয়দের আটক কেন্দ্রে আটক করা হবে যদি তিনি তার ভুল স্বীকার না করেন।

২০০৯ সালে বাইমুরাত কাজাখস্তানে চলে আসেন কিন্তু এর কয়েক বছর পর তিনি তার পরিবারকে দেখতে জিনজিয়াং যান। এর পরে বেশ কিছু কাজ করে ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি ২০১৭ সালে সহায়ক পুলিশে যোগ দান করেন। তবে তিনি সেখানে খুব ভালো বেতন পেতেন বলেও জানান। তার মাসিক বেতন ছিল ৭০০ মার্কিন ডলার।

তাকে উরুমকি শহরে ২০০৯ সালে ঘটা দাঙ্গায় জড়িতদের আলোকচিত্র দিয়ে এদের খুঁজে বের করতেও বলা হয়েছিল।

২০১৭ সালের মধ্যে জিনজিয়াং এর পুলিশ বিভাগ পূর্বের তুলনায় পাঁচ গুণ বড় হয়। সরকার সংখ্যালঘুদের চাকুরী দিয়েছিল কারণ তার চায় সমাজের মধ্য বিভেদ তৈরি হোক যাতে করে তাদের দমন করা সহজ হয়।

কয়েক দশক যাবত হান জাতিগোষ্ঠীকে জিনজিয়াং এ স্থানান্তর করা হয় এবং এই বিষয়টি স্থানীয় উইঘুর দের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করে। একসময় এ অঞ্চলে উইঘুর গোষ্ঠী ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং জিনজিয়াং এর ২২ মিলিয়ন মানুষদের মধ্যে তাদের সংখ্যা ছিল ৪৬ শতাংশ।

প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর জিনজিয়াং প্রদেশে শীঘ্রই অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে উত্তেজনা হ্রাস করা যাবে বলে চীন সরকার আশা প্রকাশ করেছে। কিন্তু উইঘুর এবং কাজাখ গোষ্ঠীর লোকজন অভিযোগ করে বলেছেন যে, তাদের ইসলাম ধর্ম চর্চার ফলে তাদেরকে কাজে নেওয়া হয়না।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে বসবাসরত উইঘুর মুসলিম এবং উইঘুরদের স্বার্থ আদায়ের একজন কর্মী তাহির ইমিন বলেন, জিনজিয়াং এ তার চার জন আত্মীয় পুলিশ হিসেবে কর্মরত আছে এটি শুধুমাত্র এ জন্য যে, সেখানে উইঘুরদের জন্য খুব কম চাকুরী ই বিদ্যমান রয়েছে।

তিনি বলেন- ‘উইঘুর পুলিশ এবং সাধারণ পুলিশদের নিয়ে বেশ সমস্যা রয়েছে। কারণ লোকজন তাদের ঘৃণা করে এবং তাদের কে বিশ্বাস ঘাতক বলে আখ্যায়িত করে একই সাথে তাদেরকে চীনের কুকুর বলেও অভিহিত করে।’

বাইমুরাত বলেন, তাকে নিয়মিত রাজনৈতিক সভায় যোগদান করতে হতো এবং সেখানে তাকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর বানী মুখস্থ করানো হতো। সংখ্যালঘু পুলিশ সদস্যরা চীনা ভাষা ব্যতীত আর কোনো ভাষায় কথা বলতে পারতো না। যদি তারা কাজাখ বা উইঘুর ভাষায় কথা বলতো তবে তাদের শাস্তির আওতায় আনা হতো।

আটক কেন্দ্রে লোকজনদের ধরে আনা ছিল তার মতে সবচেয়ে খারাপ অভিজ্ঞতা।

যদিও সরকার এ সমস্ত আটক কেন্দ্রকে ধর্মীয় উগ্রপন্থা থেকে মুসলিমদের সরানোর জন্য প্রশিক্ষণ মূলক কেন্দ্র বলে অভিহিত করে।

বাইমুরাত বলেন- ‘চীনে ফিরে যাওয়ার জন্য আমি দুঃখ প্রকাশ করছি। এই পছন্দ আমাকে পুনরায় এরকম খারাপ কাজ করতে বাধ্য করবে।’

বাইমুরাত চীনে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে দুঃখ প্রকাশ করার আরেকটি কারণ হচ্ছে, কর্তৃপক্ষ জানতে পেরেছে যে তিনি কাজাখস্তানের নাগরিকত্ব নিয়েছেন। বর্তমানে জিনজিয়াং এর কারো সাথে যদি বিদেশী কোনো আত্মীয়ের যোগাযোগ থাকে তবে তাকেও আটক কেন্দ্র বন্দি করে রাখা হয়।

বাইমুরাত পুনরায় ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু তিনি এবং তার পরিবার ২০১৩ সালে চীনে যাওয়ার সময় তাদের কাজাখ পাসপোর্ট দিয়ে দিয়েছিলেন। আর তারা একটি ফাঁদে আটকা পড়েন।

তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন- ‘আমি এত ভয় পেয়েছিলাম যে, আমার পা জোড়া কাপতে শুরু করেছিল।’

অবশেষে তিনি চীনের অন্য একটি অঞ্চল থেকে কাজাখস্তানে ফিরে আসার ব্যবস্থা করতে পেরেছেন এবং কাজাখ কর্মকর্তাদের নিকট থেকে সাময়িক ভ্রমণ করার জন্য কাগজ পত্র জোগাড় করেছেন।

কাজাখস্তানে প্রবেশের পূর্বে সীমান্তে তাকে এবং তার পরিবার কে কয়েক ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। কাজাখস্তানের মাটিতে ফিরে এসে বাইমুরাত নতজানু হয়ে সকলকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

তিনি বলেন- ‘আমরা সে সময় খুবই খুশি ছিলাম। এটি এমন ছিল যেন আমরা জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়েছি।’
সূত্র: নিউইয়র্কটাইমস ডটকম।

কক্সবাজার ভিশন.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




এই পাতার আরও সংবাদ
error: Content is protected !!