‘শাস্তি না হলে মিয়ানমার সেনাবাহিনী থামবে না’

 

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী এক সম্মেলনে বক্তারা রোহিঙ্গা নিপীড়নের দায়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, জবাবদিহিতা নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকলে মিয়ানমার সেনাবাহিনী সংযত হবে না। মিয়ানমারে শুধু রোহিঙ্গারা নয়, সংখ্যালঘু সব সম্প্রদায়ই নিশ্চিহ্ন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সংকট সমাধানে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছার। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, বক্তাদের কেউ কেউ রোহিঙ্গাবিরোধী ঘৃণামূলক পোস্ট অপসারণে বিলম্ব করায় ফেসবুকের নিন্দা করেছেন।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। সন্ত্রাসবিরোধী শুদ্ধি অভিযানের নামে শুরু হয় নিধনযজ্ঞ। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হতে থাকে ধারাবাহিকভাবে। এমন বাস্তবতায় নিধনযজ্ঞের বলি হয়ে রাখাইন ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয় প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা। আগে থেকে উপস্থিত রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় দশ লাখে। এসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশের বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে বসবাস করছে।
রোহিঙ্গাদের বিপন্নতার অবসান ঘটানোর প্রত্যাশা নিয়ে ৮ ও ৯ ফেব্রুয়ারি নিউ ইয়র্ক সিটিতে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেছে ফ্রি রোহিঙ্গা কোয়ালিশন (এফআরসি)। যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্নার্ড কলেজে এরআরসির দুই দিনের সম্মেলনে এক হচ্ছেন বিশ্বের অনেক শিক্ষাবিদ, মানবাধিকারকর্মীসহ জাতিসংঘের আইনজীবীরা। সম্মেলন শুরুর আগে এক বিবৃতিতে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে ইসরায়েলবিরোধী বিশ্ব-প্রতিরোধ আন্দোলনের অনুপ্রেরণা কাজে লাগিয়ে মিয়ানমার বর্জন কর্মসূচি সম্মেলন থেকে শুরু করার কথা জানিয়েছেল এফআরসি। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, ফিলিস্তিনি জাতির মুক্তির পক্ষে বিশ্বব্যাপী যেমন করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিডিএস আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে, তেমন করে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করার চেষ্টা করছেন তারা। এফআরসির সমন্বয়ক মং জার্নি বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকার, খুনি সেনাবাহিনী ও সরকারের বিদ্বেষ-বিভ্রান্তি ও বর্ণবাদী রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত সামাজিক সংগঠনগুলোকে আমরা বয়কট করবো। ঠিক যেমনটা করা হয়েছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিডিএস আন্দোলনের মাধ্যমে।’

সম্মেলনে যুক্তরাজ্যে বসবাস করা রোহিঙ্গাদের সংগঠনের সভাপতি তুন খিন মন্তব্য করেছেন, জবাবদিহিতা নিশ্চিত ও বিচার বাস্তবায়নের দৃষ্টিগ্রাহ্য কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে নিপীড়ন বাড়তে থাকবে। তার ভাষ্য, ‘জবাবদিহিতা নিশ্চিতে যদি কোনও পদক্ষেপ নেওয়া না হয় তাহলে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কেন থামবে? তারা জানে, তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য তাদের কোনও শাস্তি পেতে হবে না।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরের রোহিঙ্গারা সবাই আমাকে একটা কথাই বলেছে। আর সেটা হচ্ছে, তারা ন্যায়বিচার চান। রোহিঙ্গাদের যদি মিয়ানমারে ফিরতে হয় তাহলে তার জন্য লাগবে নিরাপত্তার গ্যারান্টি। এটি আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন।’ তুন খিন মন্তব্য করেছেন, যদিও সম্মেলনটি রোহিঙ্গাদের ওপর আয়োজিত, কিন্তু সবাইকে মনে রাখতে হবে, মিয়ানমারের সব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার হুমকির মধ্যে রয়েছে বর্তমান নেতৃত্বের কারণে।
‘জেনোসাইড ওয়াচের’ গ্রেগরি স্ট্যানটনও সম্মেলনে বলেছেন, রোহিঙ্গারা সুরক্ষা, ন্যায়বিচার ও প্রত্যাবাসনের হকদার। রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানো মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সদস্যদের নাম তালিকাভুক্ত করে রাখা উচিত, যাতে তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা যায়। আরও কয়েকজন আলোচকের মতো তিনিও রোহিঙ্গাদের ওপর হওয়া নিপীড়নের বিষয়ে ফেসবুকের ভূমিকার প্রবল সমালোচনা করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটির বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের নিয়ে ঘৃণামূলক পোস্ট ও ভুয়া খবর প্রকাশ বন্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ ছিল।
আল জাজিরা উল্লেখ করেছে, ২০১৮ সালের আগস্টে প্রকাশিত জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিশনের প্রতিবেদনের কথা। সেখানে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে দেশটির সেনাপ্রধান মিন অং লাইং এবং তার অধীনস্ত সেনা কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
সম্মেলনে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে যুক্ত হয়েছিলেন জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি ইয়াংঘি লি। তিনি বলেছেন, রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী নতুন ঘাঁটি তৈরি করছে জানতে পেরে তিনি শঙ্কা বোধ করছেন। কানাডাভিত্তিক রোহিঙ্গা অধিকার কর্মী ইয়াসমিন আল জাজিরাকে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের একটি প্রজন্ম ঝরে গেছে আশ্রয় শিবিরে থাকার কারণে। তারা যথাযথ শিক্ষা-খাদ্য পায়নি। পরবর্তীতে কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হবে। ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব জেনোসাইড অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের’ চেয়ারম্যান অ্যালেক্স হিন্টন বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।

কক্সবাজার ভিশন.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




এই পাতার আরও সংবাদ
error: Content is protected !!